দুদক দিবসে অভিযোগের হিড়িক

মানবকণ্ঠ
দুদক - লোগো

poisha bazar

  • ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ২২ নভেম্বর ২০১৯, ১২:৪৫,  আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০১৯, ১২:৫২

যুবলীগের শফিকের বিরুদ্ধে মামলা
মুন্সীগঞ্জ আ.লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
চার বছরে শত কোটি টাকার মালিক সম্রাটের সহযোগী খুরশিদ

দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)-এর ১৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিবসেও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযোগের হিড়িক পড়েছে। আবার দিবস ছাড়াও বেশ কয়েকদিন আগ থেকে নানা পেশাজীবীর লোকদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ এসেছে দুদকের কার্যালয়ে। নামে বেনামে এসব অভিযোগ করা হচ্ছে প্রতিদিন। বেশির ভাগ অভিযোগই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে। এদিকে দুদক দিবসে সংস্থার মুখপাত্র প্রণব কুমার ভট্টাচার্যকে অভিযোগের সংখ্যা কত জানতে চাওয়া হলে তিনি গতকাল রাতে মানবকণ্ঠকে বলেন, এ ব্যাপারে বলতে পারব না। তবে তিনি বলেন, শিক্ষা ভবনের টেন্ডারবাজির প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত যুবলীগের নেতা মো. শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এখন পর্যন্ত তার প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য প্রমাণ পেয়েছে সংস্থাটি। গতকাল দুদকের ঢাকা-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে শফিকুলের বিরুদ্ধে মামলা করেন সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নেয়ামুল আহসান গাজী। সংস্থার মুখপাত্র প্রণব কুমার ভট্টাচার্য মামলার বিষয়ে মানবকণ্ঠকে বলেন, চলমান শুদ্ধি অভিযানের শুরু থেকে এ পর্যন্ত অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ১৬টি মামলা করেছে দুদক। শফিকুল ইসলাম কেন্দ্রীয় যুবলীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক। এদিকে দুদকে একাধিক ব্যক্তির আবেদনে করা অভিযোগ থেকে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত খুরশিদ ফেনীর পরশুরামে ট্রাক্টর ড্রাইভার।

২০১০ সালের দিকে ভাগ্য পরিবর্তনে আসে রাজধানী ঢাকায়। একই এলাকায় বাড়ি হওয়ায়, যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা সম্রাট ও আরমানের ঘনিষ্ঠতায় ক্যাসিনোর বদৌলতে ৪ বছরে হয়েছেন শত কোটি টাকার মালিক। এখন কি নেই তার, এলাকায় প্রায় ৫ হাজার শতক জমি, বিশাল নির্মাণাধীন বাংলো, বিশাল মার্কেট, ফেনী ও ঢাকাতে অসংখ্য জমি ও ফ্ল্যাট। চলেন পাজারো জিপে। পরিবারের জন্য রয়েছে আলাদা দামি গাড়ি। নিজ এলাকায় চলেন হোন্ডার বহর নিয়ে। এলাকায় ক্ষমতাসীন দল চলে তার ইশারায়। এলকায় নাম ছিল খুইশ্যা, এখন নাম পাল্টে হয়েছে খুরশিদ আলম খোরশেদ। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সদস্য। সামান্য সদস্য হলেও দাপট কিন্তু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের থেকে কোনো অংশে কম নয়। কারণ তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাঈল চৌধুরী সম্রাট, সহসভাপতি আরমানুল হক আরমান ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভ‚ঁইয়ার একান্ত সহচর। অবশ্য এরা গ্রেফতারের পর তিনি গা-ঢাকা দিয়েছে।

ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের কহুয়া গ্রামে তার বাড়ি। সম্পদ ও চলাফেরা এলাকার লোকের মুখে মুখে, তবে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চায় না কেউ। দুদক চেয়ারম্যান বরাবরে দেয়া অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, খোরশেদ ২০১০ সালের আগেও নিজ এলাকায় কৃষিকাজের ব্যবহƒত কলের লাঙ্গল ট্রাক্টর চালাতো। বছরে ২/৩ মাসের বেশি কাজ না থাকায় এরই মধ্যে জড়িয়ে পড়ে গাঁজা বিক্রিতে। স্থানীয়ভাবে এর নাম পুরিয়া। এ ব্যবসা ভালোই চলছিল, কিন্তু বাধ সাধে পুলিশ। এ সময় পুলিশের বাধায় গাঁজা ব্যবসা ছেড়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির এক বড় ভাইয়ের হাত ধরে চলে যায় রাজধানী ঢাকায়। ঢাকায় ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরামের মালিকানাধীন জননী ট্রাভেলসের পিয়নের চাকরি নেয়। জননী ট্রাভেলস থেকে মূলত দক্ষিণ আফ্রিকায় লোক পাঠানো হতো। কয়েক বছরের মধ্যে খোরশেদ বিশ্বস্ততা অর্জন করে একরাম চেয়ারম্যানের।

