করোনা আতঙ্কের মধ্যেই রাজধানীতে ডেঙ্গুর হানা

করোনা আতঙ্কের মধ্যেই রাজধানীতে ডেঙ্গুর হানা
করোনা আতঙ্কের মধ্যেই রাজধানীতে ডেঙ্গুর হানা - ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ০১ এপ্রিল ২০২০, ০০:২৮

মরণব্যাধী করোনা ভাইরাসের গণহারে সংক্রমণ রোধ করে ঘরবন্দি রাজধানীবাসী। নিদারুণ উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় কাটছে দিন। এমন ভীতিকর পরিস্থিতিতে হাতছানি দিচ্ছে ডেঙ্গুর উপদ্রব। ইতোমধ্যে চলতি বছরের প্রথম দিন থেকে গত সোমবার পর্যন্ত সারা দেশে ২৭১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে।

এ মাসে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন চিকিৎসা গবেষকরা। এ পর্যন্ত মশা নিধনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। করোনা নিয়ে উদ্ভ‚ত পরিস্থিতিতে নগরজুড়ে মশার ওষুধ ছিটানো বন্ধপ্রায়। তবে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে বলে জানিয়ে সিটি কর্পোরেশনের একাধিক সূত্র।

এদিকে মশার উপদ্রব নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। গত সোমবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে করোনার বিপর্যয় মোকাবিলায় দিক-নির্দেশনা ও মতবিনিময় শীর্ষক বৈঠকে ডেঙ্গু মোকাবিলা ও মশা নিধনে ব্যবস্থা নিতে মেয়র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রীকে নির্দেশ দেন তিনি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সমন্বিত কৌশল নির্ধারণ ও দেশব্যাপী মশা নিধন করতে না পারলে এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি গতবারের চেয়ে ভয়াবহ হবে।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে চলতি বছর জরিপের ফলাফলে এডিস মশার ঘনত্ব ঝুঁকিপূর্ণ নয়, তবে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদফতরে ‘ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া প্রতিরোধে বিশেষ সেবা মাস-এপ্রিল ২০২০’র জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শানিলা ফেরদৌসি এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদফতরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় বর্ষা পূর্ববর্তী এডিস মশার ঘনত্ব জরিপের কাজটি এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এই জরিপটি গত ৫ মার্চ থেকে শুরু হয়ে ১৪ মার্চ পর্যন্ত ১০দিন চলে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৯৮টি ওয়ার্ডে ১০০টি স্থানে ২ হাজার ৯৯৬টি বাড়িতে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়।

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব ৫৬টি ওয়ার্ডে শূন্য। ৪৪টি ওয়ার্ডে ১০ থেকে ১৩ দশমিক ৩ এর মধ্যে। যেখানে ইনডেক্সে ২০ এর বেশি ঘনত্ব হলে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়। সে হিসেবে জরিপের ফলাফলে এডিস মশার ঘনত্ব ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যালেরিয়া এবং এডিস ট্রান্সমিটেড ডিজিজেজ এর ডেপুটি প্রোগ্রাম অফিসার ডা. আফসানা আলমগীর বলেন, ‘আমাদের ২২টি টিম এটা নিয়ে কাজ করছে। ৭২টি বাসায় এডিস পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩১টি ওয়ার্ড এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১৫, ১৬, ১৮, ২৮, ৪১ এবং ৫১ নম্বর ওয়ার্ডে এডিস পাওয়া গেছে। এতে আমাদের খুশি হলে চলবে না। কারণ মৌসুম আসছে সামনে। শুধুমাত্র সিটি কর্পোরেশন নয়, নিজেদেরই এখন থেকে সচেতন হতে হবে। নিজেদের আশপাশের জায়গাগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে।’

তবে নগরবাসীরা বলছেন, প্রতিদিন সকাল-বিকেল দুবার ওষুধ ছিটানোর পরও মশার যন্ত্রণা থেকে নিস্তার মেলা ভার। আর সিটি কর্পোরেশনের মশকনিধন কর্মীদের তৎপরতা কদাচিৎ চোখে পড়ছে। কাজেই মশার উৎপাত বেড়ে গেছে। তারা বলছেন, করোনা-সঙ্কটের মধ্যেই এ বছরও যদি গত বছরের মতো ডেঙ্গু ছড়িয়ে যায়, তা হলে পরিস্থিতি হবে খুবই ভয়াবহ।

