দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর কাজ

দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর কাজ - মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • আব্দুল্লাহ রায়হান
  • ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০১:৩০,  আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:১২

সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি হচ্ছে দক্ষিণা লবাসীর স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এ সেতু নির্মাণে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জিং কোনো কাজ এখন আর বাকি নেই। তাই দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে স্বপ্নের এ সেতুর কাজ। শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তের ৩০ ও ৩১ নম্বর পিলারের ওপর সম্প্রতি বসানো হয়েছে ২৪তম স্প্যান। এর মাধ্যমে দৃশ্যমান হলো পদ্মা সেতুর ৩ হাজার ৬০০ মিটার। অর্থাৎ ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুর মধ্যে ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার কাজ শেষ হয়েছে।

সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সব কাজ শিডিউল অনুযায়ী চলছে। এভাবে কাজ চলতে থাকলে মূল সেতুর কাজ শেষ হবে ২০২১ সালের ৩০ জুনের আগেই। পদ্মা সেতুর বাস্তব কাজের অগ্রগতি ৮৫ দশমিক ৫০ ভাগ। নদীশাসন কাজের অগ্রগতি ৬৬ ভাগ ও পুরো পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের কাজের ৭৬ দশমিক ৫০ শতাংশ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

অন্যদিকে সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়ার কাজের অগ্রগতি শতভাগ। মূল সেতুর আর্থিক অগ্রগতি ৮১ দশমিক ৬০ ভাগ। মূল সেতুর কাজের চুক্তি মূল্য ১২ হাজার ১৩৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৯ হাজার ৭৫১ দশমিক ১৯ কোটি টাকা। মূল সেতু নির্মাণের জন্য কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্র্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) ও নদীশাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো কর্পোরেশন। এ বহুমুখী সেতুর মূল আকৃতি হবে দোতলা। কঙ্ক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হচ্ছে এ সেতুর কাঠামো। এর ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন আর নিচ দিয়ে ট্রেন।

সেতু সংশ্লিষ্টদের দাবি, ইতোমধ্যে নদীশাসনের কাজও অর্ধেকের বেশি শেষ হয়েছে। এর মধ্যে সার্ভিস এরিয়া-২ এর কাজ ১০০ শতাংশ, মাওয়া প্রান্তে অ্যাপ্রোচ রোডের কাজ ১০০ শতাংশ, জাজিরা প্রান্তে অ্যাপ্রোচ রোডের কাজ ৯১ শতাংশ এবং নদীশাসনের কাজ ৬৬ শতাংশ শেষ হয়েছে। দ্বিতল এ সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে কঙ্ক্রিট ও স্টিল দিয়ে। মূল কাঠামোর দুই প্রান্তে আরো প্রায় তিন কিলোমিটার সংযোগ সড়ক থাকছে।

তাই পুরো সেতুর দীর্ঘ দাঁড়াবে প্রায় নয় কিলোমিটার। ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন পদ্মা সেতু ২০২১ সালের জুনে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সেতুর উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে জানেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।

সেতু বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পদ্মা সেতুতে যানবাহন উঠতে আর খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। প্রায় ৮৬ শতাংশ অগ্রগতির পর পদ্মা সেতুর স্বপ্ন এখন বাস্তবায়নের কাছাকাছি। এদিকে সেতুর স্প্যানের ওপর সড়কপথে নির্মাণের কাজ জাজিরা প্রান্ত থেকে দিনরাত চলছে। প্রায় তিন হাজার রোড ওয়ে স্ন্যাব বসাতে হবে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০টি রোডওয়ে স্ল্যাব বসানো হয়েছে। রোডওয়ে বসানোর পর সেখানে পিচ ঢালাইয়ের কাজ শুরু হবে। যা চলতি বছরের শেষের দিকে শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছে সেতু সূত্র।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ বহুমুখী সেতুতে দুই হাজার ৯৩১টি রোডওয়ে সø্যাব বসানো হবে। আর রেলওয়ে সরঞ্জাব বসানো হবে ২ হাজার ৯৫৯টি। পদ্মা সেতুতে ৪২টি পিলারের ওপর বসবে ৪১টি স্প্যান। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার লক্ষ্যে চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ কাজ করার পরিকল্পনা নিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের জুলাই মাসের মধ্যে সব পিয়ারের ওপর স্প্যান বসানোর পাশাপাশি রেল ও রোড সরঞ্জাব বসানো শেষ করতে চাচ্ছে তারা। পুরো সেতুতে ২ হাজার ৯৩১টি রোডওয়ে সরঞ্জাব বসানো হবে। আর রেলওয়ে সরঞ্জাব বসানো হবে ২ হাজার ৯৫৯টি। পদ্মা সেতুতে ৪২টি পিলারের ওপর বসবে ৪১টি স্প্যান। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়।

