মুক্তি পেতে পারেন সাড়ে চার হাজার বন্দি

মুক্তি পেতে পারেন সাড়ে চার হাজার বন্দি - মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ০২ এপ্রিল ২০২০, ০০:৫৬

দেশের ৬৮টি কারাগারের ৯০ হাজারের মতো বন্দি রয়েছে। ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ বন্দি বর্তমানে কারাগারগুলোতে। জীবনঘাতী নভেল করোনা ভাইরাসজনিত রোগ কোভিড-১৯ অতিমাত্রায় ছোঁয়াচে বলে কারাগারগুলোতে ঝুঁকির মাত্রা অত্যন্ত বেশি। উদ্ভ‚ত পরিস্থিতিতে করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। এরই অংশ হিসেবে বিচারাধীন তিন হাজার হাজতিকে সাময়িকভাবে মুক্তি দেয়ার কথা ভাবছে সরকার। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তুাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাটিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। জামিনযোগ্য ধারায় তাদের মুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। এরপর বিচারক জামিন দিলেই তাদের মুক্তি দেবে কারা কর্তৃপক্ষ।

এ ছাড়া কারাবিধির ৫৬৯ ধারা অনুযায়ী আরো এক হাজার ৪৬৯ জন বন্দিকে মুক্তির বিষয়টি নিয়ে ফাইল নড়াচড়া চলছে। যাবজ্জীবন আসামিদের মধ্যে যারা ২০ বছর সাজা খেটেছেন, এমন কয়েদিদের মধ্যে যারা খুব অসুস্থ, অক্ষম বা বৃদ্ধ, তাদের জন্যই এ ধারা প্রযোজ্য। এ ছাড়া কেউ খুব ভালো আচরণ করলে তার ক্ষেত্রেও ধারাটি প্রয়োগ হতে পারে। এমন প্রায় দেড় হাজার কারাবন্দিও মুক্তির কথা ভাবা হচ্ছে। তবে বিতর্কিত কারোর জন্য এ ধারা প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অপরদিকে কারা সূত্র মতে, দেশ জুড়ে করোনা ভাইরাস মোকাবিলার অংশ হিসেবে দেশের সবকটি কারাগারে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে কারা অধিদফতর। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো বন্দি কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হননি। তার পরও বাড়তি সতর্কতা হিসেবে প্রত্যেক বিভাগের একটি কেন্ত্রীয় কারাগারে স্থাপন করা হয়েছে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার। পর্যায়ক্রমে সেগুলোকে আইসোলেশন সেন্টারে রূপান্তর করা হবে। প্রত্যেক কারাগারে স্থাপন করা হয়েছে জরুরি ফোন বুথ। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী আদালতে বন্দি হাজিরা স্থগিত করা হয়েছে। সম্প্রতি কারা অধিদফতর থেকে দেশের ৬৮টি কারাগারে ২০টি বিশেষ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।

বন্দিদের মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে কারা অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক কর্নেল মো. আবরার হোসেন বলেন, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এ প্রস্তাব দিয়েছি, এটা মন্ত্রণালয়েরই আদেশে। যাদের মামলা এখনো বিচারাধীন, জামিনযোগ্য অপরাধ হলে এদের জামিন দেয়া যায় কি না, জামিনযোগ্য ছোটখাটো অপরাধে যারা কারাগারে রয়েছেন, এ রকম তিন হাজারের সামান্য বেশি হাজতির নাম প্রস্তাব আকারে মন্ত্রণালয়ে দিয়েছি। অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে ওই প্রস্তাব যাবে আইন মন্ত্রণালয়ে। সেখানে আপত্তি না থাকলে পাঠানো হবে আদালতে। শেষ পর্যন্ত বিচারকই সিদ্ধান্ত নেবেন জামিন দেয়া যায় কি না। মুক্তির বিষয়টা বিচারকদের হাতে, আমাদের হাতে নয়।

কর্নেল আবরার হোসেন আরো বলেন, রুটিন প্রক্রিয়া হিসেবে বছরের বিভিন্ন সময়ে তারা কিছু বন্দির মুক্তির সুপারিশ করতেন। যাদের অল্প সাজা বাকি আছে, যারা অচল, অক্ষম বা বৃদ্ধ এ রকম বন্দিদের তালিকা করে নিয়মিতভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় মিটিং করে, বোর্ড করে তাদের মধ্যে থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করে। এ রকম বন্দিদের সাধারণত ঈদ, নববর্ষ, বা জাতীয় দিবস সামনে রেখে মুক্তি দেয়া হয়। সে রকম বন্দিদের একটি প্রস্তাবও সম্প্রতি আলাদাভাবে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কারা কর্তৃপক্ষের পাঠানো প্রস্তাবটি তাদের হাতে রায়েছে। কাজ শেষ হলে সেটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্যোগে কারা কর্তৃপক্ষকে ওই তালিকা তৈরি করতে বলা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফ মাহমুদ অপু।

