জ্বালানি খাতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ছে

মানবকণ্ঠ
জ্বালানি খাতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ছে - মানবকণ্ঠ।

  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ০৫ মার্চ ২০২০, ১১:০৩

ক্রমেই সক্ষমতা বাড়ছে জ্বালানি খাত নিয়ে গবেষণা ও কাজ করা দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর। গ্যাসক‚প আবিষ্কার ও গ্যাস উত্তোলনের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এখন আর ধর্না দিতে হয় না বাংলাদেশকে। পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) এই দুটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান এ পর্যন্ত দেশে আবিষ্কৃৃত ৩০টি গ্যাসক্ষেত্রের অর্ধেকই (১৫টি) আবিষ্কার করেছে। শুধু তাই নয়, ক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলন করে জাতীয় গ্রিডে মজুদও করছে তারা। গত পরশুও নতুন একটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে বাপেক্স।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগরের শ্রীকাইলে এই গ্যাসক্ষেত্রটি থেকে প্রতিদিন আরো অন্তত ১২ মিলিয়ন ঘনফুট বেশি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়ার আশা করছে তারা। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্রের ৫ নম্বর ক‚প থেকে গ্যাস উঠতে শুরু করে। কিন্তু তখন গ্যাসের সঙ্গে প্রচুর পানি উঠছিল। ফলে গ্যাস প্রাপ্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে অপেক্ষা করছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। গতকাল বুধবার দুপুরের পর থেকে পানি ওঠা কমে এলে গ্যাস পাওয়ার বিষয়ে বাপেক্স অনেকটাই নিশ্চিত হয়। বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মো. আব্দুল হান্নান গতকাল বুধবার জ্বালানি বিভাগকে জানান, ক‚পটিতে গ্যাসের চাপ ছিল ১ হাজার ৮৮০ পাউন্ড/ইঞ্চি (পিএসআই)। এখন ক‚পটি পরিষ্কার করার কাজ চলছে। এই কাজ শেষ হলেই ক‚পটি থেকে কী পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাবে তা নিশ্চিত করে বলা যাবে।

শ্রীকাইল পূর্ব-১ গ্যাসক্ষেত্রের প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ কবীর জানান, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ত্রিমাত্রিক ভ‚-তাত্তি¡ক জরিপের পর গ্যাসের অস্তিত্ব জানতে পারে বাপেক্স। পরে ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর নবীনগর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা হাজীপুর গ্রামে কৃষিজমির মধ্যে রিগ বসিয়ে প্রকল্পের খনন কাজ শুরু করে বাপেক্স। ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি খনন কাজ শেষ হয়। এরপর নানা খুঁটিনাটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গত মঙ্গলবার রাত থেকে পরীক্ষামূলকভাবে পাইপের মুখে আগুন দিয়ে গ্যাসের চাপ পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়। যে জায়গা থেকে আগেই গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে, শ্রীকাইলের সেই অংশটি কুমিল্লা জেলার ভেতরে। আর নতুন ক‚পটি ছয় কিলোমিটার দূরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমানার ভেতরে। শ্রীকাইল পূর্ব-১ গ্যাস প্রকল্পের খনন কর্মকর্তা মুহাম্মদ মহসিন আলম জানান, প্রাথমিকভাবে এই ক‚পে গ্যাসের চাপ বেশ ভালো পাওয়া যাচ্ছে। আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রসেস প্ল্যান্টে এই গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বাপেক্সের মহাব্যবস্থাপক (ভ‚-তত্ত¡) মো. আলমগীর হোসেন জানান, মাটির নিচে প্রায় তিন হাজার ৮০ মিটার গভীরে গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। গ্যাসের রিজার্ভ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, এই ক‚প থেকে দৈনিক ১২ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এটি মুজিববর্ষে দেশীয় কোম্পানি বাপেক্সের পক্ষ থেকে জাতির জন্য উপহার। সূত্রমতে, বর্তমানে দেশে ২৯টি প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। প্রথম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৫৫ সালে সিলেটের হরিপুরে এবং সর্বশেষ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল ২০১৭ সালে ভোলায়। তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র হলো তিতাস গ্যাসক্ষেত্র। এটি ১৯৬২ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানি কর্তৃক আবিষ্কৃত হয়। প্রথম গ্যাস উত্তোলন শুরু হয় ১৯৫৭ সালে। তবে সদ্য আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রটিসহ বর্তমানে দেশের গ্যাসক্ষেত্রের সংখ্যা ৩০টি।

