শুদ্ধি অভিযানে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল

শুদ্ধি অভিযানে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল

poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৯:৫০

বিদায়ী বছরের শেষার্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ কারবারের মাধ্যমে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাওয়া কথিত রাজনৈতিক নেতাদের জন্য যমদূত হয়ে আসে কঠোর শুদ্ধি অভিযান। গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে রাজধানীতে ক্যাসিনো ও দুর্নীতিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে র‌্যাব। অবৈধ ক্যাসিনো (জুয়ার আসর), দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িতদের ধরপাকড় শুরু হয়। দীর্র্ঘদিন ধরে সরকারি দলের নাম ভাঙ্গিয়ে চলা কতিপয় প্রভাবশালী নেতা একে একে র‌্যাবের জালে ধরা পড়ে। এতে অনেক দাপুটে নেতার থলের বিড়াল বেরিয়ে আসায় সারাদেশে সাধারণ মানুষের মাঝে শুদ্ধি অভিযান ব্যাপকভাবে আলোচিত ও প্রশংসিত হয়।

২০১৯ সালের শেষার্ধে র‌্যাবের এই অভিযানে মতিঝিলে ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য ক্লাবপাড়াসহ রাজধানীতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রমরমা ক্যাসিনো কারবারের নেটওয়ার্ক লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের দুর্নীতিবাজ নেতাসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গ্রেফতার, তাদের ব্যাংক হিসাব তলব, ব্যাংক হিসাব স্থগিত, মানি লন্ডারিং আইনে মামলা, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার মাধ্যমে দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ নতুন মাত্রা পায়।

বিদায়ী বছরের গত ১৮ সেপ্টেম্বর মতিঝিলে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে প্রথম র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক (পরে বহিষ্কৃত) খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া।

এরপর পর্যায়ক্রমে প্রভাবশালী ঠিকাদার জি কে শামীম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাবেক যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, একই সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক এনামুল হক আরমান, পুরান ঢাকার আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও তার ভাই রুপন ভূইয়া, অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান, বিসিবি পরিচালক লোকমান হোসেন ভূইয়া, কলাবাগান ক্লাবের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জমান রাজিব, ৩২ নম্বরের হাবিবুর রহমান মিজান ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৩৯ নম্বরের কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জু র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হন।

এ ছাড়া ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের আরো অন্তত ১৫ কাউন্সিলর গ্রেফতার এড়াতে গা ঢাকা দেন। এদের দেশে অবৈধ কাসিনো কারবারের গুরু হিসেবে পরিচিত ছিলেন দাপুটে যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। রাজধানীতে শীর্ষ চাঁদাবাজ হিসেবেও তার কুখ্যাতি ছিল। ক্যাসিনো কারবার ও চাঁদাবাজি করে শত শত কোটি টাকার মালিক বনে যান সম্রাট। গ্রেফতারের পর বিদেশি ব্যাংকেও তার টাকার সন্ধান পায় র‌্যাব ও দুদক। এ ছাড়া প্রভাবশালী ঠিকাদার কাম তৎকালীন যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের গুলশানের অফিসে হানা দিয়ে ১ কোটি ৮০ লাখ নগদ টাকা ও ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর ও বেশকিছু ডলার উদ্ধার করে র‌্যাব। গণপূর্ত বিভাগের প্রায় সবরকম কাজের টেন্ডার সে নিয়ন্ত্রণ করত ও সর্বশেষ ১৬টি বড় ধরনের সরকারি কাজের ঠিকাদার ছিলেন কথিত যুবলীগ নেতা টেন্ডারবাজ শামীম। ৭ জন গানম্যানের প্রহরায় সে চলাফেরা করত।

আর খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া শাহজাহানপুর-কমলাপুর ও মতিঝিলের বিভিন্ন বাজার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ফুটপাত ও বস্তিতে চাঁদাবাজি করে শত কোটি টাকার মালিক বনে ছিলেন। এরশাদ আমলে ফ্রিডম পার্টির ক্যাডার হিসেবে তার সন্ত্রাসের পথে যাত্রা।

