সম্প্রীতির জয়ে দেশজুড়ে স্বস্তি


poisha bazar

  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ১৮ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৩২,  আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৪৮

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রবল আপত্তি ও শিক্ষার্থীদের লাগাতার অনশনের মুখে গো ধরে থাকা নির্বাচন কমিশন (ইসি) অবশেষে ভোটের তারিখ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বরস্বতী পুজার দিনে ভোটগ্রহণের দিন ধার্য্য করার পরই দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্য সংখ্যালগু সম্প্রদায়গুলোও নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছিল।

আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ঠের আশঙ্কায় ইসিকে ভোটের তারিখ পরিবর্তনের সুপারিশ করেছিলো। ঢাকা কেন্দ্রীক ভোট হলেও বিষয়টি জাতীয়ভাবে আলোচিত এবং শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়িয়েছিল। এতোসব ঘটলেও একেবারেই নিশ্চুপ ছিলো ইসি।

কিন্তু শনিবার ছুটির দিনে আকস্মিক বৈঠকে বসে নিজেদের আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে ইসি। পূর্বনির্ধারিত ৩০ জানুয়ারির পরিবর্তে দুইদিন পিছিয়ে এক ফেব্রুয়ারি ভাটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। এরফলে স্বস্তি ফিরে আসে হিন্দু সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে। স্বস্তির ঢেঁকুর তুলেন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরাও।

এরআগে শনিবার ভোটের তারিখ পরিবর্তনে কোনো আপত্তি নেই বলে জানায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সরস্বতী পূজার জন্য ঢাকা সিটি ভোটের দিন পরিবর্তনে নিজেদের অনাপত্তির কথা জানিয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন। এটা তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়। তারা আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধানে পৌঁছাতে পারেন। আমরা বলেছি, এখানে তারিখ পরিবর্তনও যদি হয়, আগে বা পরে, আমাদের সরকার বা দলের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি করব না। আমরা আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি, তারিখ পরিবর্তন করলে আমাদের কোনো অসুবিধা নেই। ভোটের তারিখ নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, ইসি তার বাস্তবসম্মত সমাধান দেবে বলেও আশা করেন মন্ত্রী কাদের। এরপরই বিকেলে এই এজেন্ডা নিয়ে আকস্মিকভাবেই বৈঠকে বসে কমিশন।

রাজধানীর শের-ই বাংলা নগরের নির্বাচন ভবনে এক অনির্ধারিত বৈঠকে টানা চারঘন্টা আলোচনা শেষে ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর ও দক্ষিণের নির্বাচন ৩০ জানুয়ারির পরিবর্তে ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা ছাড়াও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও শাহাদৎ হোসেন চৌধুরীসহ (ইসি) সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা আবুল কাশেমে ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আব্দুল বাতেন।

বৈঠক শেষে কে এম নুরুল হুদা বলেন, ৩০ জানুয়ারি নির্বাচনের জন্য ঘোষিত তারিখে সরস্বতী পূজা পড়ে যাওয়ায় কারও ধর্মানুভূতিতে যাতে আঘাত না লাগে সে কারণে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে। আমরা যখন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করি তখন সরস্বতী পূজার তারিখ ২৯ জানুয়ারি উল্লেখ ছিল। সে কারণে তারিখ নিয়ে সমস্য দেখা দেয়। সিইসি বলেন, আমি শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে এসএসসি পরীক্ষা পেছানোর কথা বলেছিলাম, তিনি রাজি হয়েছেন। ১ ফেব্রæয়ারি থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। সেটা পরিবর্তন করে ৩ ফেব্রুয়ারি করা হয়েছে।

এরআগে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম দুপুরের দিকে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় কমিশন সিদ্ধান্ত নিলে নির্বাচন পেছাবে। সিটি নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করা সম্ভব কি না জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) বসে সিদ্ধান্ত নেবে। সুযোগ আছে কি না আর সম্ভব কি না দুটি ভিন্ন বিষয়। পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। তবে আদালত যদি বলেন, তাহলে আমাদের ভোট পেছাতেই হবে।

আগামী ৩০ জানুয়ারি ভোটগ্রহণের দিন রেখে নির্বাচন কমিশন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই তার বিরেধিতা করেছিল পূজা উদযাপন পরিষদ ও হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদও ভোটের দিন পরিবর্তনের দাবি জানায়। কিন্তু এসব আবেদনে ইসি সাড়া না দেয়ায় এক আইনজীবী রিট আবেদন করেন হাই কোর্ট।

