বাংলাদেশসহ  বিশ্ব পর্যটনে ধস

বাংলাদেশসহ  বিশ্ব পর্যটনে ধস - মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • আব্দুল্লাহ রায়হান
  • ১৩ মার্চ ২০২০, ০১:০১

সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস (কেভিড-১৯) আতঙ্কে বিশ্বজুড়ে পর্যটন খাতে ধস নেমেছে। বাংলাদেশেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। হোটেল-মোটেলগুলো পর্যটকের অভাবে হাহাকার করছে। করোনার প্রভাবে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের ক্ষতি ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকারও বেশি। আকাশপথে ঢাকা থেকে চীনসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রী ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় ফ্লাইট অর্ধেকে নামিয়েছে এয়ারলাইন্সগুলো।

প্রায় ৮০ শতাংশ বাংলাদেশি ভ্রমণকারী করোনার আতঙ্কে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ এশিয়ার প্রধান পর্যটন গন্তব্যগুলোতে বুকিংকৃত টিকিট বাতিল করেছে। এদিকে বাংলাদেশে তিনজনের আক্রান্তের খবরে বাংলাদেশে আসার পূর্বনির্ধারিত ভ্রমণও বাতিল করছে অনেক বিদেশি পর্যটক। বাংলাদেশে পর্যটক আগমন ৬০ শতাংশ কমে গেছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছে এয়ারলাইন্স ও পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলো। তাই পর্যটক আকর্ষণের জন্য বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে নিয়মিত ব্রিফ করার পরামর্শ দিয়েছেন এ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইকাও) তথ্যমতে, ৭০টি এয়ারলাইনস চীন থেকে সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করেছে এবং আরো ৫০টি এয়ারলাইনস সম্পর্কিত বিমান পরিচালনা বন্ধ করেছে। ফলে সরাসরি চীন থেকে আসা বিদেশিদের জন্য বিদেশি বিমান সংস্থার সক্ষমতা ৮০ শতাংশ কমেছে এবং চীনা এয়ারলাইনসের ধারণক্ষমতা কমেছে ৪০ শতাংশ।

আইকাও বলছে, বৈশ্বিক এয়ারলাইনসের পূর্বাভাসের তুলনায় যাত্রী কমেছে প্রায় দুই কোটি বা ১৬.৪ শতাংশ। এতে বিশ্বব্যাপী বিমান সংস্থাগুলোর জন্য মোট অপারেটিং রাজস্ব কমেছে ৫০০ কোটি ডলার। জাপান পর্যটন উপার্জনে ১২৯ কোটি ডলার হারাতে পারে। এরপর থাইল্যান্ডের ক্ষতি হবে ১১৫ কোটি ডলার।

অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সূত্রে জানা যায়, করোনা আতঙ্কে বাংলাদেশিরা বাইরে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে বিশেষ করে সংক্রামক দেশগুলোতে পূর্বনির্ধারিত টিকিট বাতিল করছে। একইভাবে বিদেশি পর্যটকরাও বাংলাদেশ সংক্রমিত হওয়ায় বুকিং টিকিট বাতিল করছে। বর্তমান সময়ে ভরা পর্যটন মৌসুমে এমন প্রতিক‚ল পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ট্যুর অপারেটররা। তারা জানান, হোটেল বুকিং, উড়োজাহাজের টিকিট বুকিং বাতিল করছে ৮০ শতাংশ পর্যটকই। যাত্রীরা রিফান্ড (টাকা ফেরত) নিচ্ছেন। শুধু চীনের গন্তব্যগুলোতেই শুধু খারাপ অবস্থা নয়, অন্যান্য দেশেও এই প্রভাব পড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা আতঙ্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের পর্যটন, ওমরাহ ও এয়ারলাইন্স খাতে। মোটকথা সব ধরনের পর্যটনে লেগেছে বড় ধরনের ধাক্কা। তারা বলছেন, ইনবাউন্ড, আউটবাউন্ড ও ডমেস্টিক সব ফর্মেটেই পর্যটনের অবস্থা শোচনীয়। পর্যটনের প্রধান অবলম্বন এয়ারলাইন্স ও হোটেল-মোটেল। শুধু করোনার কারণে এসব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হোটেল-মোটেলগুলো পর্যটকের অভাবে হাহাকার করছে। করোনা ভাইরাসের কারণে এয়ারলাইন্সগুলোর যাত্রী কমেছে ৭৫ শতাংশের বেশি। এরই মধ্যে সৌদি সরকার কর্তৃক হঠাৎই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে ওমরাহ পালনের ওপর। ওমরাহর ভর মৌসুমে এ ধরনের বিধিনিষেধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ কয়েকটি বিদেশি এয়ারলাইন্স। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে বিমান ঘোষণা দিয়েছে বিক্রিত টিকিট ফেরত প্রদানের।

