12 12 12 12
দিন ঘন্টা  মিনিট  সেকেন্ড 

লোকসান কমাতে হজ বাণিজ্যে বেপরোয়া বিমান

মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • আব্দুল্লাহ রায়হান
  • ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ২২:৩৫,  আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ২৩:২২

লোকসান কমাতে হজ বাণিজ্যে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বিমান। যেখানে সাধারণ যাত্রীরা ঢাকা-জেদ্দা রুটে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকায় আসা-যাওয়া করতে পারেন, সেখানে এবার হজযাত্রীদের ক্ষেত্রে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

এটি স্বাভাবিক ভাড়ার প্রায় তিনগুণ। গত বছর এ ভাড়া ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হ্রাস পাওয়া এবং সৌদি সরকার এ বছর কোনো সার্ভিস চার্জ না বাড়ানো সত্ত্বেও এত বেশি ভাড়া কেন নির্ধারণ করা হলো, এ প্রশ্ন এখন সবার। হজযাত্রীদের সাধারণ যাত্রীদের চেয়ে বিমান ভাড়া বেশি দিতে হয় প্রায় এক লাখ টাকা।

এতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বাড়তি বাণিজ্য হবে ৬০০ কোটি টাকার বেশি। সৌদি এলারলাইন্সও একই সুবিধা পাবে। তবে লোকসান কমাতেই হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া প্রতি বছরই বাড়ানো হচ্ছে জানা যায়।

এদিকে চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে হজ হতে পারে। বিমান ভাড়ার ওপর ভিত্তি করে ধর্ম মন্ত্রণালয় হজ প্যাকেজ ঘোষণা করবে। সরকারের বেঁধে দেয়া মূল্যের ওপর ভিত্তি করে বেসরকারি হজ এজেন্সিগুলো তাদের নিজস্ব হজ প্যাকেজ ঘোষণা করবে। বিমানের কর্মকর্তাদের মতে, হজযাত্রী পরিবহন ছাড়া বিমান সব খাতেই বিপুল পরিমাণ লোকসান গুনছে।

অনিয়ম ও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি দমন কমিশনও অনুন্ধান করে দুর্নীতির সত্যতা পেয়েছে। এসব লোকসান পুষিয়ে নিতেই প্রতি বছর হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া বাড়ছে। চলতি বছর হজ চুক্তি অনুযায়ী ১ লাখ ৩৭ হাজার বাংলাদেশি সৌদি আরবে হজ পালনের জন্য যেতে পারবেন। বিপুলসংখ্যক এ হজযাত্রী পরিবহনের কাজটি যৌথভাবে সম্পন্ন করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সৌদি এয়ারলাইন্স।

হজ সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশ থেকে প্রতি বছর যেসব মানুষ হজ করতে সৌদি আরব যান, তাদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির। হজযাত্রী পরিবহনের নামে সিন্ডিকেট গঠন করে টিকিট বিক্রি বাবদ প্রতি বছর প্রচুর টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এখন যদি বিমানের ভাড়া তিনগুণ বাড়ানো হয়, তাহলে হজ পালনেচ্ছু সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের মাত্রা আরো বাড়বে, যা মোটেই কাম্য নয়।

জানা গেছে, ঢাকা-জেদ্দা রুটে সাধারণ যাত্রীরা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা ভাড়ায় সারা বছরই আসা-যাওয়া করতে পারেন। বছরের অন্য সময় আসন খালি গেলেও হজের সময় বিমানের কোনো আসন খালি যায় না। পুরো আসন বিক্রি সাপেক্ষে যেখানে ভাড়া কমার কথা, সেখানে উল্টো মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে সাধারণ যাত্রীদের তুলনায় এবার হজযাত্রীদের অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা গুনতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানের প্রধান সমস্যা হচ্ছে দুর্নীতি। হজ ফ্লাইটের ভাড়া না বাড়িয়ে সরকার বরং বিমানকে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠানরূপে গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করতে পারে। এটি সম্ভব হলে হজযাত্রীদের কাছ থেকে তিনগুণ ভাড়া আদায়ের প্রয়োজন হতো না।

সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় এক সভায় এ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। এর প্রতিবাদে ওই সভা ছেড়ে বেরিয়ে আসেন ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহ ও বেসরকারি এজেন্সি মালিকদের সংগঠন হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) প্রতিনিধিরা।

ধর্ম মন্ত্রণালয় ও হাব বলছে, সৌদি সরকার এ বছর কোনো সার্ভিস চার্জ বাড়ায়নি। আর বিশ্ববাজারে বর্তমানে জ্বালানি তেলের মূল্য গেল বছরের চেয়ে অনেক কম। তাহলে বিমান ভাড়া কেন বাড়ানো হবে?

