আইএসের টুপি:সেই ‘অচেনা’ ব্যক্তি কে?

- সংগৃহীত

poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ০১:১৬

প্রিজনভ্যানে কারাগার থেকে আদালতে আসার পথে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের প্রতীক সংবলিত টুপিটি একজন দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জঙ্গি রাকিবুল হাসান রিগ্যান।

কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে হতাহতের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মঙ্গলবার (০৩ ডিসেম্বর) ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে বিচারকের প্রশ্নে দণ্ডিত জঙ্গি রিগ্যান বলেছেন, হলি আর্টিজানে হামলার মামলার রায়ের দিন ‘অচেনা’ এক ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি টুপিটি পেয়েছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, সেই অচেনা ব্যক্তিটির পরিচয় কি? কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে বাইরের কারো পক্ষে টুপিটি সরবরাহ করা সম্ভব কিনা। বিষয়টি তদন্তে কমিটিও গঠিত হয়। ইতোমধ্যে কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কারাগার থেকে ওই টুপি আসেনি। ঢাকার পুলিশের পক্ষ থেকেও একই দাবি করা হয়েছে। কারাগার কিংবা পুলিশের কাছ থেকে টুপি আসেনি।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রিগ্যান বলেছেন, রায়ের দিন অচেনা এক ব্যক্তির কাছে থেকে টুপিটি পেয়েছেন। এখানেই জনমনে প্রশ্ন তাহলে সেই অচেনা ব্যক্তিটির পরিচয় কি?

অপরদিকে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা মামলার রায়ের পর দুই জঙ্গি রিগ্যান ও রাজীব গান্ধী আদালত থেকে আইএসের প্রতীক সংবলিত টুপি পরে বের হলেও কারাগারে পৌঁছানোর পর তাদের কাছে সেই টুপি আর পায়নি বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।

আর পুলিশও বলছে, সেই টুপির হদিস তারা জানে না। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে টুপিটি কোথায় গেল? কল্যাণপুরের জাহাজবাড়ির জঙ্গি আস্তানায় অভিযান সংক্রান্ত মামলার মঙ্গলবার নির্ধারিত তারিখ ছিল। গুলশান হামলা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রাকিকুল হাসান রিগ্যানসহ পাঁচ জঙ্গিকে হেলমেট ও বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এ উপলক্ষে আদালতপাড়ায় গতকাল কঠোর নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

শুনানির এক পর্যায়ে আসামি রিগ্যানকে পেয়ে বিচারক মজিবুর রহমান জানতে চান, ওই টুপিটি কোথায় পেয়েছিলেন। কাঠগড়ায় থাকা রিগ্যান তখন বলেন, ‘ভিড়ের মধ্যে একজন দিয়েছে।’ কে দিয়েছে- বিচারক প্রশ্ন করলে রিগ্যান বলেন, ‘আমি চিনি না।’

আর কাউকে কি টুপি দিয়েছিল- প্রশ্নে রিগ্যান বলেন, আর কাউকে দেয়নি। প্রিজনভ্যানে ওঠার পর আরেক আসামি জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী ওই টুপিটিই নিয়ে পরছিলেন। আদালত জানতে চান, টুপিটি নিলেন কেন জবাবে জঙ্গি রিগ্যান বলেন, ‘ভালো লাগায় টুপিটি নিয়েছি।’

পুলিশ ও কারা কর্মকর্তারা বলছেন, সেই টুপি এখন কোথায় সেটি তাদের জানা নেই। তাদের ধারণা আদালত প্রাঙ্গণে ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন দণ্ডিত জঙ্গি রিগ্যানকে টুপিটি সরবরাহ করেছিল। সেই অজ্ঞাত ব্যক্তিকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তাকে শনাক্ত করা গেলেও উদ্দেশ্যটাও পরিষ্কারভাবে জানা যাবে।