একইভাবে কলাবাগান, ধানমণ্ডি ও গ্রিন রোডের কিছু অংশে সন্ত্রাসের একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেন শুদ্ধি অভিযানে গ্রেফতার হওয়া কৃষক লীগের ফিরোজ। পুরান ঢাকার এনু ও রূপন ভূঁইয়া ভ্রাতৃদ্বয় তাদের এলাকায় একই কাজ করতেন এবং ঢাকা শহরে তাদের ৫০টি প্লট-ফ্ল্যাট আছে বলে জানা যায়। মোহামেডান ক্লাব ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তা লোকমান হুসেন ভূঁইয়া উল্লেখিত শামীম, খালেদ ও সম্রাটের মতো ক্যাসিনো তথা জুয়া-মদ বাণিজ্যের মাধ্যমেই বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হন সাবেক যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, খালেদ, লোকমান ভুইয়া ও আরমান। গ্রেফতারের পর তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা, মাদকসামগ্রী ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে র‌্যাব।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, গত চার মাসে ৫০টি ক্যাসিনো ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি র‌্যাবের অভিযান। ২০টি অভিযান চালায় পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা। ৫০টি অভিযানে গ্রেফতার করা হয় ২৭৫ জনকে। এর মধ্যে ২২৩ জন ঢাকায়। আর বাকি ৫৩ জন ঢাকার বাইরের জেলাগুলোয়। তবে সময়ের সঙ্গে অভিযান বর্তমানে অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অর্ধশতাধিক অভিযানের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। এরই মধ্যে র‌্যাব ও পুলিশ পাঁচটি মামলার চার্জশিট দিয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), র‌্যাব ও থানা পুলিশ বাকি মামলাগুলোর তদন্ত করছে। সহস্রাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের তদন্ত চালাচ্ছেন দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও র‌্যাবের গোয়েন্দারা। দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে ১৮৭ জনের নাম ও দায়ের করা হয়েছে ১৬ মামলা। সব মিলে বছরের শেষ ভাগটি ছিল দুর্নীতিবাজ ও অবৈধ কারবারিদের জন্য রীতিমতো আতঙ্কের।

বিদায়ী বছরে দুর্নীতি ও ক্যাসিনোবিরোধী এই সাঁড়াশি অভিযানে গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কয়েকজন এমপি ও সাবেক মন্ত্রীর নাম বেরিয়ে আসে। এদের অনেকের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয় দুদক। শুদ্ধি অভিযানে দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ ও অবৈধ কারবারিদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি দুদকও সরব হয়ে কালো তালিকা তৈরি করে। তবে সরকারের শুদ্ধি অভিযানকে অনেক ক্ষেত্রেই আইওয়াস বা লোক দেখানো বলে মন্তব্য করেন বিএনপি নেতারা। তবে এই শুদ্ধি অভিযান সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে বলে মনে করেন সরকারি দলের আওয়ামী লীগের নেতারা।

এদিকে শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। ২৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, অভিযান অব্যাহত থাকবে। গত ১৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তর থেকে অপরাধ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত থাকবে। এরপরেও অভিযান চলমান থাকার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে আমরা ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো খেলা বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা নিশ্চিত হয়েছি, আর কোথাও এখন ক্যাসিনো নেই। অভিযানের সূত্রে এখন তদন্ত চলছে। এতে আরো কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দুদকের সাঁড়াশি অভিযান বছরজুড়ে ছিল আলোচিত। দুর্নীতি প্রতিরোধকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে অভিযানের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি ২০১৯ সালে বেড়েছে মামলা ও অনুসন্ধানের সংখ্যা। বিশেষ করে ক্যাসিনোকাণ্ড, ফরিদপুর পর্দাকাণ্ডসহ হাসপাতালের দুর্নীতি কিংবা রূপপুর বালিশকাণ্ডসহ আলোচিত বিষয়গুলোর অনুসন্ধান ও মামলা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ইমেজে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

মানবকণ্ঠ/আরবি





ads







Loading...