রাস্তায় এত গাড়ি কেন

রাস্তায় এত গাড়ি কেন
রাস্তায় এত গাড়ি কেন - ছবি: মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • আব্দুল্লাহ রায়হান
  • ০১ এপ্রিল ২০২০, ০০:৪৩

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের মহামারীতে আতঙ্কগ্রস্ত বিশ্বের প্রায় ৭০০ কোটি মানুষ। এরইমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ২শ’ দেশের ছয় লাখেরও বেশি মানুষ। মারা গেছেন প্রায় ৩৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। বহু দেশে প্রতিদিন এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোও পরিস্থিতি সামলাতে পারছে না। করোনার মহামারী রুখতে এ সময়ে বিভিন্ন দেশে চলছে লকডাউন। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নেই। করোনা মোকাবিলায় গত ২৬ মার্চ থেকে আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল সরকার। এ সময় মানুষকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে।

পাশাপাশি বন্ধ করা হয়েছে গণপরিবহন, শপিংমল মার্কেট, দোকানপাট। অর্থাৎ ৪ এপ্রিল পর্যন্ত অঘোষিত লকডাউনে মানুষ একরকম বন্দিই ছিল এই ছয় দিন। তাছাড়া মানুষকে ঘরে থাকতে বাধ্য করতে ও সামাজিক দূরত্ব মানতে মাঠে পুলিশের সাথে কাজ করছে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও। নানাভাবে লোকজনকে বোঝানো হচ্ছে ঘরে থাকতে। নিয়ম মেনে চলতে।

সাধারণ ছুটির পর এসব নিয়মকানুন মানছেও মানুষ। কোথাও কোথাও বাধ্যও করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রথম তিন-চার দিন রাজধানীসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলো ছিল সুনসান, নীরব। তবে গত কয়েকদিন দেশে তেমনভাবে নতুন করে করোনা আক্রান্ত না হওয়া ও করোনা আক্রান্তদের সুস্থ হওয়ায় মানুষ ঘর থেকে বের হতে চলেছে। এক ধরনের শিথিলভাব এসেছে মানুষের মধ্যে।

এদিকে মঙ্গলবার থেকে সরকারি ছুটি বাড়িয়ে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বাদ দেয়া হয়েছে ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলশোভাযাত্রা ও ছায়ানটের বৈশাখ বরণ অনুষ্ঠান। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সবাইকে এখনো ঘরে থেকে পরিস্থিতি অনুধাবন করতে বলেছেন। তারপরও কেউ কেউ এখন পেটের দায়ে, আবার কেউ কেউ আড্ডা দিতে বের হচ্ছেন ঘরের বাইরে। পাড়া মহল্লা থেকে রাজপথ সব জায়গাতেই বাড়ছে মানুষের আনাগোনা।

সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে রাস্তাঘাট, বাজার, পার্ক ও চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ঘুরে বেড়াচ্ছে যুবকরা। স্কুল বন্ধ থাকলেও খেলাধুলায় সময় পার করছে তরুণরা। বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হলেও থেমে নেই মানুষের চলাফেরা। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে রিকশা ও অটোরিকশাসহ ছোট যানবাহন চলাচল করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনেই।

পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ করা হলেও কেউ তা মানছে না। ফেরি সার্ভিস চালু থাকায় ট্রাক ও পিকআপভ্যানে গ্রামের বাড়িতে যেতে দেখা গেছে অনেককেই। তাই সরকারি নির্দেশনা পুরোপুরি কার্যকর করার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের। মানুষের এ বেড়িয়ে পড়া এখনি থামানো না গেলে করোনার ঝুঁকি আরো বাড়বে বৈ কমবে না! এসব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এখন পিকটাইম চলছে। তাই নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অবশ্যই বাসাবাড়িতে থাকতে হবে। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে। অন্যথায় ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

মঙ্গলবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাধারণ ছুটি বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এবার আসন্ন পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান না করার কথাও বলেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ছুটি দিয়েছিলাম, হয়তো আমাদের আরো কয়েকদিন বাড়াতে হতে পারে।

শেখ হাসিনা বলেন, করোনা প্রতিরোধে মানুষের করণীয় বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। আপনারা এসব নির্দেশনা মেনে চলুন। কেননা নিজেদের সুরক্ষা নিজেদেরই করতে হবে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মোড়ে মোড়ে তরুণদের জটলা। এমনকি কিছু কিছু জায়গায় অঘোষিত বাজারও বসেছে। বাধ্য হয়ে পুলিশকে কিছু জায়গায় মাইকিং করতে হয়েছে।

