অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটছে ৪০ লাখ শ্রমিকের

অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটছে ৪০ লাখ শ্রমিকের
অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটছে ৪০ লাখ শ্রমিকের - ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • আব্দুল্লাহ রায়হান
  • ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২৩:৪১

সারা বিশ্বে আতঙ্ক করোনা ভাইরাস। বাংলাদেশেও এর ছোবলে ক্ষত বিক্ষত হচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন। করোনার সংক্রমণ রোধ করতে সরকার সারাদেশে গণপরিবহন বন্ধ করেছে। এখন রাজধানীসহ দেশের কোথাও চলছে না বাস, মিনিবাস, লেগুনাসহ অন্য কোনো যানবাহনই।

গত ২৬ মার্চ থেকে সবধরনের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় আপাতত বেকার প্রায় ৪০ লাখ পরিবহন শ্রমিক। ঘোর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের। অনেকেই না খেয়ে দিনাতিপাত করছেন। এরই মধ্যে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এই সেক্টরে কাজ করা শ্রমিকরা। অনেকের ঘরে নেই প্রয়োজনীয় খাবার। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম কষ্টে দিনযাপন করতে হচ্ছে তাদের।

এদিকে শ্রমিকরা বলছেন, এভাবে আর কয়েকদিন চললে না খেয়ে মরতে হবে তাদেরকে। গাড়ির চাকা না ঘুরলে পরিবারেও জ্বলে না চুলা। এমন দুঃসময়ে সারা বছর রোদ বৃষ্টি ঝড়ে যাদের জন্য কাজ করেন সেইসব পরিবহন মালিকদের দেখা পাচ্ছেন না তারা। যেসব সংগঠন পরিবহন শ্রমিকদের ঢাল বানিয়ে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায়ে ব্যস্ত থাকতেন সেইসব পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদেরও দেখা মিলছে না!

অথচ আপদকালীন সময়ে সার্বিক সহায়তার আশ্বাস দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে শ্রমিকদের কাছ থেকে নিয়মিত কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে সরকারের নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও বন্দর, গার্মেন্টস ইত্যাদি বন্ধ থাকায় অধিকাংশ ট্রাক, কাভার্ডভ্যান চলছে না।

তাই পণ্যবাহী যানের চালক-শ্রমিকদের অনেকেই এখন বেকার; কর্মহীনতার কারণে তারাও পড়েছেন দারুণ অর্থ সঙ্কটে। অচলাবস্থা আরো দীর্ঘায়িত হলে না খেয়ে থাকতে হবে, এমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটছে তাদেরও দিন।

গতবছর সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হওয়ার পর পরিবহন মালিকরা পরিবহন শ্রমিকদের বেতন নির্দিষ্ট করে নিয়োগপত্র দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে। কিন্তু গত একবছরে তা বাস্তবায়ন হয়নি।

নতুন পরিবহন আইনেই নিয়োগপত্র দেয়ার কথা রয়েছে, পরিবহনের রুট পারমিটের জন্য আবেদনের সাথে চালকের নিয়োগপত্র যুক্ত করতে হয়। কিন্তু সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিক- দুই পক্ষেরই অনীহার কারণে এটার কোনো বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে জানা গেছে।

পরিবহন শ্রমিকদের নিয়োগপত্র প্রদান ও ব্যক্তি মালিকানাধীন সড়ক পরিবহন শ্রমিক কল্যাণ তহবিল বোর্ডের কার্যক্রম নিয়েও মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়। সে সময় জানানো হয়, নিয়োগপত্র কার্যকর না হওয়ার জন্য মালিক ও শ্রমিক পক্ষ একে অপরকে দোষারোপ করেছেন। আসলে দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো সমস্যায় দায় এড়াতেই মালিকরা নিয়োগপত্র দিতে চায় না বলে শ্রমিক পক্ষের অভিযোগ।

বিপরীতে মালিক প্রতিনিধি পাল্টা অভিযোগ তুলে বলেন, শ্রমিকরা ঘন ঘন প্রতিষ্ঠান/পরিবহন পরিবর্তন করেন বলে তারাই নিয়োগপত্র নিতে চান না। এমন দুঃসময়ে যদি শ্রমিকরা নিয়োগপত্র অনুযায়ী মাসের নির্দিষ্ট সময়ে বেতন পেতেন তাহলে পরিবহন বন্ধ থাকলেও তাদের সংসার চালাতে কষ্ট হতো না।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনায় বড়ো ধরনের আঘাত এসেছে যেসব খাতে এরমধ্যে পরিবহন অন্যতম। দেশের সব গণপরিবহনের চাকা এখন অচল। সেইসঙ্গে প্রাইভেট পরিবহন ও পণ্য পরিবহন শ্রমিকদেরও অধিকাংশ এখন বেকার। আপাতত কোনো কাজ নেই তাদের। তাই কোনো আয় নেই। এসব পরিবহন শ্রমিকরা সবচেয়ে দুঃসময় পার করছেন এখন।

কেননা বেশিরভাগ পরিবহন শ্রমিকরাই ডেইলি বেসিসে কাজ করেন। যেদিন ডিউটি করেন সেদিনই টাকা পান। তাই বলা চলে গাড়ির চাকা ঘুরে তো শ্রমিকদের ঘরে চুলা জ্বলে। তাদের কারোরই জমানো টাকা নেই যে, তারা ঘরে বসে বসে সেই টাকা ভেঙে খাবে।

সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, পরিবহন শ্রমিকদের অধিকার আদায় কিংবা দুঃসময়ে সার্বিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ব্যাপারে কাজ করার কেউ নেই। দেখারও কেউ নেই। বলতে গেলে, বছরের পর বছর নানা বঞ্চনার মধ্যদিয়ে শ্রমিকদের কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। অথচ বর্তমানে তালিকাভুক্ত পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সংখ্যা সাতটি। এর মধ্যে বাস পরিবহন খাতে সংগঠন দুটি।

কেন্দ্রীয় এসব ফেডারেশনের নিয়ন্ত্রণে তালিকাভুক্ত ইউনিয়নের সংখ্যা ১৮৬। ইউনিয়নের আওতায় পরিবহন শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। যার পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। অন্য ছয়টি সংগঠন নামসর্বস্ব। শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষাসহ নানা ইস্যুতে ফেডারেশনগুলোর কাজ করার কথা। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে এমনটি ধারণা করা মোটেও অসঙ্গত হবে না যে চাঁদা আদায় ও আধিপত্য বিস্তার ছাড়া তাদের আর কোনো কাজ নেই।

তারা জানান, প্রতিটি কেন্দ্রীয় সংস্থা ইউনিয়ন থেকে মাসিক হারে ইচ্ছেমতো চাঁদা আদায় করছে। শ্রম আইন অবজ্ঞা করে শ্রমিকপ্রতি দিনে ১০টাকা চাঁদা নিচ্ছে তারা। অর্থাৎ মাসে ১২০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হচ্ছে শ্রমিকদের কাছ থেকে। এই আয় থেকে ফেডারেশনের নেতারা পান বড় অঙ্কের মাসিক ভাতা।

কেন্দ্রীয় সংস্থার চাপে প্রতিটি ইউনিয়ন আড়াই লাখের বেশি বাস-মিনিবাস থেকে ৭০-১০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করছে। এরমধ্যে ২০-৫০ টাকা পর্যন্ত ভাতা পান ইউনিয়নের নেতারা। এই আয়ের একটি অংশও পাচ্ছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। তারপরও এত টাকা চাঁদা আদায়কারী সংগঠনগুলোর নেতারা কখনোই পাশে দাঁড়াননা সাধারণ শ্রমিকদের। সবসময় শুধু শ্রমিকদের ব্যবহারই করেন।

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রাইভেট কিছু পরিবহনের শ্রমিক মাসিক বেতনে কাজ করলেও অধিকাংশ শ্রমিক দৈনিক ভিত্তিতে মজুরি পান। ট্রিপ দিলে নির্দিষ্ট টাকা, আর ট্রিপ না দিলে কোনো টাকা নেই। ফলে কাজ না থাকলে ওই শ্রমিক ও তাদের পরিবারের না খেয়েই দিন কাটে।

পরিবহন শ্রমিকরা বলেন, তাদের কল্যাণের নামে সারা বছর কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। পরিবহন শ্রমিকদের কল্যাণের নামে এ চাঁদা উত্তোলন হলেও দুর্দিনে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা এখান থেকে কেউ কোনোরূপ সাহায্য পেয়েছেন বলে তাদের জানা নেই।

এ প্রসঙ্গে ঠিকানা গাড়ির চালক নজরুল বলেন, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে পরিবার চালানো এখন কষ্টকর। গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে গাড়ি চালাতে পারছেন না। তাই ইনকামও নেই। এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে এ মাসের বাড়ি ভাড়া দেয়া নিয়ে। এখন আয় নেই, কিভাবে খাবার খরচ চালাবেন আর বাসা ভাড়া দেবেন তাই নিয়ে তিনি চিন্তিত বলে জানালেন।

রাজধানীর দোলাইপাড়ের বাসিন্দা পরিবহন শ্রমিক হেলাল মাতুব্বর বলেন, আমি গাজীপুর রুটের একটি বাস চালাই। স্বাভাবিক সময়ে যেদিন কাজ করি সেদিন টাকা পাই। আর কাজে না গেলে কোনো টাকা নেই। তিনি বলেন, ঘরে যে চাল-তরকারি ছিল তা দিয়ে কদিন কোনোরকম চলেছে। এখন আর চলছে না। কারো কাছ থেকে ধার নেবো সে রকমও কেউ নেই। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এখন না খেয়ে মরার উপক্রম হয়েছে।

মিজান নামে এক পরিবহন শ্রমিক শনির আখড়া থেকে নিউমার্কেট হিউম্যানহলার চালান। তিনি জানান, রোজ হিসেবে গাড়ি চালাতেন। মালিকের জমা ও হেল্পারের খরচ দিয়ে ৮০০-৯০০ টাকা থাকত। এখন গাড়ি বন্ধ। আয়ও বন্ধ।

তিনি বলেন, আমাদের নির্ধারিত বেতন থাকলে চিন্তা হতো না। মাস গেলে বেতন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকতো। গাড়ি চলুক কি, না চলুক তা মালিক বুঝতো। এখনতো পরিস্থিতি ভিন্ন। কাজ নেই তো টাকা নেই। স্ত্রী-সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেয়াই কষ্টকর।




Loading...
ads






Loading...