সৌদিতে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের সুরক্ষা

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় বিশেষজ্ঞদের

মানবকণ্ঠ
ছবি - সংগৃহীত।

poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:২৬,  আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:৩৬

সৌদি আরবে এখন থেকে নারী কর্মীরা যতদিন কর্মরত থাকবেন, ততদিন তাদের দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের রিক্রুটিং এজেন্সি বহন করবে। যেসব নারী কর্মী প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় আছেন, প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত তাদের আবাসন ও অন্যান্য দায়িত্বও বহন করবে রিক্রুটিং এজেন্সি। এ ছাড়া ভাগ্যান্বেষণে সৌদি আরবে যাওয়া নারীদের নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ একটি আইটি

প্ল্যাটফর্ম মুসানেড সিস্টেম স্থাপন করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের যৌথ কারিগরি কমিটির সভায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম রেজা। তিনি জানিয়েছেন, সৌদিতে যাওয়া নারী কর্মীদের সুরক্ষায় নজরদারি জোরদারে সরকারিভাবে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেয়া হবে। এদিকে আশ্বাসগুলো যেন বাস্তবায়ন হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখার দাবি রেখেছেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিদের সংগঠন বায়রা বলছে, সৌদিতে কর্মরত নারী কর্মীদের সব দায়িত্ব যদি রিক্রুটিং এজেন্সিকে নিতে হয় তাহলে সরকারের কাজ কী? এখন সব দায়িত্ব আমাদের দেয় তাহলে এটা শুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া কিছু নয়।

গতকাল সোমবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান তিনি। গত ২৭ নভেম্বর রিয়াদে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সৌদি শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে তৃতীয় জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেলিম রেজা বলেন, ‘এই মুসানেড সিস্টেমে কর্মীদের বিস্তারিত ঠিকানা, সৌদি ও বাংলাদেশ রিক্রুটিং এজেন্সি এবং নিয়োগকর্তার পূর্ণ যোগাযোগের ঠিকানা, নারী কর্মীদের নিয়োগকর্তা পরিবর্তন-সংক্রান্ত তথ্যাদি, নারী কর্মীর আগমনের তারিখ এবং নিয়োগকর্তার কাছে হস্তান্তরের তারিখ, প্রত্যাবর্তনকারী গৃহকর্মীর এক্সিট সংক্রান্ত তথ্যাদি সন্নিবেশিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য তথ্যাদি হালনাগাদ করা হয়েছে। অবশিষ্ট তথ্যাদি হালনাগাদ কাজ চলমান রয়েছে।’

প্রবাসী কল্যাণ সচিব বলেন, ‘বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি সাধারণ চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানান, এ বিষয়টি এখনো পরীক্ষাধীন রয়েছে এবং আগামী জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটির সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হবে।’ তিনি বলেন, ‘এবার সৌদি আরবের কর্তৃপক্ষকে অনেক আন্তরিক মনে হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। আরো নেবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তারা বাংলাদেশি কর্মীর ওপর নির্যাতন করায় এক দম্পতিকে হাজতে নিয়েছে। কর্মীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দিচ্ছে।’

নীতিমালা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের নীতিমালায়ও কিছু পরিবর্তন না হবে। যেমন, যে সকল নারীকর্মী কাজ ত্যাগ করে পালাতক হয়েছেন, তাদের পুলিশ কোনোভাবেই নিয়োগকর্তার কাছে হস্তান্তর করবে না। নারীকর্মী যতদিন কর্মরত থাকবেন ততদিন তার দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশ ও সৌদি রিক্রুটিং এজেন্সি বহন করবে। যে সকল নারীকর্মী প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় আছেন, তারা প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত তাদের আবাসন ও অন্যান্য দায়িত্ব রিক্রুটিং এজেন্সি বহন করবে। নারী কর্মীরা কর্মকাল পূর্ণ করলে তাদের নিরাপদে প্রত্যাবর্তনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট এজেন্সি বহন করবে এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস ও সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবে। যদি নারী কর্মী মেয়াদ শেষে কাজ করতে চান তাহলে অবশ্যই চুক্তি নবায়ন করতে হবে এবং তা বাংলাদেশ দূতাবাস কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। চুক্তি নবায়নের পর সংশ্লিষ্ট এজেন্সি এ সংক্রান্ত তথ্যাদি মুসানেডে আপলোড করবে বলে জানা গেছে।
ভিসা ট্রেডিং বন্ধের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ সচিব বলেন, উভয় পক্ষ ভিসা বাণিজ্য বন্ধের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সৌদি কর্তৃপক্ষ এ ধরনের অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি আরোপ করা হবে মর্মে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলকে অবহিত করেছেন। ভিসা বাণিজ্য বন্ধের বিষয়ে উভয় দেশ একযোগে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছে। আমরা যৌথভাবে কাজ করব।’

