আমি নিকৃষ্ট লোক, ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীকে খুন করা হলো : রকিবের ডায়েরির সূত্র ধরে তদন্ত চলছে

ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীকে খুন - সংগৃহীত

poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০১:৪৭,  আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:১০

রাজধানীর দক্ষিণখানের প্রেমবাগান এলাকায় মা ও দুই সন্তান খুনের ঘটনায় নিহত গৃহবধূর স্বামী বিটিসিএলের উপ-সহকারী প্রকৌশলী রকিব উদ্দিন ভূঁইয়া ওরফে লিটন জড়িত বলে প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। তবে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন সন্দেহভাজন স্বামী। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা একটি ডায়েরির কিছু লেখার সূত্র ধরে চলছে এই ত্রিপল  মার্ডার মামলার তদন্ত।

রকিবকে গ্রেফতার অভিযানের পাশাপাশি রেললাইনে নতুন লাশ মেলার ব্যাপারেও খোঁজ নেয়া হচ্ছে। কারণ ঋণগ্রস্ত ও সংসারে অভাব অনটনের হতাশা থেকে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করতে পারেন বলে ধারণা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাপ্ত ডায়েরিতে লেখা আছে, ‘আমি নিকৃষ্ট লোক। ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীকে খুন করা হলো। আমার লাশ পাওয়া যাবে রেললাইনে।’ আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি, এটি সম্ভবত রকিব উদ্দিনেরই হাতের লেখা। তবে শতভাগ নিশ্চিত হতে হস্তরেখাবিদদের সহায়তা নেয়া হচ্ছে। কারণ তৃতীয় কোনো পক্ষও এমন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে অন্যকে ফাঁসাতে নাটক সাজাতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে ঘটনার পর গৃহকর্তার নিখোঁজ থাকার কথা নয়।

গত শুক্রবার সন্ধ্যার পর দক্ষিণখানের কে সি মডেল স্কুলের পেছনে প্রেমবাগান এলাকায় একটি বাড়ির পাঁচতলায় রকিবের বাসায় তার স্ত্রী মুন্নি বেগম (৩৭), তাদের ছেলে ফোরকান উদ্দিন (১২) ও মেয়ে লাইভার (৪) লাশ পাওয়া যায়। মুন্নিকে মাথায় ভারি বস্তুর আঘাতে ও শিশু দুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। পুলিশ জানায়, মুন্নির স্বামী রকিব উদ্দিন ভূইয়া উত্তরা বিটিসিএলের উপসহকারী প্রকৌশলী।

স্ত্রী ও সন্তান খুন হওয়ার পর থেকে তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে ধারণা করা হচ্ছে, তিনিই হয়তো স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যা করেছেন। এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত কিনা অথবা তিনজনকে হত্যার পর রকিবকে কেউ অপহরণ করেছে কিনা তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। রকিবকে ফাঁসাতে কেউ ডায়েরিতে এসব কথা লিখেছে কিনা, তাও সন্দেহ রেখে চলছে তদন্ত। এই তিন খুনের ঘটনায় শনিবার রাতে দক্ষিণখান থানায় মামলা করেছেন নিহত ওই নারীর ভাই মুন্না রহমান। মামলায় আসামি হিসেবে কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে সন্দেহের তীর ছুড়ে দেয়া হয়েছে ভগ্নিপতি রকিবের দিকে।

দক্ষিণখান থানার পরিদর্শক (অপারেশন) সরোয়ার হোসেন খান  জানান, তারা নিহত দম্পতির ঘরে একটি ডায়েরি পেয়েছেন, তার সূত্র ধরেই চলছে তদন্ত। ১২ ফেব্রুয়ারিতে লেখা ওই চিরকূটে নিজেকে ‘নিকৃষ্ট লোক’ হিসেবে তুলে ধরে দুই সন্তান ও স্ত্রী হত্যার কথা স্বীকারের পাশাপাশি আরো লেখা ছিল, তার লাশ রেললাইনে পাওয়া যাবে। পুলিশ কর্মকর্তা সারোয়ার বলেন, প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ডায়েরির হাতের লেখা রকিব উদ্দিনের।

তবে এটা পরীক্ষার পর আরো নিশ্চিত হওয়া যাবে। পুলিশ সূত্র জানায়, ডায়েরির লেখার পুলিশ রেলওয়ে পুলিশকে বলেছে, ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত কিংবা আহত অজ্ঞাতনামা কোনো ব্যক্তির খবর পেলে তাদের জানাতে। এ ব্যাপারে কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি রকিব-উল হোসেন বলেন, ঘটনাটি তারা শুনেছেন ও সচেতন রয়েছেন। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির পর থেকে রেললাইনে কাটা পড়া কোনো মৃত বা আহত ব্যক্তির খোঁজ তারা পাননি বলে জানিয়েছেন। নিহত গৃহবধূ মুন্নির মামাত ভাই তানভীর রহমান জানান, মুন্নির স্বামী রকিব বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেননি। ওই টাকা তিনি কী করেছেন তা আত্মীয়-স্বজন কেউ জানেন না। মুন্নি-রকিব পারিবারিকভাবে সুখী ছিলেন।

তবে ঋণগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে তাদের সংসারে অশান্তি শুরু হয়। তবে রকিবের কাছে কারা কত টাকা পান এ বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য নেই স্বজনদের কাছে। আর্থিক অনটনের কারণে ছেলে ফারহানকে এ বছর স্কুলেও ভর্তি করানো হয়নি। ফারহান চতুর্থ শ্রেণি থেকে প ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছিল। ঋণের কারণে চার-পাঁচ মাস আগে রকিব স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হন। পরে কুমিল্লার বুড়িচং এলাকা থেকে স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। কেন তিনি তখন নিখোঁজ হয়েছিলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

নিহতের স্বজনদের বরাত দিয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, রকিব উদ্দিন ঋণগ্রস্ত ছিলেন। বড় অঙ্কের ঋণ। এ কারণেই হতাশায় তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যা করেছেন বলে তাদের ধারণা। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।জানা গেছে, মুন্নির বাবার বাড়ি মহাখালীর ওয়ারলেস গেটের টিঅ্যান্ডটি রোডে। রকিবের সঙ্গে প্রেম করে ১৪ বছর আগে বিয়ে হয় মুন্নির। দক্ষিণখানের যে ফ্ল্যাট থেকে মুন্নি ও দুই সন্তানের মৃতদেহ পাওয়া গেছে ঐ বাসায় ২০১১ সাল থেকে ভাড়ায় ছিলেন তারা। পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) নাবিদ কামাল শৈবাল বলেন, আমরা মনে করছি, গৃহকর্তাকে খুঁজ পেলে তিনখুনের রহস্যের জট খুলবে। সম্ভাব্য সকল দিক মাথায় রেখে তদন্ত চলছে। একটি ডায়েরি উদ্ধার করার ঘটনাটি সঠিক।

ডিসি বলেন, ওই বাসা থেকে জব্দ ডিভিআর (ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডার) থেকে ফুটেজ উদ্ধার করতে পারেনি। টেকনিক্যাল সমস্যা হওয়ায় সেটি এক্সপার্টের কাছে পাঠানো হয়েছে। ফুটেজ উদ্ধার হলে অনেক তথ্য পাওয়া যাবে। একই বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার হাফিজুর রহমান বলেন, আমরা অনুসন্ধান চালিয়ে প্রকৃত ঘটনা বের করার চেষ্টা করছি। রকিব উদ্দিনের খোঁজ পেলে হত্যার ঘটনা সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে।

 

মানবকণ্ঠ / এমএইচ




Loading...
ads






Loading...