‘আইনের মারপ্যাঁচে’ পার পাচ্ছে ধর্ষকরা

মানবকণ্ঠ
পার পাচ্ছে ধর্ষকরা - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ১২ জানুয়ারি ২০২০, ১২:১৪

বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম কোনো জায়গায়ই নিরাপদ নয় নারীরা। আগের বছরের তুলনায় ২০১৯ সালে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুণ। আর শিশু ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে তিনগুণ। ধর্ষণ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ‘আইনের মারপ্যাঁচ’-কেই দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, ধর্ষকদের কঠোর শাস্তি না হওয়া, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, মামলা নিয়ে প্রভাবশালীদের নানা হয়রানি ও তদন্তে গাফিলতিসহ বিভিন্ন কারণে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলছে। এ ধর্ষণ এখন সামাজিক ব্যাধি, রোধ হচ্ছে না। পুলিশ, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, স্থানীয় প্রভাবশালী কর্তৃক ধর্ষণের ঘটনা বেশি ঘটছে। লোকলজ্জার ভয়, মামলা করতে গিয়ে হয়রানি, প্রভাবশালী মহলের হুমকি, এবং বিচার না হওয়ার সংস্কৃতির কারণে আসামিরা নানা কৌশলে পার পেয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে আইনের মারপ্যাঁচ আর শত বছরের পুরনো ধর্ষণের আইনে ধর্ষকের শাস্তির চেয়ে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে জটিল পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করায় বলেও মনে করেন আইন বিশ্লেষকরা।

এছাড়াও ধর্ষণের ঘটনা তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। ধর্ষণের মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মানসিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা। আবার তদন্ত করতে গিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সন্দেহ করা হয় ধর্ষিতাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক তাসলিমা ইয়াসমীন বলেন, ১৩০ বছরের পুরনো ব্রিটিশ আমলের আইনে ধর্ষণের যে সংজ্ঞা ছিল, এখনো সেটাকেই ভিত্তি ধরে বিচার করা হয়। যদিও ২০০০ সালে কঠোর অনেক ব্যবস্থা রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ধর্ষণের পুরনো সেই সংজ্ঞাকে বিবেচনায় নেয়ার বিষয়টি এখন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি ধর্ষণের শিকার ক্ষতিগ্রস্তকে জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করায়। আর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনেক কঠিন। কিন্তু ধর্ষণ কাকে বলব? সেই ধর্ষণের আইনগত সংজ্ঞার জন্য আমাদের কিন্তু ১৮৯০ সালের দণ্ডবিধিতে যেতে হচ্ছে এবং সেখানে যে সংজ্ঞা দেয়া আছে, সেটি এখন আন্তর্জাতিকভাবে যৌন অপরাধের সংজ্ঞার সাথে একেবারে বেমানান। তিনি আরো বলেন, পুরনো সংজ্ঞা বিবেচনা করার কারণে মেডিকেল রিপোর্টের ঘটনা প্রমাণের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সেটা ক্ষতিগ্রস্তের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ শিক্ষক বলেন, পুরনো সংজ্ঞার কারণে ট্র্যাডিশনাল মাইন্ডসেট বা মেডিকেল রিপোর্টের ওপর অসম্ভব জোর দেয়া হয় ধর্ষণের শিকার নারীর ক্ষেত্রে। আর এই মেডিকেল রিপোর্টের মান তখনই বেড়ে যায়, যখন তাতে লেখা থাকে যে ভিকটিমের শরীরে ইনজুরির চিহ্ন আছে বা সে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছে। যদি কোনো ইনজুরি চিহ্ন বা প্রতিরোধ করার চিহ্ন না থাকে, তাহলে আমরা কিন্তু দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রেই এটা ভিকটিমের জন্য নেগেটিভ হিসেবে কাজ করে।

দেশের মানবাধিকার কর্মীরাও বলছেন, শত বছরেরও বেশি সময়ের পুরনো আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞায় কোনো পরিবর্তন যে আনা হয়নি। আইনের পরিবর্তন না আনার কারণে বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা হিসেবে দেখছে। তারা বলেন, ধর্ষণের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, নারী কর্মকর্তা দিয়ে মামলা তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা সর্বপরি দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে আইনের সংশোধন করতে হবে। সামাজিকভাবে ধর্ষণের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে। মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট দিলরুবা সরমিন মানবকণ্ঠকে বলেন, ধর্ষণ আইনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংযুক্ত করতে হবে। আইন সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। আইনকে সঠিকভাবে কার্যকর করার জন্য সব উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, ধর্ষণের মাত্রা বাড়ছে এর পেছনের কারণ আইনের শাসন কম। এক কথায় আইনের শাসন নেই বললেই চলে। এ কারণেই ধর্ষক সুযোগ পেয়ে যায়। যখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে, মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে তখনই ধর্ষণের মাত্রা কমে যাবে।

ধর্ষণের ঘটনা তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। নারী অধিকার ও মানবাধিকার কর্মী নীনা গোস্বামী বলেন, ধর্ষণের ঘটনা তদন্ত থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘাটতি আছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব আছে। কারণ কোথাও দেখা যাচ্ছে, তদন্তে ত্রুটি থাকছে। আবার কোথাও দেখা যাচ্ছে, পাবলিক প্রসিকিউটর ঠিকভাবে ভ‚মিকা রাখছেন না। অনেক ক্ষেত্রে মামলা দিনের পর দিন পড়ে থাকে। আমাদের সবার ব্যর্থতা আছে। তবে তদন্তে সক্ষমতার প্রশ্নে কোনো অভিযোগ মানতে রাজি নন পুলিশ কর্মকর্তারা।