তবে আদালত তা খারিজ করে দেয়ায় ৩০ জানুয়ারিই ভোট করার সিদ্ধান্তে অটল থাকে ইসি। এদিকে ভোটের তারিখ বদলানোর দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী বসেন অনশনে; হিন্দু মহাজোট নামে একটি সংগঠন সিটি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণাও দেয়। সংগঠনটি বলছে, তফসিল অনুযায়ী ৩০ জানুয়ারিই যদি ভোটের আয়োজন হয়, তাহলে সেদিন সকাল ৮টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সরস্বতী পূজা করে রাজপথে অঞ্জলি নিয়ে কালো পতাকা মিছিল করবে তারা।

পূজার দিনে ভোটের তারিখ রাখার মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন হিন্দু সম্প্রদায়ের ‘আস্থা হারিয়েছে’ মন্তব্য করে হিন্দু মহাজোটের মুখপাত্র পলাশ কান্তি দে বলেন, আমরা ৩০ জানুয়ারির ঢাকা সিটির ভোট বর্জন করছি। কোনো হিন্দু ভাই ভোট কেন্দ্রে যাবেন না। কোনো প্রচারে অংশ নেবেন না। ৩০ তারিখ সকাল ৮টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ঘটপূজা করে রাজপথে অঞ্জলি নেব এবং কালো পতাকা মিছিল করব। আমরা সকল রাজনৈতিক দলের মেয়র প্রার্থী ও কাউন্সিলরদের অনুরোধ করছি আমাদের দাবির প্রতি একাÍতা প্রকাশ করার জন্য।

একই দাবিতে আরও একধাপ এগিয়ে ২৫ জানুয়ারি দেশব্যাপী অবরোধের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত জানান, দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আগামী ২২ জানুয়ারি মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করা হবে। ৩০ জানুয়ারি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সরস্বতী পূজা। এদিন কোনো নির্বাচন মেনে নেওয়া হবে না। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে এমনটা হতে পারে না। তাই আমরা প্রতিরোধ করবো। এতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তার দায় নির্বাচন কমিশনের ওপরই বর্তাবে।

এদিকে হিন্দু মহাজোটের এই দাবিতে একাত্মতা প্রকাশ করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, রাজপথের বিরোধী দল বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও তাদের মনোনীত প্রার্থীরা। সরস্বতী পূজার দিনে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চূড়ান্ত হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছে ঢাকা উত্তরে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল বলেন, গণতান্ত্রিক রূপরেখাতে সকল ধর্মকে একইভাবে সম্মান ও অধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে আমরা লক্ষ্য করছি, নির্বাচন কমিশন বারেবারে ইচ্ছা করে হিন্দু ধর্মের বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। বিভিন্ন স্কুলে পূজা হবে জেনে সকল স্কুল সেন্টারকে নির্বাচন কেন্দ্র হিসেবে কমিশন দখল করে নিয়েছেন।

তিনি বলেন, গত বছর ৫ অক্টোবর দুর্গা পূজার সময় রংপুর-৩ আসনে উপ-নির্বাচন করা হয়েছিল। এবারও সে ধারাবাহিকতায় হিন্দুদের সরস্বতী পূজার দিনে ভোটের দিনক্ষণ ঠিক করে নির্বাচন কমিশন হিন্দু ধর্মের বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। ইসিকে এ থেকে বেরিয়ে আসার অনুরোধ জানান তিনি।

সরস্বতী পূজার জন্য ভোট পেছানোর অনুরোধ জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলামও। আতিকুল বলেন, বাংলাদেশে সব ধর্মের লোক বাস করে, সবারই উৎসব পালনের অধিকার রয়েছে। অমি অবশ্যই মনে করি, সরস্বতী পূজার কারণে যদি নির্বাচন পেছানোর দরকার হয় সেটা করতে হবে। আমি নির্বাচন কমিশনের প্রতি আমার পক্ষ থেকে, দলের পক্ষ থেকে দাবি জানাচ্ছি, যদি সম্ভব হয় তাহলে নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে দিন। কারো ধর্ম পালনে যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ

 

 






ads