২৬ টাকা কেজি দরে ছয় লাখ মেট্রিক টন ধান কিনবে সরকার

কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে ধান কিনছে সরকার

প্রাথমিকভাবে ১৬ উপজেলায় ধান কেনা হবে

কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে ধান কিনছে সরকার

poisha bazar

  • মাহমুদ সালেহীন খান
  • ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৯:৩৯

অনেক কষ্ট করে কৃষকরা ধান ফলান। বিক্রির সময় তেমন একটা ধানের দাম পান না কৃষকরা। প্রতি বছর ধানের মৌসুমে দাম নিয়ে কৃষকরা হতাশ হয়ে পড়েন। ধানের ন্যায্যমূল্য পান না কৃষক সমাজ। এবার শোনা যাচ্ছে কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে ২৬ টাকা কেজি দরে ধান কিনছে সরকার। ছয় লাখ মেট্রিক ধান কেনার কথা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আখাউড়া পৌর শহরের তারাগনের কৃষক মো. আলম খাঁ’র কাছে মোবাইলে ফোন করে উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, লটারিতে তার নাম আসায় চলতি মৌসুমে সরকার তার থেকে আমন ধান কিনবে। খবরটি শুনেই দারুণ খুশি আলম খাঁ। এ মৌসুমে আট বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন মোস্তাফিজুর রহমান। এখন ধান বিক্রির চিন্তা দূর হয়েছে।

একইভাবে মোবাইলে কল পান নারায়ণপুরের কৃষক জামির হোসেন। তারও সব ধান কিনবে সরকার। এই দুই ভাগ্যবান ছাড়াও পৌর এলাকার সিরাজ মিয়া, দুলাল ভূঁইয়া, মো. রমজান, মো. হান্নান মিয়া, মো. নোয়াব মিয়াসহ একাধিক কৃষক একইভাবে মোবাইলের মাধ্যমে কৃষি অফিসের কল পেয়েছেন। কৃষক বাঁচাতে সরকারের এ পদক্ষেপে কৃষকরা খুব খশি।

সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন কৃষি গবেষক, বিশেষজ্ঞ, নাগিরক অধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন তারা। তাদের মধ্যে দু-একজন বলছেন, কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়ে যে ব্যবস্থাপনা সারাদেশে রয়েছে, সেটি কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার জন্য যথেষ্ট নয়। তারপরও যদি ২৬ টাকা কেজিতে ধান কিনে সরকার। তবেই এই উদ্যোগে খুশি হবেন কৃষকরা। কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, সারাদেশে প্রায় দুই কোটি কৃষক আছে। সরকারের এ উদ্যোগ সাধুবাধ পাওয়ার যোগ্য। তবে এর কিছু বিরূপ দিকও থাকতে পারে। তার মধ্যে একটি দিক হচ্ছে রাজনৈতিক বিবেচনা। রাজনৈতিক বিবেচনায় ধান কেনা হলে আদর্শবান অনেক কৃষক বাদ পড়ে যেতে পারেন।