অন্যদিকে নদীশাসন কাজের আর্থিক অগ্রগতি ৫২ দশমিক ৪৭ ভাগ। নদীশাসন কাজের চুক্তি মূল্য ৮ হাজার ৭০৭ দশমিক ৮১ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৫৬৯ দশমিক শূন্য ৪ কোটি টাকা। সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়ার শতভাগ কাজের জন্য মোট ১ হাজার ৪৯৯ দশমিক ৫১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশের জন্য ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৩৪২ দশমিক ২৬ কোটি টাকা এবং প্যানেল অব এক্সপার্ট, পরামর্শক, সেনা নিরাপত্তা, ভ্যাট ও আয়কর, যানবাহন, বেতন-ভাতাদি ও অন্যান্য খাতে মোট ব্যয় ৩ হাজার ৫১০ দশমিক ৪২ কোটি টাকা। প্রকল্পের মোট বাজেট ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২১ হাজার ৩১৭ দশমিক ১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পদ্মা সেতুর প্রতিটি স্প্যান ১৫০ মিটার দীর্ঘ ও ৩ হাজার ১৪০ টন ওজন। ৩ হাজার ৬০০ টন ধারণক্ষমতার ‘তিয়ান-ই ভাসমান ক্রেনে করে প্রতিটি স্প্যান মুন্সীগঞ্জের মাওয়া কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে বহন করে নিয়ে পিয়ারে বসানো হয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নির্মাণ অবকাঠামো পদ্মা বহুমুখী সেতু দেশের দক্ষিণা লের ২১ জেলাকে যুক্ত করবে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে। আর এটি তৈরি হচ্ছে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে। আর পদ্মা সেতুর বিশাল কর্মযজ্ঞে ইতোমধ্যে ৫ হাজার বেকারের কর্মসংস্থান হয়েছে।

সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুর বিশালাকার পাইল নদীগর্ভে নিয়ে যেতে এর আগে পৃথিবীতে শক্তিশালী কোনো হ্যামার ছিল না। এজন্য ৪০০ কোটি টাকা দিয়ে হ্যামার তৈরি করে আনা হয়েছে। এ পর্যন্ত এ রকম ৫টি হ্যামার ব্যবহƒত হয়েছে পদ্মায়। তবে এর মধ্যে ২টি বিকল হয়ে গেছে। কাজ চলছে বাকি ৩টি দিয়ে। হ্যামারগুলো জার্মান প্রযুক্তির নেদারল্যান্ডসের একটি কোম্পানি থেকে বিশেষ অর্ডারে আনা হয়েছে।

স্বপ্নের এই সেতুটি যেসব উপাদানে তৈরি হচ্ছে, তাতেও রয়েছে বৈচিত্র্য। এই সেতু তৈরিতে যে পাথর ব্যবহƒত হচ্ছে, তার একেকটির ওজন এক টন। পাথরগুলো ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের পাকুর নামক স্থান থেকে আমদানি করা হয়েছে। এসব পাথর এত ভারি ও বড় যে, মাত্র ১৫ টুকরো পাথরের বেশি একটি বড় ট্রাকে তোলা যায় না।

জানা গেছে, পদ্মা সেতু নির্মাণে যে ওয়ার্কশপ ব্যবহƒত হচ্ছে, সেটিও বিশ্বের সবচেয়ে বড় নির্মাণ ওয়ার্কশপ। এর আগে কোনো সেতু তৈরিতে এত বড় কর্মযজ্ঞের প্রয়োজন হয়নি। এখানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে রিমোট কন্ট্রোল পদ্ধতিতে ভারি বস্তু ওঠানো-নামানো হয়। পদ্মার পাড়ে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে ৩০০ একর জায়গায় এই পাইল ও স্প্যান ফেব্রিকেশন ইয়ার্ড (ওয়ার্কশপ) তৈরি করা হয়েছে। যেখানে প্রস্তুত হচ্ছে সেতুর একের পর এক পাইল ও স্প্যান।

প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, সেতু প্রকল্পের সব কম্পোনেন্টের সাথে তাল মিলিয়ে কাজের অগ্রগতি হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করা। বর্ষায় তীব্র সে াতের কারণে গত বছর মাঝে সাড়ে ৩ মাস স্প্যান বসানো বন্ধ ছিল। তা

রপরও গেল বছরটায় অনেক অর্জন হয়েছে সেতুর কাজে। ২২টি পিলারের নকশা জটিলতার সমাধান মেলার পাশাপাশি গত বছরেই সেতুতে স্প্যান বসেছে ১৪টি। দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে এখন কাজ। তবে এ ২০২০ সালেই করতে হবে সর্বোচ্চ কাজ। তিনি বলেন, আগামী বছরের ২১ জুন কাজ শেষ করার জন্য আমাদের আলাদা আলাদা প্ল্যানিং আছে। কাজ হচ্ছে। আমরা আশাবাদী।

প্রকল্প পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্যানেল অব এক্সপার্টের সভাপতি প্রফেসর ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, আশা করছি আগামী বছরের মাঝামাঝি অথবা শেষ হাফে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হবে। অর্থাৎ পদ্মা সেতু চালু হতে আর দেড় বছর লাগতে পারে। এত বড় কাজ শুরুর দিকে জটিলতা ছিল এবং তা থাকাই স্বাভাবিক। তবে এখন আর কোনো জটিলতা নেই। এজন্য দেড় বছরের বেশি সময় লাগবে না।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি শতকরা প্রায় ৮৬ শতাংশ।  বিশ্বের তীব্র খর সে াতা নদী আমাজানের পরেই পদ্মার অবস্থান। এ কারণে এই নদীতে সেতু তৈরি অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে বিস্ময়করও। আমরা আশা করছি আগামী বছরের জুনে সেতুতে যানবাহন উঠাতে পারব। 

 

মানবকণ্ঠ/এমএইচ




Loading...
ads






Loading...