পরিবারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছেন কারাবন্দিরা

পরিবারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছেন কারাবন্দিরা - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ২৭ মার্চ ২০২০, ০০:৩৭,  আপডেট: ২৭ মার্চ ২০২০, ০৯:৪৯

নভেল করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে দেশে প্রায় অবরুদ্ধ উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে সাক্ষাতের সুযোগ কমে আসায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বন্দিদের টেলিফোনে কথা বলার ব্যবস্থা করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের অধিকাংশ কারাগারে বন্দিদের সপ্তাহে একদিন টেলিফোনে পাঁচ মিনিট করে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়া হচ্ছে।

তবে ফোনে কথা বলার সুযোগ কারাবন্দি জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা পাবেন না। নতুন যেসব বন্দিকে কারাগারে আনা হচ্ছে তাদের থার্মোমিটারের মাধ্যমে শরীরের তাপমাত্রা নির্ণয় ও মুখে মাস্ক পরা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।

দেশের অন্য কারাগারের মতো চট্টগ্রামেও বুধবার থেকে ব্যবস্থাটি চালু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কারা কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে শুধু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন বন্দিরা। একজন বন্দী সপ্তাহে একবার করে পাঁচ মিনিট করে কথা বলতে পারবেন। এ জন্য তাদের পিসি (প্রিজনার ক্যাশ) অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতি মিনিটের জন্য এক টাকা করে কেটে নেয়া হবে।

জেল সুপার কামাল জানান, কারাগারে যেসব বন্দিরা বন্দিদের জন্য পোশাক তৈরি করতেন তারাই বর্তমানে মাস্ক তৈরিও করছেন। সাধারণ মাস্কের চেয়ে উন্নত ধরনের এ মাস্কগুলো তৈরিতে প্রতিটিতে ২৬/২৭ টাকা করে খরচ হচ্ছে। কারা ক্যান্টিনের মাধ্যমে সেগুলো বিক্রি করা হচ্ছে ৩০ টাকা দরে।

কারা কর্মকর্তারা জানান, নতুন যেসব বন্দিকে কারাগারে আনা হচ্ছে তাদের থার্মোমিটারের মাধ্যমে শরীরের তাপমাত্রা নির্ণয় করা হচ্ছে। পাশাপাশি ১৪ দিনের ভেতর তারা বিদেশ ভ্রমণ করেছেন কিনা কিংবা তাদের কোনো স্বজন বিদেশ থেকে এসেছেন কিনা সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। বন্দিদের সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করাহ হয়েছে। পাশাপাশি নতুন বন্দিদের ১৪ দিনের জন্য পুরাতন বন্দিদের থেকে আলাদা করে রাখা হচ্ছে। সে জন্য মহিলা ও পুরুষ বন্দিদের জন্য আলাদা দ্ুিট ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের বন্দিদের সঙ্গে তাদের স্বজনদের ফোনে কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি কারাগারের গার্মেন্টসটিতে বন্দিদের তৈরি করা মাস্ক মাত্র ১০ টাকায় বিক্রি করছে কারা কর্তৃপক্ষ। জেলা কারাগারের জেল সুপার সুভাষ কুমার ঘোষ এ তথ্য জানান। এর আগে সকালে জেল সুপার টেলিফোন বুথ উদ্বোধন করেন। এ বুথে মোট ১০টি টেলিফোন রয়েছে। সেখানে বন্দিদের কথোপকথন রেকর্ড করা হবে। প্রতি সপ্তাহে একবার একজন বন্দি তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অনধিক পাঁচ মিনিট কথা বলতে পারবেন।

জেল সুপার সুভাষ কুমার ঘোষ জানান, সারাবিশ্বে মহামারী করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবে কারাবন্দির স্বজনরা যেমন তাদের নিয়ে চিন্তিত তেমনি স্বজনদের নিয়েও বন্দিরা দুশ্চিন্তা করেন। এর মধ্যে করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি এড়াতে বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাতেও আমরা নিরুৎসাহিত করছি। এ জন্য সরকার বন্দিদের এ কথা বলার সুযোগ দিয়েছে। তবে আমরা বন্দিদের এ কথোপকথনের ওপর নজর রাখবো।