এ চিত্রই বলে দেয়, মানুষের মধ্যে ঘরে থাকা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে শিথিলতা চলে এসেছে। যদিও ২৬ মার্চ সরকারি ছুটি ঘোষণার পর রাজধানীর রাস্তাঘাট পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে পড়েছিল। জনশূন্য এমন ঢাকা শেষ কবে মানুষ দেখতে পেয়েছে তা জানা নেই। তবে গত দু’দিন ধরে রাস্তাঘাটে আবার রিকশা-গাড়ি, প্রাইভেটকার চলাচল শুরু হয়েছে। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কিছুটা কমেছে।

গতকাল রাজধানীর মূল সড়কে কিছু সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলতে দেখা গেছে। রিকশার আধিক্যও ছিল। কিছু ব্যক্তিগত যানবাহনও চলছে। মোটরসাইকেলের সংখ্যাও বেড়েছে। বিশেষ করে এসব এলাকার মোড়ে মোড়ে তরুণদের মোটরসাইকেল নিয়ে আড্ডা মারতে দেখা গেছে।

রাস্তায় বের হওয়া মানুষজন কেউ বলেছে তারা বাজার করতে, কেউ ব্যাংকে টাকা তুলতে, কেউ ওষুধ কিনতে বা কেউ প্রয়োজনীয় অন্য কিছু কিনতে বের হয়েছে। কিন্তু একসঙ্গে একাধিক লোকজন চললেও তারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছিল না। গল্প করতে করতে হাঁটতেও দেখা যায় অনেককে। মূল সড়কগুলোতে লোকজনের আনাগোনা কম থাকলেও অলিগলিতে ভিড় বাড়ছে।

খুলতে শুরু করেছে বেশিরভাগ চায়ের দোকান ও অন্য ছোটখাটো দোকান। কাঁচাবাজারেও মানুষের ভিড় বেড়েছে। কাজের সন্ধানে বেরিয়েছে নিম্ন আয়ের অনেক লোকজন। গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও আগের চার দিনের চেয়ে রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ি ও রিকশা ছিল বেশি। তবে বিপণিবিতানসহ বড় বড় সব দোকানই বন্ধ ছিল। আর ঢাকা থেকে অনেক লোকজন গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ায় সেখানকার হাট-বাজারগুলো ছিল বেশ জমজমাট।

রাজধানীর সাইনবোর্ড মোড়ে মানুষের জটলা দেখা গেছে আগের মতোই। এখানকার বেশকিছু রেস্টুরেন্ট খোলা রাখতে দেখা গেছে। রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে আড্ডাও দিচ্ছে অনেকে। যাত্রাবাড়ীতে সন্ধ্যার পরে সড়ক দখল করে বিভিন্ন পণ্যের দোকান নিয়ে বসতে দেখা গেছে হকারদের।

এ সময় ওবায়দুল নামের এক কাপড়ের দোকারদার বলেন, লকডাউন মেনে ঘরে বসে থাকলে খাব কি? করোনা ভাইরাস গরিবদের ধরবে না। গরিবরা এ রোগকে ভয় পায় না। বড়লোকরা ভয় পায়। আমাদের আল্লাহ রক্ষা করবে।

রাজধানীর শাহবাগে মনির নামের এক রিকশাচালক বলেন, করোনা ভাইরাসের ভয়ে সরকার দেশ লকডাউন করছে। কিন্তু আমরা আছি আমাদের নিজের ভয়ে। প্রতিদিন যা আয় হয় তা দিয়ে আমাদের সংসার চলে। গত দুই দিন খুব খারাপ অবস্থা। সকাল থেকে মাত্র ৮০ টাকা ইনকাম করছি। এই ইনকামে সংসার চলে?

গুলিস্তান এলাকায় স্বপন নামের এক চা ওয়ালা বলেন, রাস্তায় মানুষ নেই। চা খাবে কে? সকাল থেকে শ’দুইয়েক বিক্রি করছি। আগে এই সময়ে কামাই হতো ৮শ’ থেকে ৯শ’ টাকা। স্ত্রী, এক ছেলে, দুই মেয়ের সংসার চলবে কীভাবে?