কক্সবাজার, কুয়াকাটা, বান্দরবন, খাগড়াছড়ির হোটেল মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, হোটেলগুলো একদম ফাঁকা। কোনো গেস্ট নেই। তারা বলছেন, প্রতি বছর ৪ থেকে ৫ লাখ বিদেশি পর্যটক আসেন বাংলাদেশ ভ্রমণে। এর একটি বড় অংশ চীনা পর্যটক, যা এখন বন্ধ। এ কারণে আমরা সময়ের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় আছি।

হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, বিমানবন্দরে ভাইরাস শনাক্তকরণ কার্যক্রম সঠিকভাবে মেনে চলার জন্য সবাইকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এদিকে যাত্রী কমে যাওয়ায় চীন থেকে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনাকারী এয়ারলাইন্সগুলো গত সপ্তাহ থেকে ফ্লাইট অর্ধেকের বেশি কমিয়ে এনেছে। এ ছাড়া ঢাকা-সিঙ্গাপুর রুটেও ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি কমাচ্ছে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স।

ফ্লাইটের বুকিং বাতিল করা ছাড়াও টিকিট কনফার্ম (নিশ্চিত) থাকা সত্তে¡ও যাত্রী বিমানবন্দরে উপস্থিত না হওয়ার (নো শো) হার বাড়ছে। বিমানবন্দরে দায়িত্বরত চায়না সাউদার্নের কর্মকর্তা জানান, গুয়াংজুগামী ফ্লাইটে কনফার্মেশন কমছেই। নো শো হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

চীন থেকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, চায়না ইস্টার্ন ও চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সে প্রতিদিন ছয়টি ফ্লাইটে বাংলাদেশে ঢুকছে ৭০০ যাত্রী। পর্যটন, ব্যবসা ও চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশিদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান সিঙ্গাপুর। সেখানকার পর্যটন এলাকাগুলো এখন জনশূন্য, রাস্তাঘাটও ফাঁকা। যাত্রী আগমন ও সেবা বিবেচনায় একাধিকবার বিশ্বে শীর্ষস্থান পেয়েছে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর। কিন্তু করোনা ভাইরাস আতঙ্কে এরই মধ্যে যাত্রী হারাতে শুরু করেছে বিমানবন্দরটি।

আটাব সভাপতি মনছুর আহমদ কালাম বলেন, এত প্রভাব পড়বে তা আমাদের হিসাবের বাইরে ছিল। টিকিটের ৮০ শতাংশই বাতিল হচ্ছে, যাত্রীরা রিফান্ড (টাকা ফেরত) নিচ্ছেন। শুধু চীনা ফ্লাইটেই খারাপ অবস্থা নয়, অন্যান্য দেশেও এই প্রভাব পড়ছে। বলা চলে বিশ্ব পর্যটনে ধস নেমেছে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএম তৌহিদ-উল-আহসান মানবকণ্ঠকে বলেন, বিমানবন্দরে ভাইরাস শনাক্তকরণ কার্যক্রম সঠিকভাবে মেনে চলার জন্য সবাই তৎপর। যাত্রী কমে যাওয়ায় চীন থেকে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনাকারী এয়ারলাইন্সগুলো গত সপ্তাহ থেকে ফ্লাইট অর্ধেকের বেশি কমিয়ে এনেছে। এ ছাড়া ঢাকা-সিঙ্গাপুর রুটেও ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি কমাচ্ছে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স।

টোয়াব সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান বলেন, পর্যটনের একটি বড় বাজার চীন। করোনা ভাইরাসের কারণে উভয় পর্যটনেই বড় ধাক্কা লেগেছে। এর ওপর আবার সিঙ্গাপুর, চীন, থাইল্যান্ড, জাপানসহ আরো কিছু গন্তব্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আমাদের ট্যুর অপারেটররা বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বেসরকারি পর্যটন প্রতিষ্ঠান জার্নি প্লাসের প্রধান নির্বাহী (সিইও) তৌফিক রহমান বলেন, আমার ছয়টি গ্রæপের প্রায় ১০০ জন বাংলাদেশে ভ্রমণ বাতিল করেছেন। এতে অন্য মাত্রার ক্ষতি হচ্ছে। সরকারের উচিত প্রতি সপ্তাহে বাংলাদেশ করোনা ভাইরাসমুক্ত এই প্রেস নোট প্রতিনিয়তই আমাদের পর্যটক আসা দেশগুলোসহ বহির্বিশ্বে প্রচার করা।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মহিবুল হক বলেন, করোনার কারণে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যাত্রী কমে যাওয়ায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও ক্ষতির মুখে পড়েছে। উদ্ভ‚ত পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনের জন্য বড় ধাক্কা বলে মনে করছেন তিনি। বিশ্বের উদীয়মান পর্যটন গন্তব্যে থাকা চীনের আশপাশের সিঙ্গাপুর, জাপান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ ঝুঁকিতে পড়েছে। করোনা সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে চীনসহ আরো ছয় দেশের নাগরিকদের জন্য অন অ্যারাইভাল (আগমনী) ভিসা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এমএইচ




Loading...
ads






Loading...