তিনি বলেন, বন্দিরা করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবে বাইরের সাধারণ মানুষের জন্য কারাগারের গার্মেন্টসে মাস্ক তৈরি করছেন। যা কারাগারের বাইরে ১০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এ ছাড়া কারারক্ষী ও কারাবন্দিদের জন্য মাস্কের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভেতরে ও বাইরে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান ও পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হয়েছে যেন কোনো সমস্যা না হয়।

বন্দিদের মন ভালো রাখা এবং কারাগারে স্বজনদের উপস্থিতি কমাতে এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারেও। তবে ফোনে কথা বলার সুযোগ পাবে না কারাবন্দি জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। জানা গেছে, গত মঙ্গলবার সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ মোবাইল ফোন বুথ উদ্বোধন করেন বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান ও জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম। কারা সূত্র জানায়, আনুষ্ঠানিকভাবে মোবাইল ফোন বুথ চালু করা হয়েছে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ। দু-একদিনের মধ্যেই এ কারাগারের বন্দিরাও ফোনে কথা বলার সুযোগ পাবেন।

এ জন্য ফোনসেট ও মোবাইল সিম সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। আর ফোনের বুথগুলোতে থাকবে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যাতে করে কোনো বন্দিরা ফোনে কথা বলার সময় অপরাধ কর্মকাণ্ড না ঘটাতে পারে বা অপরাধ সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য আদান প্রদান করতে না পারে।

বুথ থেকে শুধু কথার বলার সুযোগ থাকছে। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টায় প্রথম ধাপ ও ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপ চালু করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কথা বলতে পারবেন কারাবন্দিরা। নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলে কেউ আর কোনো সুযোগ পাবে না। আপাতত ২৫০ জন বন্দির জন্য থাকবে একটি বুথ।

এক্ষেত্রে কারাগারে আড়াই হাজার বন্দির জন্য থাকছে অন্তত ১০টি ফোন বুথ। নারী বন্দিদের জন্য থাকবে আলাদা ফোন বুথ। কারা অভ্যন্তরে স্থাপন করা ফোন বুথের নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকবেন কারারক্ষীরা। তাদের ফোন নম্বর দেয়ার পর তারা সেই নম্বরে সংযোগ করে বন্দিদের কথা বলার সুযোগ দেবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বন্দিরা উপস্থিত থেকে সিরিয়াল অনুযায়ী কথা বলার সুযোগ পাবে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আব্দুল জলিল বলেন, এটি সরকারের একটি মাইফলক সিদ্ধান্ত। এতে উপকৃত হবে কারাবন্দিরা। তারা কথা বলার সুযোগ পাবে পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে। বন্দিরা যখন কথা বলবে তখন আমাদের নজরদারিও থাকবে। আর কারাবন্দিদের আত্মীয়স্বজন দূরে থাকলেও তারা কারাগারে না আসলেও ফোনের মাধ্যমে বন্দির কাছ থেকে খবরাখবর পাবেন। এক্ষেত্রে কারাগারে বন্দিদের আত্মীয়-পরিজনের উপস্থিতি যেমন কমবে, তেমনি কারাবন্দিদের মন মানসিকতাও আরো উন্নত হবে।

তিনি আরো জানান, নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন কারণে ফোন বুথ থেকে কথার বলার সুযোগ পাবে না কারাবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসী ও জঙ্গিরা। যদি বন্দিরা এই সেবা পেয়ে উপকৃত হয়, তাহলে তাদের সুবিধার জন্য সিলেট প্রধান কারাগার ও কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ সুবিধা আরো বাড়ানো হবে।


মানবকণ্ঠ/এমএইচ





ads






Loading...