ক্যাসিনো সাঈদের সহযোগী যুবলীগ নেতা জামালের ত্রাসের রাজত্ব

মানবকণ্ঠ
হাসান উদ্দিন জামাল

poisha bazar

  • ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৯:৫১

সরকারের দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের মধ্যেও আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ক্লাব পাড়ার কুখ্যাত ক্যাসিনো ডন, সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর একেএম মোমিনুল হক সাঈদের ডানহাত খ্যাত মতিঝিল থানার ৯নং ওয়ার্ড যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাসান উদ্দিন জামাল। সরকারের শুদ্ধি অভিযানের কারণে সিঙ্গাপুরে পালিয়ে থাকলেও ক্যাসিনো সাঈদের সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ এখনো তারই হাতে। আর এসব কিছু সাঈদ নিয়ন্ত্রণ করছে তার একান্ত আস্থাভাজন আরামবাগ ক্যাসিনো ক্লাবের মালিক হাসান উদ্দিন জামালের মাধ্যমে।

শুধু তাই নয়, আরামবাগ ফকিরাপুলে এখনো হাসান উদ্দিন জামাল তার সন্ত্রাসী ও পেটোয়া বাহিনী দিয়ে এলাকায় যারা মোমিনুল হক সাঈদের বিপক্ষে আছে তাদের বাড়াবাড়ি করলে ভবিষ্যতে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ক্যাসিনো সাঈদের ডানহাত হিসেবে সুপরিচিত এবং আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের ক্যাসিনোর মালিক হওয়া সত্ত্বেও শুদ্ধি অভিযানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগের আগামী কমিটিতে সভাপতির পদ পাওয়ার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন হাসান উদ্দিন জামাল।

জানা গেছে, মতিঝিল থানার ৯নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতাদের মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বসে জামাল তার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। এ ছাড়া রাজাকার ভবন খ্যাত ৮৯ ও ৮৯/১ আরামবাগ হোল্ডিং নাম্বারের বিপিএল ভবন দুটি এখনো জামালের দখলে। প্রতিমাসে এই ভবন দুটি থেকে ভাড়া ওঠে আনুমানিক প্রায় ১৫ লাখ টাকা। শুধু এই দুটি ভবন নয়, ওয়ান্ডার্স, দিলকুশা ও আরামবাগ ক্লাব সংলগ্ন সব দোকানের ভাড়া ও জামালের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, এলাকাবাসী কেউ প্রকাশ্যে জামালের বিরুদ্ধে এসে ভয়ে মুখ খুলছে না।

এলাকাবাসীর অভিমত, যদি কোনোভাবে এই জামাল আবারো ওই ওয়ার্ড যুবলীগের আগামী কমিটিতে সভাপতি পদে আসে। তবে ভদ্রভাবে এই এলাকাতে আর বসবাস করা যাবে না। যে কারণেই অনতিবিলম্বে হাসান উদ্দিন জামালকে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান তারা।

যেভাবে উত্থান জামালের: হাসান উদ্দিন জামাল মতিঝিলের স্থানীয় একটি প্রেসে সামান্য বেতনে কাজ করতেন। প্রেসের এক বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় পরবর্তীতে দেয়ালে নেতাদের পোস্টার সাঁটানোর কাজ পান। এর পরই খুলে যায় জামালের কপাল। নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে নিজের ভাগ্য বদলাতে থাকেন তিনি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর একেএম মমিনুল হক সাঈদের ডানহাত বলে পরিচিত তিনি। আশীর্বাদ ছিল গ্রেফতার হওয়া ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের। তার বদৌলতে ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির পদটিও বাগিয়ে নেন জামাল। ওয়ার্ড নেতা হয়েই তিনি অবৈধভাবে বিপুল বিত্তের মালিক হয়েছেন। ক্যাসিনো কাণ্ডে কাউন্সিলর সাঈদ এলাকাছাড়া হলে তার সম্রাজ্য দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন জামাল। তিনি এখন এ ওয়ার্ডে সভাপতি হওয়ার দৌড়ে আছেন।

স্থানীয় নেতাকর্মী জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুরে থাকা যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ও কাউন্সিলর সাঈদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হয় তার। হাসান উদ্দিন জামালের গ্রামের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিন থানার পক্ষিয়া ইউনিয়নে। তার বাবার নাম হাবিবুল্লাহ।

তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তিন ছেলে ও স্ত্রী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভোলায় থাকেন। সেখানে বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করেছেন। রয়েছে ভোলা শহরে আলিশান বাড়ি। সূত্র জানায়, নানা অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত জামাল অবৈধ উপায়ে অর্থ কামিয়েছেন। আরামবাগ ক্লাবে কাউন্সিলর সাঈদ যে ক্যাসিনো চালাতেন তার দেখভালের দায়িত্ব ছিল জামালের ওপর। মূলত জামালই সেখান থেকে টাকা সংগ্রহ করে সাঈদকে দিতেন। নিজে একটি বড় অংশ পেতেন। অনেকে জামালকেই এই ক্যাসিনোর মালিক বলে জানতেন।

