এনু-রূপনের বাসা যেন টাকশাল

এনু-রূপনের বাসা যেন টাকশাল - মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০১:৩৫

সরকারি দলের রাজনীতির সাইনবোর্ড লাগিয়ে অবৈধ ক্যাসিনোকাণ্ডে (জুয়া) ও চাঁদাবাজি করে বিত্তের পাহাড় গড়েছেন পুরান ঢাকার ওয়ারীর দুই সহোদর এনামুল হক এনু ও রূপন ভূইয়া। কামিয়েছেন কাড়ি কাড়ি টাকা। গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের নেতা গ্রেফতারকৃত এই দুই ভাইয়ের রয়েছে ঢাকায় অন্তত ২৪ বাড়ি। এনামুল ও রূপন গত ছয় থেকে সাত বছরে পুরান ঢাকায় বাড়ি কিনেছেন কমপক্ষে ১২টি।

ফ্ল্যাট কিনেছেন ৬টি। তাদের বাসাগুলো যেন এক একটি টাকশাল। তাদের মালিকানাধীন ওয়ারীর লালমোহন সাহা স্ট্রিটের ১১৯/১ মমতাজ ভিলায় অভিযান চালিয়ে ৫টি সিন্দুক ভরা নগদ সাড়ে ২৬ কোটি টাকা, এক কেজি সোনা ও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

গতকাল মঙ্গলবার ভোরে তাদের ওই বাসায় অভিযান চালানো হয়। স্থানীয়রা জানান, এনামুল হক এনু ও রূপন ভূঁইয়া এই দুই ভাইয়ের মূল পেশা জুয়া। আর নেশা হলো বাড়ি কেনা। র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, এনামুল-রূপন ক্যাসিনো ও চাঁদাবাজি থেকে অবৈধভাবে এই সম্পদ অর্জন করেছে। তাদের সম্পদের আরো খোঁজ নিতে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।

 সিন্দুক, বস্তা ও কয়েকটি ব্যাগভর্তি এসব টাকার মালিক ক্যাসিনো মামলার আসামি তারা দুই ভাই। ওয়ারীর লালমোহন সাহা স্ট্রিটের ছয় তলার বাড়িটির নিচতলা পুরোটিই যেন টাকার গোডাউন। এনামুল-রূপন র‌্যাবের হাতে আটক হওয়ার পর বাড়িটি ব্যবহার হতো তাদের অবৈধ টাকার গোডাউন হিসেবে। শুধু টাকা নয়, আছে বৈদেশিক মুদ্রা, এফডিআর, বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের গচ্ছিত টাকার চেক বই। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার মধ্যরাতে বাড়িটি ঘেরাও করে র‌্যাব। পরে নিচতলার একটি ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে দুটি রুমে থাকা এসব সিন্দুক ও টাকার ব্যাগের সন্ধান পায় র‌্যাব।

অভিযান শেষে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল রকিবুল হাসান। তিনি জানান, ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা দুই ভাই এনামুল হক ও রূপন ভূঁইয়ার পুরান ঢাকার একটি বাসার ৫টি সিন্দুক থেকে নগদ ২৬ কোটি ৫৫ লাখ ৬০০ টাকা পেয়েছে র‌্যাব। এ ছাড়া ওই বাসা থেকে সোয়া পাঁচ কোটি টাকার এফডিআরের বই, এক কেজি স্বর্ণ, ৯ হাজার ২০০ ইউএস ডলার, ১৭৪ মালয়েশিয়ান রিংগিত, ৩৫০ ভারতীয় রুপি, ১ হাজার ৫৯৫ চায়নিজ ইয়েন, ১১ হাজার ৫৬০ থাই বাথ ও ১০০ দিরহাম জব্দ করেছে র‌্যাব।

লে. কর্নেল রকিবুল আরো জানান, সোমবার শেষ রাতের দিকে র‌্যাব ওই বাসায় অভিযান শুরু করে। এর নেতৃত্বে ছিলেন র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। সরু গলির ওই বাসায় পাঁচটি সিন্দুকভর্তি টাকা ও পাঁচ কোটি টাকার এফডিআরের বইয়ের পাশাপাশি ক্যাসিনোর সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। বাসাটি খুব ছোট আকারে। এখানে মাত্র একটি চৌকি আছে। এটি ছয়তলা ভবনের নিচতলার একটি বাসা। ধারণা করা হচ্ছে, এ বাসায় টাকা রেখে কেউ এর পাহারায় থাকতেন। তবে এখান থেকে কাউকে আটক করা যায়নি।