কৃষি নিয়ে গবেষণা করেন ফরিদা আকতার বলেন, এখনকার ব্যবস্থাপনায় সংস্কার করা না হলে অনেক কৃষক বাদও পড়ে যতে পারেন। সরকার মনে করছে, বর্তমান অবস্থা দিয়েই সরাসরি কৃষকের বড় অংশকে সুবিধা দেয়া সম্ভব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কৃষকদের কাছ থেকে অ্যাপস এবং লটারির মাধ্যমে ধান কিনছে সরকার। চলতি বছরের আমন মৌসুমে সরাসরি কৃষকের কাছে ২৬ টাকা কেজি দরে ছয় লাখ মেট্রিক টন ধান কিনবে সরকার। এ ছাড়া ডিলারদের কাছ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে তিন লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল এবং ৩৫ টাকা কেজি দরে ৫০ হাজার মেট্রিক টন আতপ চাল কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র থেকে জানা গেছে, কৃষকদের কাছ থেকে দু’ভাবে ধান কিনছে সরকার। অ্যাপসের মাধ্যমে অনলাইনে নিবন্ধন করে প্রাথমিকভাবে ১৬টি উপজেলায় কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনছে সরকার। আর দেশের বাকি উপজেলাগুলোতে লটারির মাধ্যমে ধান কেনা হচ্ছে। দুভাবে সরকার কৃষকদের কাছ থেকে মোট ৬ লাখ টন ধান কিনবে। এতে কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য পাবেন। একই সঙ্গে আলুচাষিদের স্বার্থ চিন্তা করে আলু রফতানির চেষ্টা করছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কৃষিপণ্য উৎপাদনে কৃষকদের যাতে বেশি পয়সা খরচা না হয় সেজন্য ডিএপি সারের দাম কেজিতে ৯ টাকা কমিয়ে ১৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সরকারের এমন উদ্যোগের ফলে কৃষকরা লাভবান হবেন। এবার অনলাইন এবং লটারি পদ্ধতিতে সরকার ধান কেনায় মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা করতে পারেননি। রোপা আমন ফসলে যেসব কৃষক ধান বেচেছেন আগামী বোরো ফসলে তারা সরকারের কাছে ধান বেচতে পারবেন না। এভাবে বছরজুড়ে চক্রাকারে ঘুরতে থাকবে এই বৃত্ত। এতে কৃষি কার্ডধারী কৃষকরা পুরো বছরজুড়েই সরকারের কাছে ধান বেচতে পারবেন। সূত্র আরো জানায়, কৃষকদের উৎসাহ দেয়ার জন্য সার, বীজ প্রণোদনা দেয়ার পাশাপাশি কম সুদে ঋণ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কৃষকরা শ্রমিক সঙ্কটে ভুগছেন। এর ফলে ধান লাগানো এবং কাটতে খরচ বেশি হচ্ছে। এজন্য কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষির যান্ত্রিকীকরণ করতে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ ছাড়া ধান কাটার জন্য সরকার কৃষককে প্রণোদনা দেবে। এজন্য ৪০০ কোটি টাকা বাজেট রাখা হয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, কৃষি উৎপাদনকে লাভজনক করতেই কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনতে রাজি হয় সরকার। গত দুই মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হলেও দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। এতে কৃষকরা কৃষি উৎপাদনের আয় দিয়ে পরিবারের খরচ চালাতে পারেন না। এতে কৃষক উৎসাহিত হবেন। তবে এবার সরকারের কাছে ধান বেচবেন সামনের ফসলে তারা পারবেন না। বাকিরা বেচবেন।
তিনি আরো বলেন, চাষিদের উৎপাদন খরচ কমানোরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সারের দাম কমেছে। সরকার প্রণোদনা দিচ্ছে। এসবের ফলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। এখন কৃষি কীভাবে লাভজনক করা যায়, রফতানিযোগ্য করা যায়, কৃষককে কীভাবে উৎসাহ দেয়া যায় সে বিষয়ে কাজ চলছে।

কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান বলেন, ধান কাটার প্রণোদনা দিতে কৃষি মন্ত্রণালয়েই টাকা রয়েছে। কৃষি খাতে এই প্রণোদনাকে তিনি বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন। এবার ১৬টি উপজেলা থেকে অ্যাপসের মাধ্যমে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতে কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আগামী বছর অ্যাপসের পরিধি আরো বাড়বে। বাকি উপজেলাগুলোতেও লটারির মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হয়েছে। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ২০ নভেম্বর থেকে ধান ও ১ ডিসেম্বর থেকে চাল সংগ্রহ শুরু হয়েছে তা চলবে আগামী বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। কৃষকদের প্রতি নজর রেখেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে এবার ৬ লাখ টন ধান সংগ্রহ করব। তিন লাখ ৫০ হাজার টন চাল সংগ্রহ করব ডিলারদের কাছ থেকে। ৫০ হাজার টন আতপ চাল ডিলারদের কাছ থেকে কেনা হবে।

ঢাকার ধামরাইয়ের খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম বলেন, যেসব কৃষকের কাছ থেকে সরকার ধান কিনেছে সেসব কৃষককে তাদের অ্যাকাউন্টে (ব্যাংক হিসাব নম্বর) সরকার টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছে। সরকার যখন একজন কৃষককে কৃষি কার্ড দেয় তখনই কৃষককে ব্যাংকে হিসাব চালু করতে হয়।

নীলফামারীর খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা কাজী সাইফুদ্দিন অভি বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কৃষি কমিটি কৃষকদের নিয়ে লটারি করেছে। যাদের নাম লটারিতে উঠেছে তারাই সরকারের কাছে ধান বিক্রি করেছেন। লটারির মাধ্যমে ধান কেনায় কৃষক ঠিকঠাক দাম পেয়েছেন বলে তিনি জানান। কৃষকদের স্বার্থে ফসলের উৎপাদন ব্যয় কমাতে ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সারের দাম প্রতি কেজিতে ৯ টাকা কমিয়ে ১৬ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর ফলে ডিএপি সারের দাম কেজিপ্রতি ৯ টাকা কমিয়ে ডিলার পর্যায়ে ১৪ টাকা ও কৃষক পর্যায়ে ১৬ টাকা নির্ধারণ করা হলো। এজন্য প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে বলে জানা গেছে।

মানবকণ্ঠ/আরবি




Loading...
ads






Loading...