গণপূর্তের ‘গলার কাঁটা’ ১৬ মেগা প্রকল্প

মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:০৫

সরকারি ভবন নির্মাণ ও সংস্কারের দায়িত্বে থাকা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদফতর প্রায় দেড় ডজন মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে বিপাকে পড়েছে। পুলিশ হেফাজতে থাকা টেন্ডার মাফিয়া হিসেবে পরিচিত যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির তৎকালীন সমবায়বিষয়ক সম্পাদক জিকে শামীমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেড বাস্তবায়নাধীন প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার কাজ বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। মূলত শামীম গ্রেফতার হওয়ার পর তার এবং ব্যাবসায়িক শরিকদের ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দেয়ায় কাজ চলমান রাখার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

এতে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন সেটির সংকুলান না হওয়া এবং যে পরিমাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে তার বিলও দিতে পারছে না গণপূর্ত অধিদফতর। এ কারণে যথাসময় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী আগের ঠিকাদারের সাথে করা চুক্তি বাতিল করে নতুন করে টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশনা দিয়েছেন। এরই মধ্যে গণপূর্ত অধিদফতর সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নের পথে এগুচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন হলে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রকল্পগুলো চালু করা সম্ভব হবে। যথাসময় কাজ সম্পন্ন করাটা সম্ভবপর হয়ে উঠবে না বলেই মনে করছেন তারা।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবন, পঙ্গু হাসপাতাল, নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল, এনজিও ভবন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ভবন, বিজ্ঞান জাদুঘর, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, রাজধানীর আশকোনায় র‌্যাবের সদর দফতর, গাজীপুরের পোড়াবাড়িতে র‌্যাব ট্রেনিং সেন্টার, ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়, সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন ভবন, ক্যাবিনেট ভবন, বাসাবো বৌদ্ধমন্দির, পার্বত্য ভবন, মিরপুর-৬ নম্বরের স্টাফ কোয়ার্টার, সেবা মহাবিদ্যালয় এবং মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ জিকে শামীমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেড করছে। এর মধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪০০ কোটি টাকার কাজ, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) ৪০০ কোটি টাকার কাজ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডাইজেস্টিভ, রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটালে (মহাখালী ডাইজেস্টিভ) ২০০ কোটি টাকার কাজ, অ্যাজমা সেন্টারে ২০-২৫ কোটি টাকার কাজ। এ ছাড়া জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ২০-২৫ কোটি টাকার কাজ, বাংলাদেশ সেবা মহাবিদ্যালয়ে ২০-২৫ কোটি টাকার কাজ, গাজীপুর র‌্যাব ট্রেনিং স্কুলের ৫৫০ কোটি টাকার কাজ, বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্সের ৩০০ কোটি টাকার নির্মাণ কাজ, সচিবালয়ের ক্যাবিনেট ভবন নির্মাণে ১৫০ কোটি টাকার কাজ, এনবিআরের ৪০০ কোটি টাকার কাজ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সের ১০০ কোটি টাকার কাজ, পিএসসিতে ১২ কোটি টাকার কাজ ও এনজিও ফাউন্ডেশনে ৬৫ কোটি টাকার কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

সরকারি এসব কাজে সাধারণত ইজিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হলেও তাতে শামীমের কোনো সমস্যা ছিল না। বরং সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে ইজিপিতেও প্রভাব খাটিয়ে কাজগুলো ভাগিয়ে নেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক পদে থাকায় শামীমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেড ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ নেয়। গণপূর্তে একক আধিপত্য বিস্তার করেন জিকে শামীম। অধিকাংশ কাজ নিজ প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেয়ার পাশাপাশি অন্য ঠিকাদাররা যে কাজ পেতেন সেখান থেকেও মোটা অঙ্কের কমিশন নিতেন তিনি। এসব কিছুই করতেন যুবলীগের পরিচয় ব্যবহার করে।

গত সেপ্টেম্বরে শামীম গ্রেফতার হওয়ার পর হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় কাজগুলো। এতে একদিকে যেমন সথাসময় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের শঙ্কা সৃষ্টি হয় অন্যদিকে প্রকল্পগুলোতে সরকারের বেশি অর্থব্যয়ের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। যে কারণে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে গণপূর্ত অধিদফতর।

গণপূর্ত কর্মকর্তারা জানান, নিয়ামানুযায়ী প্রকল্পগুলো চুক্তি বাতিল করতে গেলে কমপক্ষে তিনমাস সময় লেগে যায়। আবার নতুন টেন্ডার আহ্বান করে নতুন ঠিকাদারের সাথে চুক্তি সম্পন্ন করতেও আরো তিনমাস সময় লাগে। এটি করতে গেলেও স্বাভাবিকভাবেই প্রকল্পগুলোর কাজ ছয় থেকে সাত মাস পিছিয়ে যাবে। এ ছাড়া আগের ঠিকাদারের সাথে অর্থনৈতিক লেনদেনও রয়েছে। তিনি জেলে থাকায় সেই হিসাবটিও সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। যে কারণে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না পূর্ত কর্তৃপক্ষ।

এই অবস্থায় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একনেক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিকে শামীমের যত টেন্ডার আছে সব টেন্ডার বাতিল করার নির্দেশনা দেন বলে জানা গেছে। এ সময় তিনি যত অসাধু ঠিকাদারি কোম্পানি সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ করছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া ঘোষণা দেন। একনেক সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী জিকে শামীমের সব টেন্ডার বাতিল করতে বলেছেন। এ নিয়ে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দেন। টেন্ডার করতে গিয়ে যেন কাজের কোনো ব্যাঘাত না ঘটে সেদিকেও খেয়াল রাখতে বলেন। একই সঙ্গে যারা বিতর্কিত ঠিকাদার রয়েছে, যারা সরকারি বিভিন্ন কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

পরিকল্পনা কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যে কোনো ঠিকাদারি কোম্পানি বা ব্যক্তি হোক না কেন একটি বা দুটির বেশি সরকারি কোনো কাজ দেয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রী শামীমের কথা উল্লেখ করে জানতে চান, কিভাবে একটি কোম্পানি এত কাজ পায়। এ সময় তিনি নির্দেশনা দিয়ে বলেন, অভিজ্ঞতার কথা বলে একই কোম্পানিকে বারবার কাজ দেয়া যাবে না। নতুন নতুন কোম্পানিকে কাজ না দিলে তারা কোথা থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। এজন্য নতুন কোম্পানিকে কাজ করার সুযোগ করে দেয়ারও নির্দেশ দেন তিনি।

গত ২০ সেপ্টেম্বর নিকেতনের ৫ নম্বর রোডের ১১৩ নম্বর রোডে শাসীমের বাসায় র‌্যাবের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে নগদ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ১৬৫ কোটি টাকার বিভিন্ন ব্যাংকের এফডিআর, ১টি রিভলভার, ৪টি বিদেশি মদের বোতল ও বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই উদ্ধার করেন। এ সময় শামীমসহ তার ৭ দেহরক্ষীকে আটক করা হয়। র‌্যাব দেহরক্ষীর অস্ত্রগুলো জব্দ করে। অভিযানে শামীমের অফিস থেকে তার একটি অত্যাধুনিক অস্ত্র ও দেহরক্ষীদের সাতটি শটগান উদ্ধার করা হয়।

মানবকণ্ঠ/আরবি




Loading...
ads





Loading...