• বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০
  • ই-পেপার

দেড়মাসে দেশে এলো ৪০৯ প্রবাসীর লাশ

দেড়মাসে দেশে এলো ৪০৯ প্রবাসীর লাশ - মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০২:০৫

মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে আসার সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। সৌদি আরব থেকে প্রতি মাসেই ফিরে আসছেন শত শত প্রবাসী কর্মী। সংখ্যাও দিন দিন বেড়েই চলেছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে যে, চলতি বছরের গত দেড়মাসে কফিনবন্দি হয়ে ফিরেছে প্রবাসী ৪০৯ কর্মীর লাশ। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে দেশে ফিরে এসেছে দুই নারীসহ আট প্রবাসী কর্মীর মরদেহ।

জানা যায়, বৈধ-অবৈধ বাদবিচার নয়, সৌদি পুলিশ অভিযানকালে যাকে সামনে পাচ্ছে ধরে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। এক কাপড়ে, খালি হাতে এরা স্বদেশের মাটিতে পা রাখছেন অনেকটা জীবন্ত লাশ হয়ে।

বৃহস্পতিবার রাতে সৌদি আরব থেকে আরো ১০২ জন বাংলাদেশি ফেরত এসেছেন। এনিয়ে চলতি বছরে সৌদি আরব থেকে ১৭৫ নারীসহ প্রায় চার হাজার বাংলাদেশি ফিরেছেন। আর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে মোট ৬৪ হাজার ৬৩৮  কর্মী দেশে ফিরেছেন যাদের পরিচয় ডিপোর্টি। 

সরকারি হিসাবে গত এক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ২৭ হাজার ৬৬২ জন প্রবাসী শ্রমিকের লাশ দেশে ফেরত এসেছে। ২০১৯ সালেও তিন হাজার ৬৫৮ জনের মরদেহ ফিরেছে দেশে। অর্থাৎ গত বছর প্রতিদিন গড়ে ১০ জনের বেশি প্রবাসীর লাশ এসেছে। কারণ হিসেবে বেশির ভাগের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও স্বাভাবিক মৃত্যু বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রবাসে শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নানা কারণে মারা যাওয়া কর্মীর মরদেহ ফেরার সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। ১৯৯৩ সালে মাত্র ৫৩ জন শ্রমিকের লাশ দেশে আসে। সেখানে গত বছর সেই সংখ্যা দাঁড়ায় তিন হাজার ৬৫৮। এর এক-তৃতীয়াংশই এসেছে সৌদি আরব থেকে। এক বছরে দেশটি থেকে নারী শ্রমিকসহ মোট এক হাজার ১৯৮ জনের লাশ এসেছে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বলছে, এই হিসাব শুধু যেসব লাশ ফেরত আসে সেই সংখ্যা ধরে। এর বাইরে অনেক লাশই সংশ্লিষ্ট দেশে দাফন করা হয়, যার হিসাব সব সময় হালনাগাদ থাকে না। বুধবার রাতে সৌদি থেকে এসেছে পিরোজপুরের রোখসানা বেগম, সুনামগঞ্জের রিপা আক্তার ও ঢাকার আলমগীর, মালয়েশিয়া থেকে এসেছে বান্দরবানের আইয়ুব আলী, বি-বাড়িয়ার লিটন মিয়ার মরদেহ।

 সুনামগঞ্জের রিপা আক্তার বড় ভাই আব্দুল হক বলেন, স্বামীর আয় ভালো ছিল না। সন্তানদের কথা ভেবে সৌদি গিয়েছিল রিপা। কিন্তু তার এমন মৃত্যু কিছুতেই মানতে পারছি না। রিপা নেই তা কয়েকমাস আগে থেকেই জানি। কিন্তু কাল যখন লাশটা বিমানবন্দর দিয়ে বের হলো, বুক ভেঙে কান্না পাচ্ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, নিজের ছোটবোনের মরণের সময় তার পাশে থাকতে পারলাম না। না জানি কত কষ্ট নিয়ে সে পৃথিবী ছেড়ে গেছে!