কারা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কারাবিধির ৫৬৯ ধারা অনুযায়ী এর আগে ২০১০ সালে এক হাজারের বেশি বন্দিকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। জানা গেছে, দেশের কারাগারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বন্দি রয়েছে কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেখানে বর্তমানে ৯ হাজারের মতো বন্দি আছে। দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের তথ্য জানার পর কারাগারে নতুন বন্দির সংখ্যা কমছে। বর্তমানে কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে গড়ে প্রতিদিন ৪০-৪৫ জন নতুন বন্দি আসছে। আগে যে সংখ্যা ছিল ২০০-৩০০ জন। সূত্র জানায়, বর্তমানে কারাগারে কোনো নতুন বন্দি এলেই তাকে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। পুরোনো কোনো বন্দির সঙ্গে তাকে মিশতে দেয়া হয় না। কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলা সুপার ইকবাল কবির চৌধুরী বলেন, এখন আসামি আসার সংখ্যাও কমে গেছে। আগে দিনে দুই শতাধিক বন্দি আনা হতো এখানে। এখন ৫০-৬০ জনের বেশি আসছে না।

মন্ত্রণালয় ও কারা সূত্র জানায়, কারাগারগুলোতে করোনার বিস্তার ঠেকাতে সাধারণ তিন হাজার ৯২ জন হাজতিকে মুক্তি দেয়া চিন্তার পাশাপাশি পৃথক আরেকটি আইনের ধারায় আরে দেড় হাজার বন্দিকে (কয়েদি) মুক্তির কথা ভাবা হচ্ছে। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে যাদের সাজা খাটার হিসাব ২০ বছরের বেশি পার হচ্ছে, তারা ওই প্রক্রিয়ায় ছাড়া পাবেন। এ হিসাবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় মোট সাড়ে চার হাজারের বেশি মুক্তি পেতে পারেন।

কারা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় কারাবন্দি ও কারাগারের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সাবান, হ্যান্ডওয়াশ বা স্যানিটাইজার ব্যবহার ছাড়া কেউ কারাগারে ঢুকতে পারছেন না। শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা কারার জন্য ইনফ্রারেড থার্মোমিটার ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মোবাইলে বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। জানা গেছে, করোনা প্রতিরোধে কারাগারের বিষয়গুলো দেখভাল করার জন্য প্রতিটি কারাগারে ৫ ও ৩ সদস্যের করে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কারা সূত্র জানায়, দেশের ৬৮টি কারাগারের মধ্যে মাদারীপুর কারাগার অঘোষিতভাবে ‘লকডাউন’ করা হয়েছে। মাদারীপুরে অধিক সংখ্যক বিদেশফেরত প্রবাসীদের কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারা অধিদফতর। দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে প্রতটি কারাগারে নতুন বন্দিদের জন্য আলাদা সেল খোলা হয়েছে। এই সেলে রাখা হয়েছে ১৪টি কক্ষ। ‘নতুন আমদানি সেল’ নামে এই সেলে বন্দি আনার আগেই তাদের করা হচ্ছে। বাগেরহাট কারাগারে নতুন বন্দি তিন চাইনিজ নাগরিককে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কারাগারের প্রস্তুতির বিষয়ে কারা অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক কর্নেল মো. আবরার হোসেন বলেন, করোনার কারণে আমরা প্রস্তুতিমূলক অনেক ব্যবস্থা নিয়েছি। সবগুলো কারাগারে এ সংক্রান্তে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নির্দেশগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কিনা কারা অধিদফতর থেকে তা মনিটরিং করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এখন কোয়ারেন্টাইন সেন্টার ঘোষণা করা হলেও সেগুলোকে আইসোলেশন সেন্টার করার মতো প্রস্তুতি আমরা নিয়ে রেখেছি। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এ বিষয়ে সহায়তা করছে। তারা দু-একদিনের মধ্যেই কেরানীগঞ্জ কেন্ত্রীয় কারাগারে পিপিইসহ বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করবে।

প্রসঙ্গত, চীনে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কমলেও যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, স্পেন, ইরানসহ অনেক দেশে ভাইরাসের সংক্রমণ হচ্ছে জ্যামিতিক হারে। আর তাই এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রায় ৮৫ হাজার বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে ইরান। করোনা আতঙ্কে ইতালির একটি কারাগারে ভয়াবহ দাঙ্গায় প্রাণ গেছে অন্তত ১০ জনের। বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথমে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। সরকারি হিসেব মতে, দুনিয়াজুড়ে মহামারী রূপ নেয়া জীবনঘাতী করোনা ভাইরাসে গতকাল বুধবার পর্যন্ত দেশে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৫৪তে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু হয়। অন্তত ২৫ জন আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরিছেন।


মানবকণ্ঠ/এমএইচ




Loading...
ads






Loading...