এদিকে আলোচিত সেই টুপিটি কোথা থেকে এসেছে, সে বিষয়ে গত রোববার তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষের কমিটি। কারা মহাপরিদর্শকের (আইজি-প্রিজন্স) হয়ে সেই প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় বলে জানা গেছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান কারা অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (প্রিজন্স) কর্নেল মো. আবরার হোসেন বলেন, কমিটির তদন্তে উঠে এসেছে হলি আর্টিজান বেকারি হামলা মামলায় রায়ের পর দুই আসামি আইএসের প্রতীক সংবলিত যে টুপি পরেছিলেন তা কারাগার থেকে যাইনি। কমিটি কারাগারের সংশ্লিষ্ট স্থানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখেছেন। সেদিন জঙ্গিদের আদালতে নেয়ার সময় প্রিজনভ্যানে তোলার আগে তল্লাশি করা হয়েছিল। তখনো কোনো টুপি পাওয়া যায়নি। আদালত থেকে এই আসামিদের কারাগারে ফেরত আনার পর তল্লাশি করেও এমন কোনো টুপি পাওয়া যায়নি।

আইএস টুপি পরার ওই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা  বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুবুল আলমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়। সেই প্রতিবেদন গতকাল পর্যন্ত জমা দেয়া হয়নি।

জানতে চাইলে মো. মাহবুব আলম বলেন, জঙ্গিরা সেই টুপি কোথায় পেয়েছেন তদন্তে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জিজ্ঞাসাবাদে জঙ্গিরা জানিয়েছে, আদালত থেকে কারাগারের ফেরার সময় পথিমধ্যে প্রিজনভ্যানের গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ফেলে দিয়েছেন। তদন্তে বিস্তারিত উঠে আসবে। এ সপ্তাহের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হবে।

দেশ-বিদেশে আলোড়িত হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলা মামলায় রায়ে গত ২৭ নভেম্বর সাত জঙ্গিকে ফাঁসির দণ্ড দেন বিচারক। ঢাকার আদালতে এ রায় ঘোষণার পর দণ্ডিত জঙ্গিরা আদালত থেকে বেরিয়ে আসার পর আসামি রাকিবুল হাসান রিগ্যানের মাথায় আইএসের প্রতীক সংবলিত টুপি দেখা যায়। এরপর প্রিজনভ্যানে থাকা আরেক আসামি জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধীর মাথায়ও একই জাতীয় টুপি দেখা যায়।

এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয় ও নানা সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরবর্তীতে পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষের
কাছ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আসে।


২০১৬ সালের ১ জুলাই নজিরবিহীন গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর জঙ্গি দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছিল, তাতে ২৫ জুলাই কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান মেলে। সেখানে অভিযানে ৯ জন নিহত হন, আহত অবস্থায় ধরা পড়েন বগুড়ার রিগ্যান। ওই অভিযানের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা, জঙ্গি তৎপরতার ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়, সেই মামলার বিচারচলছে মজিবুর রহমানের আদালতে।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়ঙ্কর জঙ্গি হামলা স্তম্ভিত করেছিল পুরো বাংলাদেশকে। বিচার শুরু হওয়ার এক বছরের মাথায় এই মামলার রায় ঘোষণা হয় গত ২৭ নভেম্বর। এতে সাত আসামিকে দণ্ড ও একজনকে খালাস দেয়া হয়।


ফাঁসির দণ্ড পাওয়া সাত আসামি হলেন- রাকিবুল ইসলাম রিগ্যান ওরফে রাফিউল ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, মোহাম্মদ আসলাম হোসেন ওরফে র‍্যাশ, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মোহাম্মদ হাদিসুর রহমান সাগর ওরফে সাগর, মামুনুর রশিদ রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালেদ। খালাস পান মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান।


ভয়াবহ ওই গুলশান হামলায় ১৭ জন বিদেশি ও দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ মোট ২২ জন নিরপরাধ নাগরিককে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে ভয়ঙ্কর জঙ্গিরা। পরের দিন সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে নিহত হয় হামলাকারী পাঁচ জঙ্গি। পরবর্তীতে পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানকালে নিহত হয় মূল পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরীসহ আরো আট দুর্ধর্ষ জঙ্গি নেতা। পুলিশের তদন্তে এসেছে, ওই হামলায় জড়িত গোষ্ঠীর নাম জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি।

 

মানবকণ্ঠ/এসআর




Loading...
ads





Loading...