জামালের আরেকজন অন্যতম সহযোগী হচ্ছেন, মতিঝিল থানা ৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রচার সম্পাদক আবুল কাশেম মন্টু। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার কাজটি জামালের হয়ে করেন মন্টু। ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে যাবতীয় নির্মাণ কাজের জন্য তাদের চাঁদা দিতে হয়। তাদের নির্যাতনের ভয়ে স্থানীয় লোকজন মুখ খুলতে ভয় পান। ফকিরাপুল ক্লাবের পাশে আজাদ বয়েজ ক্লাব। সেখান থেকে প্রতি মাসে জোর করে লাখ টাকা চাঁদা তোলেন। টাকা দিতে না চাইলে মারধর করেন। ঢাকার শনির আখড়া ও রায়েরবাগে রয়েছে জামালের নিজস্ব বাড়ি ও ফ্ল্যাট। সোনারগাঁওয়ে তার নিজস্ব জমি আছে। ভোলায় তার কয়েক কোটি টাকার ইলিশের ব্যবসা আছে। এ ছাড়া অনেকগুলো ট্রলারের মালিক তিনি। ৮ থেকে ৯টি প্রেজার মেশিন রয়েছে তার। রয়েছে নামে-বেনামে অনেক টাকা ও সম্পদ।

স্থানীয় সূত্র জানায়, জামাল এবং মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের নেতা মাহমুদুল হাসান কাউন্সিলর সাঈদের অবর্তমানে তার কাজ করছেন। মাহমুদুল হাসান কাউন্সিলর সাঈদের ভাগিনা। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার আগে সাঈদের বাসা থেকে ক্যাসিনোর যাবতীয় সরঞ্জামাদি সরিয়ে ফেলেন জামাল ও হাসান। কাউন্সিলর সাঈদের বাসার চাবি থেকে শুরু করে কাউন্সিলর কার্যালয়ের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেন জামাল। এখনো তিনি আরামবাগ হাজির বিল্ডিং, মতিঝিল মার্কেটসহ একাধিক স্থানের ভাড়া তোলেন।

ভুক্তভোগী যুবলীগের একজন নেতা বলেন, প্রতিনিয়ত হুমকি-ধামকির মধ্যে আছি। একেক সময় একেক নাম্বার থেকে ফোন করে হুমকি দেয়। কখনো বলা হয় দুই দিন কখনো তিন দিন কখনো বা সাত দিনের মধ্যে খুন করা হবে বলে হুমকি দেয়। ভুক্তভোগী আরেক নেতা বলেন, জামালের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কখনো প্রতিবাদ করলে তিনি আমাকে হুমকি দিতেন, বলতেন, আপনি এলাকায় আমাকে সময় দেন না! রাজনীতিতে সময় দেন না।

বিষয়টি ভালো হচ্ছে না। আমার বিষয়ে কোথাও মুখ খুললে ভালো হবে না। চুপচাপ থাকেন। দলের আরেক নেতা ও মতিঝিলের বাসিন্দা বলেন, আমার পুরনো ব্যবসা আছে। মিছিল-মিটিং-এ যেতে না চাইলে বাধ্য করেন। দলীয় ছেলেদের দিয়ে লাঞ্ছিত করেন। তিনি বলেন, আমরা দুর্দীনের কর্মী। কিন্তু কোনো মূল্যায়ন আমরা পাই না। সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছেন তারা। জামালকে ক্যাসিনোর মালিক বানানো হয়েছে। বাফুফের পেছনে ভ্যানগাড়ির স্ট্যান্ড, পুরো ৯নং ওয়ার্ডের সিকিউরিটি নিয়ন্ত্রণের নামে বড় একটি অঙ্কের টাকা যেত জামালের পকেটে। জামাল ওয়ার্ড যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন। গত ফেব্রুয়ারিতে নেতাকর্মীদের নিয়ে নৌ-বিহারে যান ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। নৌবিহারেই সম্রাট জামালকে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির ঘোষণা দেন বলে নেতাকর্মী জানিয়েছেন। সম্রাটের সান্নিধ্যে আসার পর থেকেই মূলত জামাল চাঁদাবাজিতে নামেন।

অভিযোগের বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার যোগাযোগ করতে জামালকে এলাকায় পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত তিনটি ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে বন্ধ পাওয়া যায়।

মানবকণ্ঠ/আরবি





ads






Loading...