সূত্র জানায়, প্রথম আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র হরিপুর গ্যাসক্ষেত্রটি ১৯৫৫ আবিষ্কার করে সিলেট বার্মাওয়েল কোম্পানি, এরপর দ্বিতীয়টি ছাতক গ্যাসক্ষেত্র ১৯৫৯ সালে আবিষ্কৃত করে সুনামগঞ্জ বার্মাওয়েল। অন্য গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মধ্যে হবিগঞ্জের রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্র ১৯৬০ সালে আবিষ্কার করে পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানি, একই কোম্পানি ১৯৬২ সালে আবিষ্কৃত করে সিলেটের কৈলাসটিলা গ্যাসক্ষেত্র, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্র ও ১৯৬৩ সালে হবিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্র। ১৯৬৯ সালে ওজিডিসি আবিষ্কার করে খাগড়াছড়ির সেমুতাং গ্যাসক্ষেত্র, একইসালে কুমিল্লার বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানি, ১৯৭৭ সালে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে ইউনিয়ন ওয়েল, একই সালে পেট্রোবাংলা আবিষ্কার করে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রটি। ১৯৮১ সালে পেট্রোবংলা আবিষ্কার করে তিনটি ক্ষেত্র। এগুলো হচ্ছেÑ সিলেটের বিয়ানীবাজার গ্যাসক্ষেত্র, ফেনী গ্যাসক্ষেত্র ও গাজীপুরের কামতা গ্যাসক্ষেত্র। ১৯৮৯ সালে আবিষ্কৃত হয় আরো দুটি হ্যাসক্ষেত্র। এর মধ্যে সিলেটের জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রটি আবিষ্কার করে সিমিটার নামে একটি প্রতিষ্ঠান আর ফেঞ্চুগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রটি আবিষ্কার করে পেট্রোবাংলা। পরের বছর ১৯৯০ সালেও পেট্রোবাংলা নরসিংদীর মেঘনা গ্যাসক্ষেত্র ও নরসিংদী গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯৫ সালে বাপেক্স আবিষ্কার করে ভোলার শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র। পরের বছর ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রামের সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রটি আবিষ্কার করে কেয়ার্ল এনার্জি নামে একটি প্রতিষ্ঠান। একই বছরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সালদা গ্যাসক্ষেত্রটি আবিষ্কৃত করে বাপেক্স। ১৯৯৭ সালে মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্রটি আবিষ্কার করে ইউনিকল নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটিই পরের বছর ১৯৯৮ সালে হবিগঞ্জের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রটি আবিষ্কার করে। এরপর আবিষ্কৃত ৭টি গ্যাসক্ষেত্রের সবকটিই আবিষ্কার করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০০৫ সালে আবিষ্কৃত কুমিল্লার লালমাই গ্যাসক্ষেত্র, একই বছরে আবিষ্কৃত কুমিল্লার ভাঙ্গুরা গ্যাসক্ষেত্র, ২০১১ সালে নোয়াখালীর সুন্দলপুর গ্যাসক্ষেত্র, একই বছরে সুনেত্র গ্যাসক্ষেত্র, ২০১২ সালে কুমিল্লার শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্র, ২০১৭ সালে পাবনা গ্যাসক্ষেত্র এবং ভোলা উত্তর-১ গ্যাসক্ষেত্র। সর্বশেষ এ বছরের (২০২০ সাল) ০৩ মার্চ আবিষ্কৃত হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া নবীনগরের শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্র।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে গ্যাস সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করায় শিল্প-কারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের বিষয়টি স্বস্তিদায়ক, সন্দেহ নেই। নতুন এ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের খবর শুনে দেশবাসী আশা করবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অব্যাহত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে শিগগিরই দেশে আরো নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হবে। বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো হলে প্রতিষ্ঠানটি আরো অনেক সুখবর দিতে পারবে বলে আশা করছেন তারা। একইসঙ্গে স্থলভ‚মির পাশাপাশি বিশাল সমুদ্রে অনুসন্ধান চালালে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান মিলবে বলেও আশা করেন তারা।



poisha bazar