ইভিএমের ভোটেও ইসির ইমেজ ‘ড্যামেজ’!


poisha bazar

  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০:১৫

ব্যালটের ভোট নিয়ে অনিয়ম হওয়ায় নানা সমালোচনা হতো। সেই সমালোচনা থেকে রেহাই পেতে শনিবার অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোট প্রথমবারের মতো সব কেন্দ্রে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে নেয়া হয়েছে। অথচ ইভিএমের ভোটেও নিজেদের ইমেজ পুনরুদ্ধার করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইভিএম যন্ত্রে ভোট জালিয়াতি, কারচুপি কিংবা কেন্দ্র দখলের কোনো সুযোগ নেই বলে নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থাটির পক্ষ থেকে বারবার জানানো হলেও ব্যালটের মতোই নানা অনিয়ম হয়েছে এবারের ভোটে। ভোটারদের কাছ থেকে নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে বিরোধী দলের এজেন্টদের বের করে দেয়া, ভোটরদের ভোট প্রদানে বাধা প্রদান এমনকি ভোটারকে সামনে রেখেই তার ভোট ছিনতাই করে নেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে ঢাকার এই দুই সিটি নির্বাচনে। এ ছাড়া ইভিএমের ভোটে দ্রুত সময়ে ভোটগ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশের কথা থাকলেও ভোট দিতে যেমন নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে ভোটারকে তেমনি ফলাফল প্রকাশও হয়েছে অপ্রত্যাশিত দেরিতে। সর্বোপরি ইভিএম ব্যবহার করে জনগণের আস্থা ফেরাতে চাওয়া নির্বাচন কমিশনের দেয়া সুষ্ঠু ভোট আয়োজনের নানা প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেননি সাধারণ ভোটাররা। যে কারণে কেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। ইসির তথ্যানুযায়ী, ঢাকা-উত্তর সিটিতে ভোট কাস্টিং হয়েছে মাত্র ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ আর দক্ষিণে ২৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। যা ইসির প্রত্যাশার ধারে-কাছেও যেতে পারেনি বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।

ভোট শেষে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানের দাবি করলেও নির্বাচন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই ভোটকে ইসির প্রতি দল ও জনগণের আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ বলেই মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, এই নির্বাচনে ভোটার ছিল না। এজেন্ট ছিল না। মানুষের মধ্যে ভোট নিয়ে আগ্রহ ছিল না। ইভিএম যারা পরিচালনা করেছে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ছিল না। নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের যে আস্থাহীনতা, এটি তারই প্রমাণ। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে রাষ্ট্র ভয়াবহতার দিকে যাবে, যা কারো জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। অবশ্য এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশন বলছে, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) দিয়ে ভোট নেয়া হলেও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ফল প্রকাশ করতে দেরি হয়েছে। ঢাকা-উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আবুল কাসেম গতকাল জানান, দুই সিটি নির্বচানে দ্রুত ফল প্রকাশ ও স্বচ্ছতার জন্যই ইভিএম ও ট্যাব ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর চ‚ড়ান্ত ফল পেতে ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগেছে। মূলত যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এত সময় লেগেছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোট নেয়া হয়েছে। সাড়ে ৫টা থেকে সর্বোচ্চ ৬টার মধ্যে ইভিএমের ফল কেন্দ্রে হয়ে গেছে। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ ছিল অনেক ধীরগতির। এ কারণে আমাদের দেরি হয়েছে। ট্যাবের মাধ্যমে আমরা যে ফল নিয়েছি, ওইখানে নেটওয়ার্কে বা আমাদের কিছু যান্ত্রিক বা টেকনিক্যাল ত্রুটির কারণে ফল দিতে দেরি হয়েছে। এগুলোর জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

