দেশের জন্য ‘ক্রুসিয়াল টাইম’ আগামী ১৪ দিন

দেশের জন্য ‘ক্রুসিয়াল টাইম’ আগামী ১৪ দিন
দেশের জন্য ‘ক্রুসিয়াল টাইম’ আগামী ১৪ দিন - ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ০১ এপ্রিল ২০২০, ০০:৩৭

করোনা আতঙ্কে কাঁপছে বিশ্ব। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) হিসেবে ইতোমধ্যে দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৫১ জন আর মারা গেছেন ৫ জন। আগামী দিনগুলোতে কী হবে? পরিস্থিতি কি আরো ভয়াবহ হবে? নাকি পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে? এ প্রশ্ন এখন সবার মনে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নভেল করোনা ভাইরাসের ইনকিউবিশন পিরিয়ড বা রোগসঞ্চার থেকে প্রথম লক্ষণ দেখা দেয়ার সময় (সুপ্তাবস্থা) কমপক্ষে ১৪ দিন। এ কারণে আগামী দুই সপ্তাহ আমাদের জন্য ‘ক্রুসিয়াল টাইম’ বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়।

তারা বলছেন, এরই মধ্যে যদি কেউ সংক্রমিত হয়ে থাকেন তাহলে তার লক্ষণ প্রকাশ পাবে আগামী কয়েক দিনে। এ কারণে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন থেকে রক্ষা পেতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মেয়াদ বাড়নো হয়েছে। এর আগে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলেও তা বাড়িয়ে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়েছে।

সূত্র মতে, গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম একজন করোনা রোগী শনাক্ত হন। এরপর তার সংস্পর্শে এসে আরো কয়েকজন ভাইরসাটিতে আক্রান্ত হন। তারপরেও ২০ এ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক রুটে বিমান চলাচল অব্যাহত ছিল। ২০ এ মার্চ থেকে মাত্র ৪টি রুটে বিমান চলাচল অব্যাহত রেখে বাকি সমস্ত রুটের বিমান চলাচল বন্ধ করা হয়েছে।

৮ মার্চ থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত এই ১২ দিনে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে এসেছেন ৬ লাখেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি। এদের বিমানবন্দরে যে স্ক্রিনিং করা হয়েছে সেই স্ক্রিনিংয়ে করোনা ভাইরাস ধরা পড়ে না।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, বিমান বন্দরে যে স্ক্রিনিং করা হয় সেটি নেহাত প্রাথমিক পরীক্ষা। ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দিয়ে পরীক্ষা করা হয় যে ওই ব্যক্তির তাপমাত্র বেশি কিনা এবং তার জ্বর ও সর্দি কাশি আছে কিনা। যাদের মধ্যে এসব সিনড্রম থাকে না, তাদের ছেড়ে দেয়া হয় এবং যাদের ওগুলো থাকে তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। যাদের বিষয়টি কিছুটা জটিল মনে হয় তাদের সরকারি কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ ৬ লক্ষাধিক প্রবাস ফেরতদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক লোক বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের স্পর্শে এসেছেন। এর ফলে ওই বিদেশ ফেরত লোকদের ভেতরে করোনা ভাইরাস বাস করছে কিনা অথবা তাদের সংস্পর্শে আসা নতুনদের মাঝে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে কিনা সেটি ধরা পড়তে কম করে হলেও সর্বনিম্ন ১০ দিন এবং সর্বোচ্চ ২১ দিন লাগবে। এই ২১ দিনই হচ্ছে পিক টাইম বা স্প্রেডিং টাইম। যারা ইতোমধ্যেই বিদেশ থেকে ওই রোগটি নিয়ে এসেছেন তারা এর মধ্যে স্বদেশে যাদের সঙ্গে মেলা মেশা করেছেন তাদের মধ্যে যারা সংক্রমিত হয়েছেন তাদের সংক্রমণও প্রকাশ পাবে ওই সময়ের মধ্যে।

এ প্রসঙ্গে দেশের প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘যারা দেশের বাইরে এসেছেন তাদের কোয়ারেন্টাইন পিরিয়ড এখনো শেষ হয়নি। কয়েকদিন গেছে, কিন্তু অপেক্ষা করতে হবে। আর কেউ যেন দেশের বাইরে থেকে না আসতে পারে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। একই সঙ্গে সতকর্তা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।’

তিনি বলেন, করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ভারতে বাড়ছে, সেই ভয়ও রয়েছে। আমাদের দেশে শনাক্তের হার কম হলেও আত্মতুষ্টিতে যেন না ভুগি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘যেদিন থেকে ঢাকা থেকে মানুষ বাইরে গেল সেদিন থেকে একটা কোয়ারেন্টাইন পিরিয়ড দেখতে হবে এবং সেটা ১৪ দিন, ততদিন পর্যন্ত সময় দিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, পরীক্ষা ছাড়া কয়েক রোগী মারা গেলেন। তাদের অনেকের স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সেটা করা উচিত এবং সেই স্যাম্পলের ফলাফলের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। সেগুলো যদি একটাও পজিটিভ হয় তাহলে বুঝতে হবে করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়েছে। তাই আগামী ১৪ দিন খুবই ক্রুসিয়াল আমাদের জন্য।’