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পরে বিজয়ী মেয়রদের শপথ অনুষ্ঠান হলেও তারা এখনো দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। আগামী ১৭ মে বর্তমান মেয়রদের দায়িত্বকাল শেষ হবে। এরপর নতুন মেয়ররা দায়িত্ব নেবেন। ঢাকা উত্তর সিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন ভারপ্রাপ্ত মেয়র আর দক্ষিণের দায়িত্বে আছেন বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকন। মশক নিধনে ঢাকার দুই সিটি কর্তৃপক্ষ বেশ ঘটা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে জানালেও তা থেমে আছে সেখানেই। মাঠে তা এ পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি, অভিযোগ সাধারণ মানুষের।

উত্তরের কিছু এলাকায় মশার ওষুধ ছিটানো হলেও দক্ষিণে তা-ও হয়নি। এর বাইরে উত্তর কর্তৃপক্ষ মশক নিধনে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে বেশকিছু ক্যাম্পেইন, সভা-সমাবেশও করেছে। মশা নির্মূলে কয়েকটি ওয়ার্ডে ক্রাশ প্রোগ্রামও চালানো হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য বলে জানান নগরবাসী।

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে বলে জানান ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর রহমান।

তিনি বলেন, করোনার কারণে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম যেন চাপা না পড়ে এ জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে সচেতন করার চেষ্টা করা হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর এ সময়ে ডেঙ্গু ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ায় নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো হয়েছিল। যদিও সেসব ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে ঢের প্রশ্ন ছিল। কিন্তু এ বছর নগর কর্তৃপক্ষের যাচ্ছেতাই ঢিলেমিতে এবং কোনো ক্রাশ প্রোগ্রাম না নেয়ায় মশা বেড়ে গেছে অনেক। এক্ষেত্রে সর্বাধিক বিপাকে আছে দুই সিটিতে নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডগুলো। এসব ওয়ার্ডে মশক নিধনে কোনো ধরনের উদ্যোগই চোখে পড়েনি, বলছেন ওয়ার্ডগুলোর বাসিন্দারা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, বিগত বছরগুলোয় দেখা গেছে, জানুয়ারি-ফেব্রæয়ারি মাসে এডিস মশার উপদ্রব ছিল না। কিন্তু এ বছর জানুয়ারির শুরু থেকেই নগরীতে এডিস মশার উৎপাত দেখা গেছে। তিনি বলেন, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এডিস মশা বাড়বে, বাড়বে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও। তাই বৃষ্টি হওয়ার আগেই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার উদ্যোগ নিতে হবে।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ায় মার্চে দেশের বেশিরভাগ হাসপাতালে জ্বর ও সর্দি-কাশি উপসর্গের রোগী কমে গেছে। এই রোগীদের বড় অংশই বাড়িতে চিকিৎসা নিয়েছেন। এরই প্রভাবে মার্চে কম ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এরপরও এ সংখ্যা গত বছরের চেয়ে বেশি। এ থেকেই বোঝা যায়, এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের চেয়ে অনেক খারাপ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের গত সোমবার পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২৭১ জন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে জানুয়ারিতে ১৯৯ জন, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ৩৮ জন। ফেব্রুয়ারিতে ৪৫ জন, যা গত বছর ছিল ১৮ জন ও মার্চে ২৭ জন, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ১৭ জন।

গত বছর ডেঙ্গুতে সারা দেশে ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন আক্রান্ত হয়। সরকারের রোগতত্ত¡, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) কাছে ডেঙ্গু সন্দেহে ২৬৬ জনের মৃত্যু তথ্য আসে। এদের মধ্যে ২৩৪টি মৃত্যু পর্যালোচনা শেষে ১৪৮ জনকে ডেঙ্গুতে মৃত্যু বলে নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠানটি।

রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এদের বেশিরভাগ এখনো সেভাবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেয়নি। অনেক বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটও নেই। করোনা আতঙ্কে বেশিরভাগ হাসপাতালের বহির্বিভাগে জ্বরের চিকিৎসা বন্ধ আছে। এমতাবস্থায় কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক উত্তম কুমার বড়ুয়া বলেন, ‘আমার ধারণা, আগামী মাসেই ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হতে পারে। আর এটা গত বছরের চেয়েও খারাপের দিকে যেতে পারে। কারণ বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীরা চিকিৎসা নিতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতেও এখন জ্বরের রোগীদের চিকিৎসার বিষয়ে কিছু দ্বিধা আছে।’




Loading...
ads






Loading...