তারা বলছেন, পুলিশের সিআইডি, পিবিআই এবং ডিবি পুলিশের তদন্তে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি ফরেনসিক পরীক্ষা এবং আলামতসহ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার দক্ষতা অনেক বেড়েছে। এমনকি কোনো ঘটনায় অভিযুক্তের কোনো পরিচয় না থাকলেও তাকে চিহ্নিত করার দক্ষতা অর্জনের দাবিও করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তারা এমন ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলকে কেন্দ্র করে মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নেয়ার কথা তুলে ধরেন।

পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের প্রধান হামিদা পারভিন বলছিলেন, ধর্ষণের মামলাগুলোতে অজ্ঞাত অভিযুক্তকে চিহ্নিত করা এবং পুরো ঘটনার তদন্তে তাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো এখন দক্ষতার পরিচয় রাখছে। পুলিশের সিআইডিতে ফরেনসিক বিভাগে যারা আছেন, তারা খুব দক্ষ। আসলে এই ক্ষেত্রে হয়কি, যিনি এমন সহিংসতার শিকার হন তার এবং পরিবারটির মানসিক অবস্থা তখন খুব খারাপ থাকে। ওই সময় কোন কোন আলামত সংগ্রহ করতে হবে, কোন কাপড়গুলো সংরক্ষণ করতে হবে বা তিনি গোসল করতে পারবেন না এসব ব্যাপারে এখনো সচেতন নয়। সেজন্য অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা হয়।
এদিকে ধর্ষণের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে প্রতিটি ধাপেই ধর্ষিতাকেই সন্দেহ করা হয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। ধর্ষণের মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মানসিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক তাসলিমা ইয়াসমীন বলেন, ধর্ষণের মামলায় তদন্ত থেকে শুরু করে আইনি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে ক্ষতিগ্রস্তকেই সন্দেহ করা হয়।

তিনি বলেন, আইনেই এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে এবং একই সাথে তদন্তসহ আইনি প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টদের অনেকের মানসিকতারও পরিবর্তন হয়নি। ফলে ধর্ষণের শিকার নারীকেই সবকিছু প্রমাণ করার জন্য কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয় এবং তিনি একা হয়ে পড়েন। ধর্ষণের শিকার নারীর ওপর চাপে একটা সন্দেহের বোঝা। এই সন্দেহের বোঝা কিন্তু এখনো ধর্ষণের শিকার নারীকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। যখন ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, আমরা খুব সহানুভ‚তি জানাচ্ছি। কিন্তু তারপর যখন তার যাত্রা শুরু হয় বিচার পাওয়ার জন্য, সেই যাত্রায় কিন্তু তিনি একেবারে একা হয়ে যান। তখন তার ওপর থাকে সন্দেহের বিরাট বোঝা। আর এই সন্দেহের কারণে তার জন্য প্রমাণ করার বোঝাটাও অনেক বেড়ে যায়। আমাদের উচ্চ আদালতে অনেকে আগে একটা সিদ্ধান্ত ছিল যে, যদি কোনো বিচারক মনে করেন যে ধর্ষণের শিকার নারীর জবানবন্দি সত্য তাহলে শুধু সেই জবানবন্দির ওপর বিচারক রায় দিতে পারবেন। কিন্তু সেটা সেভাবে বাস্তবায়ন হয় না।

অনেক সময় এই অভিযোগও ওঠে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আসল অভিযুক্তকে আড়াল করার চেষ্টা করে থাকে। বিভিন্ন সময় তদন্ত কাজে অদক্ষতা ঢাকার চেষ্টার অভিযোগও ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, নানা প্রশ্ন এবং সমস্যার প্রেক্ষাপটে তদন্ত নিয়েই আস্থার সঙ্কট রয়েছে। ফলে, ধর্ষণের অনেক মামলাতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযুক্তকে চিহ্নিত করার পর তা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে।

পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ধর্ষণ মামলার তদন্ত নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ যাতে না থাকে সেই চেষ্টা তারা করেন।

ধর্ষণের মামলায় আইন অনুযায়ী পাবলিক প্রসিকিউটর বা সরকারি আইনজীবীরা ক্ষতিগ্রস্তের পক্ষে মামলা পরিচালনা করে থাকেন। ক্ষতিগ্রস্ত নারী ব্যক্তিগতভাবে কোনো আইনজীবী নিয়োগ করলে সেই আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটরকে সহায়তা দেয়া ছাড়া স্বাধীনভাবে ভ‚মিকা রাখতে পারেন না। এই বিষয়টিকেও একটা বড় সমস্যা হিসেবে দেখেন আইনজীবীরা।

গত ৩১ ডিসেম্বর আইন ও সালিশ কেন্দ্র এক তথ্যে জানিয়েছে গত এক বছরে সারাদেশে ১ হাজার ৪১৩ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৯ সালে সারাদেশে ধর্ষণের ঘটনা আগের বছরের তুলনায় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার মধ্যে নারী ধর্ষণ, দলবেঁধে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও হতাহতের বহু ঘটনা ঘটেছে।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads







Loading...