মিয়ানমারকে গণহত্যা থামাতে বলল আইসিজে

মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • মানবকণ্ঠ ডেস্ক
  • ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ০১:১৬

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিজে) মিয়ানমারকে কয়েকটি অন্তর্র্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের এসব নির্দেশনা সর্বসম্মত।

গতকাল বৃহস্পতিবার নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আইসিজে এই অন্তর্র্র্বর্তী আদেশ দেন। আদালতের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুলকোয়াই আহমেদ ইউসুফ আদেশ পড়ে শোনান। এ সময় অপর ১৪ জন স্থায়ী বিচারপতি ও দুজন অ্যাডহক বিচারপতি আদালতকক্ষে ছিলেন।

আদালতের চারটি আদেশ হলো মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও অন্য সশস্ত্র বাহিনীকে সব ধরনের গণহত্যার অপরাধ ও গণহত্যার ষড়যন্ত্র থেকে বিরত থাকার নির্দেশ, গণহত্যা সনদের ধারা ২-এর আওতায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সব ধরনের সুরক্ষা দেয়ার বাধ্যবাধকতা মিয়ানমারকে পূরণ করতে হবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা, নিপীড়ন বন্ধ এবং বাস্তুচ্যুতির মতো পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে মিয়ানমারের বিরত থাকা।

মিয়ানমার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গাম্বিয়া যেসব ব্যবস্থার আবেদন করেছে, সেগুলো হুবহু অনুসরণ না করে আদালত কিছু পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে। এর আগে আদালত বলেন, আদালতের অন্তর্র্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। গণহত্যা সনদের ধারা ৪১-এর আওতায় তিনটি অন্তর্র্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশের শর্তসমূহ বিরাজ করছে বলে আদালত উল্লেখ করেছেন।

আদালত বলেন, গাম্বিয়া যেসব অন্তর্র্র্বর্তী ব্যবস্থার আদেশ চেয়েছে, সেগুলোর প্রথম তিনটির লক্ষ্য হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা দেয়া। জাতিসংঘ তথ্যানুসন্ধান দলের উপসংহার, যা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অনুমোদিত হয়েছে, তাতে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতায় গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল বলে যে উল্লেখ রয়েছে, তা আদালতের নজরে এসেছে।

আদালত মনে করেন, গণহত্যা সনদের ধারা ২-এর আলোকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী একটি বিশেষ সুরক্ষার অধিকারী (প্রোটেক্টেড) গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচ্য। সনদের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর আওতায় (ধারা ৮ ও ৯) এই মামলা দায়েরের গাম্বিয়ার প্রাইমা ফেসি অধিকার আছে বলে জানিয়েছেন আদালত। এ বিষয়ে আদালতের এখতিয়ার নেই বলে মিয়ানমার যে দাবি করেছে আদালত তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

জাতিসংঘ তথ্য অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে যেসব বিবরণ উঠে এসেছে, তার আলোকে গাম্বিয়া মিয়ানমারকে যে নোট ভারবাল দিয়েছিল, তা বিরোধের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন আদালত। আদালত বলেছেন, গাম্বিয়া স্বনামে এই আবেদন করেছে। এরপর তারা ওআইসিসহ যে কোনো সংস্থা ও দেশের সহযোগিতা চাইতে পারে। তাতে মামলা করার অধিকার ক্ষুণœ হয় না। আদালতের প্রাথমিকভাবে এখতিয়ার আছে কিনা, তা গণহত্যা সনদের ৯ ধারার আওতায় বিবেচ্য জানিয়ে আদালত তার যুক্তি তুলে ধরছেন।

আইসিজের সিদ্ধান্ত মিয়ানমার যেন এড়িয়ে যেতে না পারে - জাতিসংঘ:

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াং হি লি বলেছেন, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের (আইসিজে) সিদ্ধান্ত মিয়ানমার যেন এড়িয়ে যেতে না পারে, সে জন্য সতর্ক থাকতে হবে। মিয়ানমারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড সফর শেষে ওই সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়। গতকাল বিকালেই আইসিজেতে উল্লিখিত বিচারের রায় ঘোষণা হয়। সংবাদ সম্মেলনে রায়ের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে জাতিসংঘের এই বিশেষ দূত বলেন, এ বিষয়ে কী হবে- তা নিয়ে কোনো ধারণা করতে চাই না আমি। তবে আমি এতটুকু বলতে পারি, যে সিদ্ধান্তই হোক, মিয়ানমারের উচিত হবে- তা মেনে নেয়া। পাশাপাশি সঙ্কট নিরসনে মিয়ানমার যাতে দায়িত্বে অবহেলা না করে, তা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কাজ করতে হবে। মিয়ানমারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে ইয়াং হি লি ১৫ থেকে ২৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড সফর করেছেন। তিনি থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশ সফরে আসেন। বাংলাদেশ সফরকালে তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ইয়াং হি লি।

জাতিসংঘের এ বিশেষ দূত গত বছরের জানুয়ারি মাসে কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। সে সময় তিনি থাইল্যান্ডও সফর করেন। তবে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে বেশ কয়েকবার মিয়ানমার সফরে যেতে চাইলেও সে দেশের সরকার তাকে প্রবেশে অনুমতি দেয়নি। সফরের শেষ দিন রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে ডাকা তার এ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (রোহিঙ্গা ইস্যুতে) চীন-রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য জানতে চান।

জবাবে তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা লজ্জাজনক। নিরাপত্তা পরিষদে তাদের প্রতি যে দায়িত্ব ছিল, তা পালনে তারা ব্যর্থ হয়েছে। চীন এখন বিশ্ব নেতৃত্বের জায়গায় যেতে চলেছে। বিশ্ব নেতৃত্ব দিতে হলে মানবাধিকারকে সম্মান দিতে হবে। জাতিসংঘের এ বিশেষ দূত বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত নির্যাতনের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে নতুন একটি অ্যাডহক আন্তর্জাতিক আদালত স্থাপন করা দরকার।

আগামী মার্চে জেনেভাতে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে আমি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেশ করব। সেখানে আমি এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখব। তিনি আরো বলেন, সিয়েরালিওন, রুয়ান্ডা বা বসনিয়া হার্জেগোভিনায় যেভাবে গণহত্যার বিচার হয়েছে, এ ক্ষেত্রেও একই ধরনের সুপারিশ করব আমি।

উল্লেখ্য, গত ৬ বছর ধরে মিয়ানমারের বিষয়ে র‌্যাপোটিয়ার হিসেবে কাজ করছেন ইয়ান হি লি। এ বছরের মার্চে তার চুক্তি শেষ হচ্ছে। মার্চেই জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে তিনি রোহিঙ্গাদের নিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন। প্রতিবেদন জমা দেয়ার আগে এটাই তার বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডে শেষ সফর। ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা চালায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

হত্যাকাণ্ড, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালায় তারা। ওই সময় জীবন বাঁচাতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এ পর্যন্ত সাড়ে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে।

মানবকণ্ঠ/টিএইচডি




Loading...
ads






Loading...