র‌্যাব-৩ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়জুল ইসলাম জানিয়েছেন, ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত দুই ভাইয়ের ঢাকায় বহু ফ্ল্যাটবাড়ি রয়েছে। এখন পর্যন্ত তাঁরা ২৪টি বাড়ির খোঁজ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে তারা পুরান ঢাকার এ বাড়ির খোঁজ পান। এর পরপরই এখানে অভিযান চালিয়ে এসব সম্পদ জব্দ করা হয়। জব্দ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার কীসের বা কোথা থেকে এলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তদন্তের মাধ্যমে বের করা হবে। কোথা থেকে এসেছে, কার কাছে ছিল, গন্তব্য কোথায় ছিল তা ইনভেস্টিগেশন করে বের করা হবে।

র‌্যাব জানায়, গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর এনামুল ও রূপনের বাসায় এবং তাদের দুই কর্মচারীর বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। সেখান থেকে পাঁচ কোটি টাকা এবং সাড়ে সাত কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এরপর সূত্রাপুর ও গেণ্ডারিয়া থানায় তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। এনামুল ও রূপন গত ছয় থেকে সাত বছরে পুরান ঢাকায় বাড়ি কিনেছেন কমপক্ষে ১২টি। ফ্ল্যাট কিনেছেন ৬টি। পুরোনো বাড়িসহ কেনা জমিতে গড়ে তুলেছেন নতুন নতুন ইমারত। স্থানীয় লোকজন জানান, এই দুই ভাইয়ের মূল পেশা জুয়া। আর নেশা হলো বাড়ি কেনা।

স্থানীয়রা আরো জানান, ২০১৮ সালে এনামুল পান গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ। আর রূপন পান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ। তাদের পরিবারের পাঁচ সদস্য, ঘনিষ্ঠজনসহ মোট ১৭ জন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগে পদ পান। সরকারি দলের এসব পদ-পদবি জুয়া ও ক্যাসিনো কারবার নির্বিঘেœ চালানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন তারা।

এদিকে ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার আলোচিত দুই ভাই গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি এনামুল হক এনু ও বহিষ্কৃত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রূপন ভূইয়ার বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে দায়ের করা মানি লন্ডারিংয়ের চারটি মামলা তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এক মাসেরও বেশি সময় তদন্ত করে, এমনকি এনু-রূপনকে রিমান্ডে নিয়েও বিপুল পরিমাণ অবৈধ টাকার হদিস পায়নি সিআইডি।

গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর এই দুই ভাইয়ের বাড়ির সিন্দুক থেকে নগদ ১ কোটি পাঁচ লাখ টাকা, প্রায় আড়াই কেজি সোনা-গয়নাসহ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় সাতটি মামলা হয়। এর মধ্যে মানি লন্ডারিংয়ের চারটি মামলা তদন্ত শুরু করে সিআইডি। গত ১৩ জানুয়ারি সকালে ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে এনু ও রূপন এবং তাদের সহযোগী সানিকে ৪০ লাখ টাকাসহ গ্রেফতার করে সিআইডি। এরপর গত একমাসের বেশি সময় ধরে এনু ও রূপনকে নিয়ে সিআইডি কাজ করছে। এরমধ্যেই গতকাল মঙ্গলবার ভোরে এই দুই ভাইয়ের পুরান ঢাকার ওয়ারীর বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করল র‌্যাব-৩।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ বলেন, আমরা তদন্ত করছি। দুই ভাইয়ের অসংখ্য ফ্ল্যাটের সন্ধান পেয়েছি। তদন্ত চলছে। এরমধ্যে র‌্যাবও তাদের নিয়ে কাজ করছে। তাই তারা বিপুল পরিমাণ টাকা পেয়েছে। আমাদের সঙ্গে র‌্যাবের কথা হয়েছে। তারা নতুন করে মামলা করতে পারে অথবা আগের মামলাতেও এই অর্থ উদ্ধারের বিষয়টি যোগ হতে পারে। র‌্যাবের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টাকাগুলো অনেক আগে থেকেই এই বাড়িতে রাখা ছিল। বাড়িটি মূলত টাকার গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করতো তারা। এখানে কেউ বসবাস করতো না। সিসি ক্যামেরা দিয়ে বাড়িটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল। এই ঘটনায় নতুন মামলা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, আমরা এই ঘটনায় নতুন মামলা করব। কারণ এখানে দেশীয় মুদ্রা ছাড়াও বিদেশি মুদ্রা রয়েছে।

 

মানবকণ্ঠ/এমএইচ




Loading...
ads






Loading...