তিনি আরো বলেন, এ পর্যন্ত ভিসা ট্রেডিংসহ অন্যান্য অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত থাকায় ১৬৪টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের অভিযোগ কেস টু কেস দেখা হবে। একই সঙ্গে, এই চেইনের সঙ্গে যারা জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। সচিব আরো বলেন, ‘সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের বিদ্যমান স্বাস্থ্যবীমা পর্যাপ্ত নয়। অসুস্থ কর্মীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে স্বাস্থ্যবীমা করার জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষ কোম্পানি/ নিয়োগকর্তাদের বাধ্য করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলে জানিয়েছেন।’

গৃহকর্মীদের ওপর নিয়োগকর্তাদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে মামলা করার কতটুকু সুযোগ সৌদি সরকার দেবে- এমন প্রশ্নের জবাবে সেলিম রেজা বলেন, ‘সৌদি শ্রম আদালতে মামলা করার পদ্ধতি আরো সহজ করার বিষয়ে দু’পক্ষ একমত হয়েছে। এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে খুব শিগগিরই অবহিত করবে। সকল কর্মী যাতে চুক্তির কপি পেতে পারেন, সে জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নেবে।’ তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে সৌদিতে নির্যাতনকারী এক দম্পতিকে আটক করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে একটি সমস্যাও রয়েছে, সেটা হলো আমাদের কর্মীরা মামলা বা অভিযোগ করে সেখানে থাকতে চান না। ফলে তাদের অভিযোগটি আমলে নেয়া হয় না। তারা অভিযোগ করেই দেশে চলে আসে। এ ছাড়া আমাদের দেশের কর্মীরা আকামা থাকা অবস্থায় চাকরি পরিবর্তনের কারণে অবৈধ হয়ে যাচ্ছেন। এ জন্য সে দেশের কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে বলেছে।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে সারাবিশ্বে প্রায় এক কোটি ২০ লাক কর্মী রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ৪৭১ জন নারী কর্মী। মধ্যপ্রাচ্যের ১১টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারী কর্মী রয়েছে সৌদি আরবে। সেখানে বর্তমানে দুই লাখ ৯৩ হাজার ৫৮৮ জন নারী কর্মী রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন কারণে দেশে ফেরত এসেছে আট হাজার ৫০৭ জন। তারা সাধারণত থাকা ও খাওয়া সমস্যা, বাচ্চা রেখে যাওয়াসহ নানাভাবে শারীরিক নির্যাতনের কারণে দেশে ফেরত আসতে চান। এ ছাড়া সৌদি আরবে বাংলাদেশের সেফহোমে রয়েছে ১৪৬ জন, যারা দেশে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। সেফহোম থেকে ৩৮০ জন নারী কর্মী পুনরায় তাদের কর্মস্থলে ফিরে গেছেন। গত ১১ মাসে সৌদি আরব থেকে ১৯ জন নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফেরত এসেছে। তারা শারীরিক অসুস্থতাসহ নানা কারণে মৃত্যুবরণ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক শামসুল আলম, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব জাহিদুল হোসাইনসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে আশ্বাসগুলো যেন বাস্তবায়ন হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখার দাবি রেখেছেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরীফুল হাসান। তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, আমরা এত দিন থেকে কতটা সঙ্কটময় অবস্থায় ছিলাম তা এই আশ্বাসেই বোঝা যায়। এখানে বেশ কয়েকটি ভালো বিষয় আছে। যেগুলো হলো- আগে তিন মাস নারী কর্মীদের খেয়াল রাখত সৌদি আরব এখন পুরো সময় তারা নজরদারিতে রাখবে এটা খুব ভালো দিক। এ ছাড়াও আইনি সহায়তা, নিরাপত্তার আশ্বাসসহ বেশ কিছু আশ্বাস দিয়েছে সৌদি। এই আশ্বাসগুলো যেন আশ্বাসে না থেকে বাস্তবায়ন হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এই আশ্বাসগুলো বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।