ভাড়া বাড়িয়ে কার স্বার্থে সৌদি এয়ারলাইন্সের হাতে হজযাত্রীদের ৬০০ কোটি টাকা তুলে দেয়ার পাঁয়তারা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বিমান মন্ত্রণালয়ে বিমানের ভাড়া নির্ধারণী সভায় বিমানের পক্ষ থেকে হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া এক লাখ ৫৪ হাজার টাকার প্রস্তাব করা হয়। গত বছর এ ভাড়া ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার। ২০১৮ সালে ছিল ১ লাখ ২৪ হাজার ৭২৩ টাকা। এ ভাড়া নিয়ে বিমানের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন ধর্ম মন্ত্রণালয় ও হাব নেতারা। এক পর্যায়ে তারা সভা ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। পরে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে বিমান মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বলেন, আমরা কোনোভাবেই বিমানের প্রস্তাবের সঙ্গে একমত নই। সৌদি সরকারের কোনো নতুন চার্জ নেই বা কোনো সার্ভিস চার্জ বাড়েনি। জ্বালানির দাম গতবারের চেয়ে আরো কমেছে। এরপরও কেন তারা বিমান ভাড়া জনপ্রতি ১২ হাজার টাকা বাড়িয়েছে তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। ভাড়া কমানোর চেষ্টা করছি।

তবে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে নাকচ করে দিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মহিবুল হক। তিনি বলেন, বিমান ভাড়া নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। তাদের সম্মতিতেই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী বৈঠক থেকে ওয়াকআউট করেননি বলেও দাবি করেন সচিব মহিবুল হক।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন সূত্রে জাানা গেছে, গেল বছর হজের সময় (আগস্ট ২০১৯) আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য ছিল শূন্য দশমিক ৭১ ডলার। বর্তমানে তা শূন্য দশমিক ৫৮ ডলার। অর্থাৎ গেল বছরের চেয়ে জেট ফুয়েলের মূল্য কমেছে শূন্য দশমিক ১৩ ডলার, বাংলাদেশি টাকায় প্রতি লিটারে প্রায় ১১ টাকা কম।

এদিকে বিমানের ওই ভাড়া ধরে নিয়েই হজ প্যাকেজের খসড়া তৈরি করছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। সে অনুযায়ী, প্যাকেজ-১ এর সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াবে ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৭৮৬ টাকা, যা গতবারের চেয়ে ২৫ হাজার ২৪৬ টাকা বেশি। একইভাবে প্যাকেজ-২ এর ব্যয় ধরা হতে পারে ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৫২৫ টাকা, যা গতবারের চেয়ে ২৪ হাজার ১৪৫ টাকা বেশি। অন্যদিকে স্বল্পমূল্যের নতুন একটি প্যাকেজ ঘোষণা করতে চাইছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। ‘আজিজিয়া হজ প্যাকেজ’ নামে ওই প্যাকেজের মূল্য ধরা হতে পারে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৭৪৮ টাকা।

এ প্রসঙ্গে হাব নেতারা বলছেন, দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া দিয়েও হজযাত্রীরা বাড়তি কোনো সুবিধা পান না। বরং কখনো ফ্লাইট বাতিল, কখনো দীর্ঘ ট্রানজিটে দুর্ভোগে পড়েন। আবার ফ্লাইট বিলম্বের কারণে হজযাত্রীদের দিনের পর দিন হজক্যাম্পে ইহরাম বেঁধে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়। বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, হজযাত্রী পরিবহন ছাড়া বিমান বাংলাদেশের সব খাতেই বিপুল পরিমাণ লোকসান গুনতে হয়।

অনিয়ম ও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন খাতের দুর্নীতি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনও অনুন্ধান করে এর সত্যতা পেয়েছে। সেই লোকসান পুষিয়ে নিতেই হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া প্রতি বছরই বাড়ানো হচ্ছে।

মানবকণ্ঠ/টিএইচডি




Loading...
ads






Loading...