একরাম এ ব্যবসার পুরো টাকাই খোরশেদের নামে ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে লেনদেন করতে থাকে। ২০১৪ সালের ২০মে ফেনীতে সন্ত্রাসী হামলায় একরাম মারা যায়। একরামের মৃত্যুর পর তার পরিবার বহু দেনদরবার করেও খোরশেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের টাকা উদ্ধার করতে পারেননি। ওই সময়ের একরাম চেয়ারম্যানের পরিবারকে চাপে রাখতে খুনিদের হাত মেলানোর অভিযোগ রয়েছে খোরশেদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ সূত্র জানা গেছে, একরামের মৃত্যুর পর শুরু করে রোহিঙ্গাদের বিদেশ পাঠানোর ব্যবসা। এ সময় বেশ কিছু রোহিঙ্গা আটক হয়। আটককৃতদের জবানবন্দিতে উঠে আসে খোরশেদের নাম। একই এলাকার হওয়ায় সম্রাট ও আরমানের সাথে ক্যাসিনো ব্যবসায়ে যুক্ত হয়ে বর্তমানে প্রায় শত কোটি টাকার মালিক খোরশেদ। এক সময়ের ভ‚মিহীন এখন ১২০ শতকের নির্মাণাধীন ডুপ্লেক্স বাড়ি। বাবা হুদা মিয়া অন্যের জমি বর্গাচাষ করলেও এখন নামে বেনামে রয়েছে ৫০০০ হাজার শতকেরও বেশি কৃষি জমি। স্থানীয় বক্সমাহমুদ বাজারে রয়েছে মার্কেট। এক সময় রিকশায় চড়ার পয়সা না থাকলেও এখন চড়েন পাজেরোতে। পরিবারের জন্য রয়েছে আলাদা দামি গাড়ি। ফেনীর পুরনো বিমানবন্দর এলাকায়, ঢাকার মুগদা, উত্তরা ও বসিলা এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। গত ৪ বছরে অন্তত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। নিজে স্কুলের গণ্ডি পেরুতে না পারলেও এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুদান দিয়ে শিক্ষানুরাগী হওয়ার চেষ্টা করেন।

অপরদিকে গত ১০ বছর মুন্সীগঞ্জে দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে চাঁদাবাজি, জমি দখল, টেন্ডারবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা করে বিপুল অর্থ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলায় মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী সোহানা তাহমিনা, মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ লুৎফর রহমান, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনিস উজ্জামান আনিস, মিরকাদিম পৌরসভার মেয়র শহিদুল ইসলাম শাহিন, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আফসার উদ্দিন ভ‚ঁইয়া আফসু, মুন্সীগঞ্জের পঞ্চসার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা ও মুন্সীগঞ্জের রামপাল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাচ্চু শেখ এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকে অভিযোগ করেছে মুন্সীগঞ্জ এলাকাবাসীর পক্ষে জয়নাল আবেদীন। গতকাল দুদকে এ অভিযোগ করেন তিনি। তথ্য যাচাই-বাছাই পূর্বক যেন তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অভিযোগপত্রে জয়নাল আবেদীন জানান, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনিস উজ্জামান আনিস বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও নগদ টাকার মালিক। যার সবই অবৈধ। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, অবৈধভাবে ইজারা দিয়ে গত ১০ বছরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। শহরের কাচারি এলাকায় মুন্সীগঞ্জ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে সরকারি মালিকানা প্রায় ৩০ শতাংশ জমি দখল করে ৫ তলা মার্কেট ভবন নির্মাণ করেছেন। সেখান থেকেও তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৪০ কোটি টাকা। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার বজ যোগিনী ইউনিয়নে হিন্দু পরিবারের ৭০ শতাংশ জায়গা জোর করে দখল করেছেন। মুন্সীগঞ্জের বালুমহল থেকে প্রতিমাসে চাঁদা নেন প্রায় ২ কোটি টাকা। এসব টাকা লেনদেনের জন্য বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে তার। আনিস কানাডায় করেছেন বিলাসবহুল বাড়ি। আনিসের ছোট ছেলে জালালুদ্দিন রুমি রাজন বাংলাদেশের শীর্ষ অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন। অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা করে গত ১০ বছরে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন রাজন। কক্সবাজারের ইয়াবা ব্যবসায়ীদের হাত করে মুন্সীগঞ্জে রমরমা ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। মেসার্স রাজন ট্রেডার্স নামে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান খুলে টেন্ডার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন আনিসপুত্র। আনিসের ছোট ছেলে আক্তারুজ্জামান রাজিব। জেলা যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি। মসজিদের নির্মাণ কাজে চাঁদাদাবি ও ভ‚মি দখলের অভিযোগে যুবলীগ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আক্তারুজ্জামান রাজিব গত কয়েক বছরে চাঁদাবাজি, জমি দখল, টেন্ডারবাজি, করে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। সে বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার করে দিয়েছেন। সঠিকভাবে তদন্ত হলে এসব তথ্যের সত্যতা মিলবে।