রিক্রুটিং এজেন্সিদের কী আইনের আওতায় আনা সম্ভব? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন দুই দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে দায়বদ্ধতার মধ্যে আনতে হবে। এই বিষয়গুলো কী ভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে তা খেয়াল রাখতে হবে। আর সরকার যদি চায় তাহলে রিক্রুটিং এজেন্সগুলোকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব। সৌদিতে কর্মরত নারী কর্মীদের সব দায়িত্ব যদি রিক্রুটিং এজেন্সিকে নিতে হয় তাহলে সরকারের কাজ কী? এমন প্রশ্ন রেখেছে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিদের সংগঠন বায়রা।

সংগঠনটির অর্থ সম্পাদক মিজানুর রহমান মানবকণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ সরকার যদি আমাদের বলে তাহলে আমরা সব দায়-দায়িত্ব বহন করব। তবে আমার প্রশ্ন হচ্ছে- আমরা যে বাংলাদেশের নাগরিক সে হিসেবে সরকারের কি দায়-দায়িত্ব। ভিনদেশে আমাদের কতটুকু ক্ষমতা আছে আর কতটুকু করতে পারব তা সবার ধারণা আছে। এখানে তারা বলতে পারতেন, বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি ওই দেশের রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে সরকারকে সব তথ্য দেবে আর অ্যাম্বেসি দায়িত্ব নেবে। আর আমাদের মন্ত্রণালায় আমাদের দেখান যে ফিলিফাইন কিভাবে ব্যবস্থা করে, শ্রীলঙ্কা কিভাবে ব্যবসা করে। আমাদের মন্ত্রণালয় আমাদের অ্যাম্বেসিকে কি বলতে পারেন না ওদের অ্যাম্বেসি কিভাবে ব্যবস্থা করে তা খেয়াল রাখতে।

এ চুক্তিতে কোনো কার্যকর ফল আসবে না দাবি করে তিনি বলেন, ওনারা উনাদের মতো করে বলেবেন আর আমরা তাদের লাঠির ওপর আছি বলে ব্যবসা করতে হলে তা মেনে নিতে হবে। এতে কোনো কার্যকর ফল আসবে না। আমাদের কর্মীদের ভালো রাখতে হলে ওই দেশের এজেন্সিকে দায়িত্ব নিতে হবে দুই বছর, কফিলকে (নিয়োগ কর্তা) দায়িত্ব নিতে হবে দুই বছর, সরকারকে দায়িত্ব দিতে হবে দুই বছরের জন্য।

তিনি আরো বলেন, এখানে একটি কথা স্পষ্ট এসেছে আমাদের মেয়েরা যতদিন ওই দেশে থাকবে সব দায়িত্ব নিতে হবে আমাদের নিতে হবে। এটা আমরা পারব নিতে, যদি আমাদের অ্যাম্বেসি আমাদের সহায়তা করে, আমাদের মন্ত্রণালয় আমাদের সহায়তা করে, আমাদের বিএমইটি সহায়তা করে। আমরা তাদের সঠিক তথ্যটা জানাব। কেউ ভালো থাকলে জানাব, খারাপ থাকলে জানাব। সরকারের তরফ থেকে ব্যবস্থা নেবে। এখন যদি সব দায়িত্ব আমাদের দেয় তাহলে এটা শুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া কিছু নয়।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...