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা বলেন, ‘মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে আসছে, কিন্তু তাদের বাড়িতে থাকতে হবে। আপনারা ঘরে থাকুন, এটা অত্যন্ত জরুরি। সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যই এসব নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে।’ তিনি সবাইকে ঘরে থাকার অনুরোধ করেন।

নতুন করে আরো ২ জন আক্রান্ত: গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ২ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতীয় রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এ নিয়ে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ৫১ জনে। আর মারা গেছেন পাঁচ জন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কোভিড-১৯ নিয়ে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলেন এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, নতুন আক্রান্ত দু’জনই পুরুষ। তাদের একজনের বয়স ৫৭ বছর। তিনি সৌদি আরব থেকে এসেছেন। তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন। তবে তার ডায়াবেটিস আছে। আরেকজনের বয়স ৫৫ বছর। তার বিদেশ ভ্রমণের কোনো ইতিহাস নেই। তারও ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ আছে। তারা দুজনই শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন। হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা চলছে।

তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় হটলাইনে ফোন এসেছে ৩ হাজার ৬৩টি। এর মধ্যে করোনা সংক্রান্ত কল এসেছে ২ হাজার ৯৯৭টি। আর গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে ১৪০ জনের। এর মধ্যে দু’জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। সর্বমোট এক হাজার ৬০২টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, করোনা আক্রান্তদের মধ্যে আরো ছয় জনের শরীরে সংক্রমণ আর নেই। তাদের মধ্যে একজনের বয়স ৭০ বছর। চার জনের বয়স ৩০-৪০-এর কোঠায়। একজনের বয়স ৪০-এর কোঠায়। এদের মধ্যে একজন নার্স। তিনি সুস্থ হয়েছেন। সব মিলিয়ে ২১ জন করোনামুক্ত হয়েছেন।

ডা. মীরজাদী বলেন, সারাদেশে এখনো প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৩৮ জন। আর ৭৫ জন আছেন আইসোলেশনে। আইইডিসিআরের পরিচালক জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় আইইডিসিআর, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান এবং চট্টগ্রামের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল ইনফেকশাস ডিজিজেজ (বিআইটিআইডি)-এ পরীক্ষাগুলো করা হয়েছে।

সৌদিতে বাংলাদেশির মৃত্যু: প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সৌদি আরবের অন্যতম ও মুসলিমদের দ্বিতীয় পবিত্র স্থান মদিনা শরীফে এক বাংলাদেশি মারা গেছেন।

বিশ্বে আক্রান্ত পৌনে ৮ লাখ, মৃত্যু ৩৭৮১৪: প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বেড়েই চলেছে। একই সঙ্গে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। এ পর্যন্ত গোটা বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৭ লাখ ৮৫ হাজার ৭১২ জন। মারা গেছেন ৩৭ হাজার ৮১৪ জন। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এক লাখ ৬৫ হাজার ৬০৬ জন।

বর্তমানে বিশ্বের দুইশ’র অধিক দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাস। আক্রান্তের দিকে দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে এ পর্যন্ত মোট এক লাখ ৬৪ হাজার ২৪৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ৩ হাজার ১৬৪ জন। সুস্থ হয়েছেন মাত্র ৫ হাজার ৬ জন। করোনায় এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মারা গেছে ইতালিতে। দেশটিতে এ পর্যন্ত ১১ হাজার ৫৯১ জনের প্রাণ নিয়েছে করোনা। আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ এক হাজার ৭৩৯ জন। সুস্থ হয়েছেন ১৪ হাজার ৬২০ জন।

গত ১৪ ঘণ্টায় ইতালিতে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৫০ জন। একদিনেই মারা গেছে ৮১২ জন। আক্রান্তের দিক দিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইউরোপের দেশ স্পেন। সেখানে এ পর্যন্ত মোট ৮৭ হাজার ৯৫৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন করোনা ভাইরাসে। প্রাণ গেছে ৭ হাজার ৭১৬ জনের। আর গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে আটশ’র বেশি।

গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। দেশটিতে এ পর্যন্ত মোট ৮১ হাজার ৫১৮ জন, মারা গেছে ৩ হাজার ৩০২ জন। আর সুস্থ হয়েছেন ৭৬ হাজার ৫২ জন। জার্মানিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৬ হাজার ৮৮৫। মারা গেছে মাত্র ৬৪৫ জন আর সুস্থ হয়েছেন সাড়ে ১৩ হাজার।

ফ্রান্সে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪৪ হাজার ৫৫০ জন। মারা গেছে ৩ হাজার ২৪ জন। আর সুস্থ হয়েছেন ৭ হাজার ৯২৭ জন। ইরানে আক্রান্ত ৪১ হাজার ৪৯৫, মারা গেছে ২ হাজার ৭৫৭ জন। সুস্থ হয়েছেন ১৩ হাজার ৯১১ জন। যুক্তরাজ্যে এ পর্যন্ত মারা গেছে এক হাজার ৪০৮ জন। আক্রান্ত হয়েছেন ২২ হাজার ১৪০ জন। সুস্থ হয়েছে মাত্র ১৩৫ জন।




Loading...
ads






Loading...