গতকাল রাজধানী থেকে অনেকেই ট্রাকে গ্রামে ফিরেছে। এদের মধ্যে গাবতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে মালবাহী ট্রাকে বগুড়ার উদ্দেশে রওনা হতে দেখা গেছে মিজান নামের এক যাত্রীকে। তিনি বলেন, দেশের এমন পরিস্থিতিতে গ্রামে না গিয়ে ঢাকায় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তবে খবর পেলাম মেয়েটা অসুস্থ। তাই গ্রামে যাচ্ছি।

বরিশালে যাওয়া অপর এক যাত্রী সুজন বলেন, চালকের সঙ্গে ৫০০ টাকার চুক্তি করেছি বরিশাল নামিয়ে দেবে। ব্যবসার কাজে ঢাকা এসে আটকে পড়েছিলাম। বাড়িতে যাওয়া জরুরি তাই ট্রাকে যাচ্ছি।

দেশের প্রতিটি জেলা উপজেলা শহর ও বাজারগুলোতেও রাজধানীর মতো মানুষের আনাগোনা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন মানবকণ্ঠের জেলা উপজেলা প্রতিনিধিরা।

তাদের পাঠানো তথ্যে জানা যায়, গতকাল বাজারগুলো বেশ জমজমাট হয়ে উঠছে। বাজারে অধিকাংশ ক্রেতা মাস্ক না পরেই এসেছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার জট লেগেই ছিল। এ ছাড়া সড়কে ভ্যান নিয়ে সবজি ও ফলমূল বিক্রেতাদের উপস্থিতিও বেড়েছে। বিভিন্ন স্থানে দু-তিনটি করে ভ্যান দাঁড়িয়ে অস্থায়ী বাজারের মতো তৈরি করতেও দেখা গেছে।

সকালে বাজার ও দোকানগুলোতে লোকজন কিছুটা কম থাকলেও বিকেলে তৈরি হয় ঈদের আমেজ। দোকানের অর্ধেক শাটার খোলা ও প্রশাসনের টহলের খবরাখবর রেখে দোকান খুলছেন ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন এলাকায় দিনমজুরদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন জনপ্রতিনিধিরা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, মানুষের মধ্যে এখনি ঘরে থাকার ব্যাপারে এবং নিয়মকানুন মানার ক্ষেত্রে শিথিলভাব এলে সেটা হবে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা এখনো বুঝতে পারিনি আমাদের জন্য সামনে কী অপেক্ষা করছে, কতটা ঝুঁকিতে পড়ব আমরা।

আইইডিসিআর যে পরীক্ষা করছে, এত কম লোক কি আক্রান্ত? সরকারের উচিত হটলাইন বাড়ানো। তা হলে নমুনাও বেশি আসবে, পরীক্ষা বেশি হবে, প্রকৃত অবস্থাও বোঝা যাবে। সংবাদ সম্মেলনে করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এক ধরনের স্বস্তি প্রকাশের ব্যাপারে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, এখনো করোনার যে পরিস্থিতি, তাতে সন্তুষ্ট হওয়ার কিছু নেই। এভাবে প্রচার করা ঠিক হচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, আইইডিসিআর সংবাদ সম্মেলনে বলা হচ্ছে, ৬২ জন আইসোলেশনে আছেন। আর ৩২ জন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে আছেন। তাহলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী ওই ৬২ জনকে আক্রান্ত বলতে হবে। কিন্তু এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) উপদেষ্টা রোগতত্ত¡বিদ অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান গণমাধ্যমে বিস্তারিত বলতে অস্বীকৃতি জানান।

তবে তিনি বলেন, করোনা আক্রান্ত হলেই তাকে আইসোলেশন করা হয়। আর কোয়ারেন্টাইন হলো আক্রান্ত নন। কিন্তু আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকার ইতিহাস আছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, আইইডিসিআর পুরো বিষয়টি নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। সংক্রমিত না হলে আইসোলেশনের প্রশ্ন কেন আসবে? তাকে তো কোয়ারেন্টাইনে রাখার কথা ছিল। আবার কোয়ারেন্টাইন তাহলে কাদের করা হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়া জরুরি।

অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে করোনা সন্দেহে মৃত্যুর খবর আসছে। সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। ওইসব ব্যক্তিরা করোনা পজিটিভ হলে তাদের সংস্পর্শে যারা ছিলেন তাদেরকেও জরুরি ভিত্তিতে কোয়ারেন্টাইন করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, করোনার লক্ষণ-উপসর্গ আছে সন্দেহভাজন- এমন ব্যক্তিদের হাসপাতালে ভর্তি করে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। কিন্তু তারা এখনো করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়নি। তাদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। আর আক্রান্ত দেশ থেকে ফেরত আসা কিংবা তাদের সংস্পর্শে ছিলেন এমন ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।

 

 




Loading...
ads






Loading...