শুরুতেই হোঁচট খেল সরকার


poisha bazar

  • আব্দুল্লাহ রায়হান
  • ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ০১:১৫,  আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৩৫

নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের শুরুতেই হোঁচট খেল সরকার। আইন নিয়ে পরিবহন মালিক শ্রমিকদের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার কথা বলেছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কিন্তু আইনের কিছু ধারা সংশোধনের দাবিতে পরিবহন কর্মীদের ডাকা লাগাতার কর্মবিরতি ও ধর্মঘটের জেরে আইন কার্যকরে সরকার আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে।

মানুষের টানা ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আইনের কার্যকারিতায় শৈথিল্য আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন বিধিমালা সংশোধনের কথা বলে আইনের কঠোর ধারা সংশোধন করতে যাচ্ছে। তা ছাড়া গাড়ি সচল রাখতে সরকারের হাতে এর বিকল্প আর কোনো ব্যবস্থাও নেই।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা জানান, বিআরটিসির অপ্রতুল বাস, সীমিত ট্রেন ও লঞ্চ বাস- ট্রাকের বিকল্প হতে পারে না। বহু গাড়ির বহু মালিক প্রথা থেকে বেরিয়ে কয়েকটি কোম্পানির অধীনে বাস ও ট্রাক পরিচালনার ব্যবস্থা করার কথা ছিল কিন্তু দীর্ঘদিনেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।

আর এ কারণেই প্রতিবারই পরিবহন কর্মীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়তে হয় দেশের মানুষকে, সরকারকে। তখন কর্তৃপক্ষ অসহায়ত্বের পরিচয় দিয়ে তাদের অন্যায় দাবি মানতে বাধ্য হয়। এবারো একই পরিণতি দেখল দেশ।

সরকার এক কথায় পরাজিত হলো পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের কাছে। সড়ক মহাসড়কে দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই ঝরছে প্রাণ। এ কারণেই নিরাপদ সড়ক দিবসে ১ নভেম্বর থেকে আইন কার্যকরের ঘোষণা আসে। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারো সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ঠেলে দেয় পরিবহন কর্মীরা।

আইন প্রয়োগের সক্ষমতার অভাব, অবকাঠামোগত ত্রুটি এবং প্রায়োগিক দুর্বলতার অভাবও দেখা দিয়েছে। পরিবহন নেতারা চান অপরাধে জামিনযোগ্য ধারা।

নতুন সড়ক পরিবহন আইনে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির মতো ধারা অজামিনযোগ্য। এ ছাড়া জরিমানা কমানোরও ব্যাপারে দাবি ছিল তাদের। প্রথম দফায় সামান্য জরিমানা আরোপের মাধ্যমে আইনটি কার্যকরের দিকে যাচ্ছিল বিআরটিএ। ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো মামলা করা শুরুই হয়নি। তার আগেই সারাদেশে যাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়ি বন্ধ রেখে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সূত্র বলছে, সরকারের এই অবস্থানের ফলে নতুন সড়ক আইনের কঠোর শাস্তির বেশিরভাগ ধারাই আর এখন প্রয়োগ হবে না। বিশেষ করে বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানসহ বাণিজ্যিক যানবাহনের মালিক- শ্রমিকরা নতুন আইনের খুব একটা আঁচ পাবেন না।

নতুন সড়ক আইনের যেসব কঠোর ধারা সংশোধনের দাবি ছিল মালিক-শ্রমিকদের, সেগুলো বিবেচনায় নিয়েছে সরকার। যেসব ধারার কারণে মালিক-শ্রমিকরা বড় ধরনের আর্থিক জরিমানায় পড়তে পারেন, সেগুলোর প্রয়োগ আগামী বছরের জুন পর্যন্ত পিছিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন করার সময় কয়েকটি যৌক্তিক জটিলতা দেখা যায়। চালকদের লাইসেন্স-সংক্রান্ত ও যানবাহনের আকৃতি পরিবর্তন-সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি জুন পর্যন্ত নতুন আইনে হবে না। আমরা প্রস্তাব আকারে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ৯দফা দাবি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। সড়ক ও সেতুমন্ত্রী এ বিষয়ে যৌক্তিক ব্যবস্থা নেবেন।

তিনি বলেন, আইনটি বাস্তবায়নের মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি। প্রধানমন্ত্রী কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন, সে অনুযায়ী আমরা আইনটি পরিবর্তন করব।

প্রস্তুতি ছাড়া আইন কার্যকর করতে গিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে পরিবহন কর্মীরা জানান, বর্তমানে গাড়ির তুলনায় চালক কম। এর মধ্যে বড় সমস্যা চালকের লাইসেন্সের ধরন নিয়ে। হালকা, মাঝারি ও ভারি এই তিন শ্রেণির মধ্যে হালকা লাইসেন্স বেশি। লাইসেন্সপ্রাপ্তির প্রথম ধাপ হালকা লাইসেন্স দিয়েই এখন চলছে বেশিরভাগ বাস-ট্রাক। এ অবস্থায় আইন কার্যকর করলে সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা ও ৬ মাসের জেল।

বিআরটিএর নথিতে দেখা গেছে, ২ লাখ ৬১ ৮২১ ভারি গাড়ির জন্য লাইসেন্স রয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭২০টি। ৭ লাখ ২৬ হাজার ৪৮টি গাড়ির জন্য লাইসেন্স রয়েছে ১৯ লাখ ২১ হাজার ৯২৮টি। মাঝারি আকারের ৫৯ হাজার ৫৫৪ গাড়ির বিপরীতে লাইসেন্স রয়েছে ৯৫ হাজার ৫০৩টি। এর বাইরে থ্রি হুইলার, টু হুইলার ও অন্যান্য ক্যাটাগরির গাড়ি ও লাইসেন্স রয়েছে।

