মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা আজও নির্ভুল হয়নি


poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:৫২

দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আজও নির্ভুল হয়নি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা। নির্ভুল ও সঠিক তথ্যভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম সংখ্যা দিচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের। ’৭১-এর রণাঙ্গনে যুদ্ধ না করেও অনেকেই হয়েছেন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা। নিচ্ছেন সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা।

আবার অনেকে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেও পাননি সরকারি স্বীকৃতি। অনাহারে-অর্ধাহারে পার করছেন দিনানিপাত। এ নিয়ে জাতীয় বীর সৈনিক মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ ও দুঃখ। স্বাধীনতার দীর্ঘসময় পরও মুক্তিযোদ্ধাদের নির্ভুল তালিকা না হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কলামিস্ট কামাল লোহানী মানবকণ্ঠকে বলেন, এটা একটা গাফিলতি, সরকারের চরম ব্যর্থতা।

আমরা আগামী বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করতে যাচ্ছি। অথচ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কারা তা এখনো নির্ণয় করতে পারিনি। এর সঙ্গে যারা জড়িত, যারা কাজ করার কথা তার সঠিক পদ্ধতিতে কাজ করেন নাই যার জন্য এটা হয়েছে। বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন আমলে যারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তারা যাচাই-বাছাই না করে ভুয়া লোকদের তালিকাভুক্ত করে গেছেন। যাচাই-বাছাই করার জন্য যদি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের দায়িত্ব দেয়া হতো তাহলে সঠিক তালিকা বের করা যেত। এটা না করে প্রশাসনের লোকদের দায়িত্ব দেয়ায় জিনিসটা গোলমাল হয়ে গেছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৩৫ হাজার। এর মধ্যে সরকারের কাছ থেকে প্রতি মাসে ভাতা পাচ্ছেন ১ লাখ ৮৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা। বাকি ৫০ হাজারের ভাতা বন্ধ রয়েছে। কিন্তু কেন তাদের ভাতা বন্ধ তা পরিষ্কার করেনি সরকার। তাদের সনদও বাতিল করা হচ্ছে না। তবে তাদের অনেকের সন্তানরা এই সনদ দেখিয়ে সরকারি চাকরি বাগিয়ে নিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, এই ৫০ হাজার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। ভুল তথ্য-উপাত্ত দিয়ে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তারা মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন। এদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ২৫৭ জনের সনদ বাতিল করেছে। এর মধ্যে বিভিন্ন বাহিনী ও সরকারি দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীও রয়েছেন। আর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তির বিষয়ে গত সেপ্টেম্বরে নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে ‘প্রবাসে বিশ্বজনমত’ নামে আরেকটি শ্রেণি। এই শ্রেণিতে ওই মাসেই একজনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও অন্য একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে যারা দীর্ঘদিন কাজ করছেন তারা বলছেন, যে প্রক্রিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা হচ্ছে তাতে কেয়ামত পর্যন্ত প্রকৃত তালিকা তৈরি করা সম্ভব হবে না। বরং অমুক্তিযোদ্ধারাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন, সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য এখন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে লাল মুক্তিবার্তা, ভারতীয় তালিকা ও বিভিন্ন বাহিনীর গেজেটকে। আর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি মানদণ্ড নির্ধারণ করে ২৪ এপ্রিল প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে।

ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা, ভারতীয় তালিকা (পদ্মা), ভারতীয় তালিকা (মেঘনা), ভারতীয় তালিকা (সেক্টর) ও ভারতীয় তালিকা (সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী); লাল মুক্তিবার্তা, লাল মুক্তিবার্তা স্মরণীয় যারা বরণীয় যারা; বেসামরিক গেজেট, মুজিবনগর গেজেট, বিসিএস ধারণাগত জ্যেষ্ঠতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গেজেট, বিসিএস গেজেট, স্বাধীন বাংলা শব্দসৈনিক গেজেট, বীরাঙ্গনা গেজেট, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গেজেট, ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ বাহিনী গেরিলা বাহিনী গেজেট ও বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে নিয়োজিত/ দায়িত্ব পালনকারী মুক্তিযোদ্ধা গেজেট এবং সেনাবাহিনী-বিমানবাহিনী গেজেট, নৌবাহিনী গেজেট, নৌ-কমান্ডো গেজেট, বিজিবি গেজেট, পুলিশবাহিনী গেজেট ও আনসার বাহিনী গেজেটকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করতে যেখানে লাল মুক্তিবার্তা ও ভারতীয় তালিকা রয়েছে, সেখানে নতুন করে নানা ভাগে শ্রেণিবিন্যাস করে মুক্তিযোদ্ধা শনাক্ত করা নিয়েও আছে নানা বিতর্ক।

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এসএম আরিফ-উর-রহমান জানান, মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। আমাদের এখানে যে সংখ্যা আছে তা সঠিক। গেজেটে যখন নাম আছে, সেটাই আমাদের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। সব রকম যাচাই-বাছাই করেই মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করা হয়েছে। কবে নাগাদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকা চূড়ান্ত হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তালিকা তো চলমান। এটা বন্ধ হওয়ার সুযোগ নেই।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads






Loading...