ইভিএমের ভোট সহজভাবে গ্রহণ করেননি ভোটাররা: ঢাকা-উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে ইভিএমে গ্রহণ করা ভোট সহজভাবে গ্রহণ করেননি সাধারণ ভোটাররা। যে কারণে ভোটার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। এর মধ্যে আবার যারা এসেছেন তারাও সস্থানীয় কাউন্সিলর প্রার্থীদের পিড়াপিড়িতে। শনিবার মধ্যরাতে দুই সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তারা ফল ঘোষণা করলে দেখা যায়, উত্তর সিটিতে মাত্র ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ ভোট পড়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণে ভোট কিছু বেশি পড়লেও তা সিইসির প্রত্যাশিত ৩০ শতাংশও ছাড়াতে পারেনি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা আবদুল বাতেন জাতীয় শিল্পকলা একাডেমিতে ডিএসসিসি নির্বাচনের ফল ঘোষণা করেন। ঘোষিত ফলে তিনি জানান, এই সিটিতে মোট ৭ লাখ ১১ হাজার ৪২৮টি ভোট পড়েছে। এ ছাড়া বাতিল হয়েছে ১ হাজার ৫৬২টি ভোট। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মোট ভোটার ছিলেন ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৪৪১ এবং নারী ভোটার ছিলেন ১১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৩ জন। এখানে মাত্র ২৯ দশমিক ২ শতাংশ ভোট কাস্টিং হয়েছে। অন্যদিকে উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ভোট দেয়ার হার দক্ষিণের থেকেও কম। উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩০ লাখ ১২ হাজার ৫০৯ জন। এখানে মাত্র ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ ভোট পড়েছে।

জনগণের আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ নির্বাচনে- মন্তব্য বিশ্লেষকদের: নির্বাচনের প্রতি মানুষের যে আস্থাহীনতা ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে তারই প্রতিফলন ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। আর রাজনীতির প্রতি মানুষের অনাগ্রহের কারণেই ভোটার উপিস্থিতি কম ছিল বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মফিজুর রহমান। নির্বাচন পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় অনেকে নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ বললেও কেউ বলছেন নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে দেয়ারই অংশ। তবে নির্বাচিতদের কাছে সবার প্রত্যাশা বাসযোগ্য নগরী। কোনো একটি দলের না হয়ে নির্বাচিতরা সবার মেয়র হয়ে উঠবেন এমন প্রত্যাশা তাদের। নির্বাচনের ফলাফল বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এই নির্বাচনে ভোটার ছিল না। এজেন্ট ছিল না। মানুষের মধ্যে ভোট নিয়ে আগ্রহ ছিল না। ইভিএম যারা পরিচালনা করেছেন তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ছিল না। নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের যে আস্থাহীনতা, এটি তারই প্রমাণ।

এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে রাষ্ট্র ভয়াবহতার দিকে যাবে, যা কারো জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকী বলেন, যারা নির্বাচিত তাদের সবাইকে অভিনন্দন। যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের মেনিফেস্টো বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা। সব বাস্তবায়ন করা হয়তো সহজ হবে না, কিন্তু তা করার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। তাদের মনে রাখতে হবে নির্বাচিত হওয়ার আগে তারা একটি দলের ছিলেন, কিন্তু মেয়র হওয়ার পর তারা সবার, সবার মেয়র। সবার জন্য তাদের কাজ করতে হবে। এবার নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি খুবই কম থাকার বিষয়টি শঙ্কার উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। নির্বাচন কমিশনেও নির্বাচনী স্বাক্ষরতা বাড়াতে হবে। সবাই যেন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচনে প্রযুক্তির যে ব্যবহার ঘটেছে তাতে তেমন কোনো বড় অভিযোগ শুনিনি। তবে ভোটার উপস্থিতি কম লক্ষ্য করা গেছে, এটার একটা কারণ হতে পারে রাজনীতির প্রতি মানুষের যে অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে তার প্রতিফলন। তিনি বলেন, যারা নির্বাচিত হয়েছেন, ঢাকা শহরের যে সমস্যা তা তাদের দূর করতে হবে। সবার জন্য বাসযোগ্য নগরী তৈরি করাই হবে তাদের প্রধান কাজ।

মানবকণ্ঠ/এইচকে






ads