তিনি জানান, মিরকাদিম পৌরসভার মেয়র হয়ে শাহিন বিভিন্ন অপকর্ম করে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় ধানমণ্ডিতে তার আলিশান ফ্ল্যাট যার মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা, নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে করেছেন ৪টি বাড়ি। মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের টেঙ্গর এলাকায় স্ত্রীর নামে কিনছেন ৪০ শতাংশ জমি, রিকাবীবাজারে তার রয়েছে ২টি ৪ তলা বাড়ি। জমি ও বাড়ি মিলিয়ে সেখানে খরচ করেছেন প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। মিরকাদিমের গোয়ালঘুন্নী এলাকায় সরকারের খালের জমিতে ৫ম তলা বহুতল ভবন নির্মাণ করে ২০ কোটি টাকায় অন্য একজনের কাছে বিক্রি করে দেন মেয়র শহিদুল ইসলাম শাহিন। নয়নের খাল, রিকাবীবাজার খাল, ফেচন্নীর খাল ও গোপপাড়া খাল দখল করে ১৫-২০ লাখ টাকা শতাংশ করে স্থানীয়দের কাছে বিক্রি করে মেয়র শাহিন এখন কয়েকশ কোটি টাকার মালিক। এছাড়াও মেয়র শহিদুল ইসলাম শাহিন এর পালের বাড়িতে ৫০ শতাংশ, ওয়াপদায় ৩০ শতাংশ। নুরপুর কালিন্ধিবাড়ি মৃধাবাড়ি এলাকায় ২০ শতকের ওপর ৪ তলা বাড়ি। রিকাবীবাজার এলাকায় ৬ শতাংশ জায়গায় ৩ তলা বাড়ি। নুরপুর গোপপাড়ায় ২০ শতাংশের ওপর ৩ তলা বাড়ি। গোপালনগর গার্লস স্কুল এলাকার রায়বাড়িতে ৩০ শতাংশ জমি। ঢাকার পরিবাগে ফ্ল্যাট। নয়নের খাল দখল করে দোকান তুলেছেন শাহিন। সেখান থেকে প্রতি মাসে ২০ লাখ টাকা সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে উপার্জন করেন। সর্বশেষ মিরকাদিমের পূর্বপাড়া জামে মসজিদের ৩০ লাখ টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে এনে আত্মসাৎ করে শহিদুল ইসলাম শাহিন।

অভিযোগপত্রে তিনি জানান, মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী সোহানা তাহমিনা অবৈধ ক্ষমতার জোরে মুন্সীগঞ্জ শহরের হাটল²ীগঞ্জ এলাকায় জেলা পরিষদের ১০০ শতাংশ জমি দখল করে দোকান ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। মুন্সীগঞ্জ শহরের পুলিশ লাইন্স এলাকায় সরকারি জমিতে ২০টি দোকান বসিয়েছেন। সেখান থেকে প্রতিমাসে আয় করছেন কয়েক লাখ টাকা। উত্তর কোটগাঁওতে রয়েছে ১৫০ শতক জমি, ঢাকায় রয়েছে ৩টি ভবন। সদর উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের কাবিয়ারচরে রয়েছে সাড়ে ৯ বিঘা জমি। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় তার দুটি বাড়ি রয়েছে। গত কয়েক বছরে তার স্বামীর অবৈধ উপার্জনের সব টাকা তিনি তার পুত্রদ্বয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads






Loading...