বর্তমানে ৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪টি গাড়ি ফিটনেসবিহীন রয়েছে। এখন সমস্যা হচ্ছে, গণপরিবহনে চাহিদা অনুযায়ী লাইসেন্স নেই। বিআরটিএর অদক্ষতার কারণে বছর ঘুরেও লাইসেন্স পান না চালকরা। তাছাড়া বিআরটিএর দুর্নীতি তো সবার মুখে মুখেই।

পরিবহন নেতারা বলছেন, জরিমানা মওকুফ করতে। তাই আগামী বছরের জুন পর্যন্ত যে কোনো শ্রেণির লাইসেন্স দিয়ে যে কোনো গাড়ি চালানোর ব্যাপারে নমনীয় হয়েছে সরকার। এ সময়ের মধ্যে পরিবহন শ্রমিকদের বিআরটিএর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত লাইসেন্স হালনাগাদ করে রাখতে হবে।

ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ নতুন সড়ক আইনের ৯টি ধারা পরিবর্তন চেয়েছে। এগুলো হচ্ছে: ৭৪, ৭৫, ৭৬, ৭৭, ৮৪, ৮৬, ৯০, ৯৮ ও ১০৫। এর মধ্যে ৮৪, ৯৮ ও ১০৫ ধারা সবচেয়ে কঠোর এবং এর অপরাধে মামলা অজামিনযোগ্য। এর বাইরে চালকের লাইসেন্সসংক্রান্ত ৬৬ ধারা এখনই প্রয়োগ না করার দাবি করেছে।


সড়ক পরিবহন আইন অনুসারে, ৮৪ ধারায় মোটরযানের কারিগরি পরিবর্তনের বিষয়টি রয়েছে। ৯৮ ও ১০৫ ধারায় সড়ক দুর্ঘটনার শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এই তিনটি ধারা সংশোধন করে অপরাধ জামিনযোগ্য করার দাবি জানিয়েছেন মালিক-শ্রমিকরা।

এ ছাড়া এসব ধারায় থাকা তিন লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানাও কমানোর দাবি করেছেন। বাকি ছয়টি ধারায় জরিমানার পরিমাণ কমানোর দাবি করেছে মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো।

আইন অনুসারে, ৭৪ ধারায় মোটরযানের ফিটনেস সনদ থাকার বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে। এই ধারা অমান্যের দায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। ৭৬ ধারায় ট্যাক্স-টোকেন হালনাগাদ না থাকলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে। ৭৭ ধারায়, রুট পারমিট ছাড়া যানবাহন চালালে সর্বোচ্চ শাস্তি তিন মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানা। ৮৬ ধারায় অতিরিক্ত মাল বহনের নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে। এই অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছরের কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকার জরিমানা। ৯০ ধারা অনুসারে, নির্ধারিত স্থানের বাইরে যানবাহন পার্ক করা যাবে না। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা।


পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, আইনের প্রয়োগ করতে যাওয়া, এরপর মালিক- শ্রমিকদের আন্দোলন, সরকারের সঙ্গে বৈঠক, আইন প্রয়োগে শিথিলতা এসব বিষয় পরিবহন খাতে নতুন নয়। এবার আরেকবার তার পুনরাবৃত্তি হলো। আসলে পরিবহন খাত বিশৃঙ্খলায় ভরা, অনেক কিছুই আছে, যা পুরোপুরি অবৈধ।

কিন্তু অর্থনীতিতে এমনভাবে মিশে গেছে যে, তা বাদ দেয়া যাচ্ছে না। এখন পুরো পরিবহন ব্যবস্থায় একটা বড় অস্ত্রোপচার দরকার। অন্যথায় আইন ভোঁতা বা ধারালো, পরিপক্ব বা অপরিপক্ব কোনোটাই প্রয়োগ করা যাবে না।

বিআরটিএ চেয়ারম্যান ড. কামরুল আহসান বলেন, আইন সংশোধন কঠিন কাজ। সঙ্গত কারণ থাকলে কিছু জায়গায় শাস্তির ব্যাপারে শৈথিল্য দেখানো হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, ১২৬টি ধারার মধ্যে ৯টি ধারা সংশোধনের দাবি করেছেন পণ্যবাহী পরিবহন নেতারা। এ জন্য আইন স্থগিত করতে হবে। আমরা বলেছি, স্থগিত নয় আইন কার্যকর থাকবে। কিছু জায়গায় হয়তো প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচনা করবে।

সাম্প্রতিক পরিবহন খাতের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জেরে দাবি মানার আশ্বাস নিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইনের বিধিমালা হয়ে গেলেই আর কোনো সমস্যা থাকবে না। তা ছাড়া আইনটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি হবে না বলেও আশ্বস্ত করেছেন তিনি।

সেতুমন্ত্রী আরো বলেন, সড়ক পরিবহন নিয়ে যে সমস্যা ছিল আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান হয়েছে।

সারা দেশের শ্রমিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের দুই দিনব্যাপী বর্ধিত সভা শেষে ফেডারেশনের সভাপতি সাবেক নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, জোর করে শ্রমিকের ওপর কোনো আইন চাপিয়ে দেয়া যাবে না। নতুন আইন নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেভাবে প্রচারণা করা হয়েছে তাতে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

একে কাজে লাগিয়েই একটি গ্রুপ কর্মবিরতির নামে ধর্মঘট আহ্বান করার সুযোগ পেয়েছে। নতুন আইনের সংশোধনী চেয়ে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেয়া হবে। এর প্রতি আস্থা রেখে যানবাহন চলাচল সচল রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

 

মানবকণ্ঠ/এসআর




Loading...
ads





Loading...