রিপার সঙ্গে একই ফ্লাইটে নিথর দেহে ফিরেছেন আরেক রেমিট্যান্স যোদ্ধা রোকসানা বেগম (৪০)। তার ভাই রাসেল বলেন, 1০-১১ মাস আগে রোকসানা সৌদি আরবে যান কাজ করতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে কিছুদিন কাজ করার পরে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এ সময় তাকে আর কাজে রাখতে রাজি হয়নি সৌদি মালিক। কাজ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি।’

তিনি বলেন, দেশে ফেরার জন্য রোকসানা দূতাবাসের সেফহোমে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে দূতাবাস থেকে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ বিষয়ে দূতাবাস সার্বক্ষণিকভাবে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। নিহত রোকসানার একটি ১৬ বছরের মেয়ে রয়েছে বলে জানান রাসেল। অন্যদিকে মাত্র তিন মাস আগে চার লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরব গিয়েছিলেন সিলেট জেলার ২০ বছরের যুবক মোহাম্মদ সেলিম। কিন্তু ভাগ্য এতটাই খারাপ যে ধরপাকড়ের আচড় লেগেছিল তার। যে কারণে বৃহস্পতিবার রাতে শূন্যহাতে দেশে ফিরতে হয়েছে তাকে।

 শুধু সেলিম নন, তার মতো আরো ১০২ জন বাংলাদেশিকে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে সৌদি আরব থেকে ফিরতে হয়েছে। রাত ১১.২০ মিনিটে সৌদি এয়ারলাইন্স (এসভি-৮০৪) বিমানে তারা দেশে ফেরেন। এদের অনেকেই ফিরেছেন শুধু পরণের পোশাকটা নিয়ে। প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহযোগিতায় বরাবরের মতো গতকালও ফেরত আসাদের ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম থেকে জরুরি সহায়তা প্রদান করা হয়। ফিরে আসা সেলিম বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই রাস্তা থেকে গ্রেফতার করেন পুলিশ। কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তাকে ধরে ফেরত পাঠানো হয়।

সেলিমের সাথে একই পরিস্থিতির শিকার হয়ে শূন্যহাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হলেন সিলেটের আনহার। ১৪ মাস আগে তিনি গিয়েছিলেন সৌদি। একই জেলার দুলাল মিয়া, মিন্নাত আলী, জামিল আহাম্মেদ, মিনু রহমান, আনোয়ারসহ অনেকেই ফিরেছেন। গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার সাইফুল ইসলাম বিমানবন্দরে ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছিলেন। তিনি জানান, কোম্পানির কাজের কথা বলে পাঠানো হয়েছিল সৌদি আরবে। কিন্তু তিনিও ফিরেছেন শূন্যহাতে। বিমানবন্দরে সাইফুল বলেন আমাকে কোনো অপরাধ ছাড়াই দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তিনি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করার কথা জানান।  ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান মানবকণ্ঠকে বলেন, এই যে মানুষগুলো প্রতিদিন ফেরেন তাদের কথা শোনারও যেন কেউ নেই। রোজ রোজ আমরা তাদের কাছ থেকে দুর্ভোগের কথা শুনি। একেকজন তাদের ধরে ফেরত পাঠানোর যে বর্ণনা দেন তাতে মনে হয় মানুষ নয় গরু ছাগল বেঁধে ফেরত পাঠাচ্ছে।

মধ্যবয়সী এক লোক রাতে বিমানবন্দরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমরা কী মানুষ না। আমার মনে হয় সরকার ও রিক্রুটিং এজেন্সির লোকজন যদি একদিন এসে এসব মানুষদের কথা শুনতেন। ফেরত আসা লোকদের কথা শুনে বিমানবন্দরেই ঘটনার বিবরণ নিয়ে তদন্ত করা উচিত কারা তাদের এভাবে বিদেশে পাঠাচ্ছে আর সৌদি আরবই বা কেন তাদের সাথে এমন রূঢ় আচরণ করছে। এর একটা সমাধান হওয়া দরকার।

মানবকণ্ঠ/এমএইচ





ads







Loading...