ওদের কলঙ্ক মুছবে কী দিয়ে?

মানবকণ্ঠ
ছবি - প্রতিবেদক।

poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ২১ নভেম্বর ২০১৯, ১০:৪৫

ওদের কেউ স্বামী পরিত্যক্তা, কেউ স্বামীর কাছে নির্যাতিত, কারো এখনো বিয়ের পীড়িতে বসা হয়নি, আবার কারো অভাবের সংসার। নানা প্রতিক‚ল পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকাটাই ছিল কষ্টের। তাই তো সুখের আশায় মা-বাবা, সন্তান আর স্বজনদের ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিলেন দূর প্রবাসে। স্বপ্ন দেখেছিলেন মরুর দেশ সৌদি আরবে গিয়ে রোজগার করে আলো ফেরাবেন নিজের সংসারের। কিন্তু তা আর হলো না। সেখানে মুখোমুখি হন আরেক ভয়ঙ্কর জীবনের। শিকার হন অকারণে নির্যাতনের। বাসার প্রত্যেক লোকের কাছে নির্যাতিত ছিলেন তারা। মালিকের স্ত্রী, ছেলে, মালিক কেউই বাদ যেত না। অবশেষে অসহ্য আর দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে দেশে ফিরেছেন তারা। নির্যাতিতদের স্বজনরা দুঃখ করে বলেন, একটু সুখের আশায় বিদেশ গিয়ে উল্টো তারা গায়ে লাগিয়েছেন কলঙ্কের দাগ। তারা পাড়া-প্রতিবেশীদের সামনে মুখ দেখাতে পারছেন না। বাড়ি থেকেও লোকলজ্জায় বের হতে পারেন না। কেউ কেউ হারিয়েছেন মানসিক ভারসাম্য। এখন না পারছেন আত্মহত্যা করতে আর না পারছেন বেঁচে থাকতে। একটাই পথ খুঁজছেন তারা, সেটা হলো কলঙ্ক মোচনের পথ। কিন্তু তাদেরই প্রশ্ন সেই কলঙ্ক ওরা মুছবে কি দিয়ে?

সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে কাজ করতে গেছেন ৪ লাখ ৭০ হাজার ২৬৫ জন নারী শ্রমিক। এর মধ্যে চলতি বছরের ১০ মাসে নানা রকম নির্যাতনের শিকার হয়ে ৯৫০ জন নারী শ্রমিক সৌদি আরব থেকে ফিরে এসেছেন। আবার এই বছরেরই প্রথম ১০ মাসে দেশে ফিরেছে ১১৯ জন নারী শ্রমিকের লাশ। গত কয়েক বছর সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের বেশ কয়েকটি ভিড়িও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে। যা দাগ কেটেছে প্রতিটি মানুষের হƒদয়ে।

তাদের একজন সুমি আক্তার। গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নের বৈরাতি সেনপাড়া গ্রামে। গ্রামের স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণি পাস করেন। বাবা রফিকুল ইসলাম একজন দিনমজুর। চার ভাই বোনের মধ্যে বড় সুমি। বাবার অভাবের সংসারের নুন আন্তে পান্থা ফুরায়। তাই বাধ্য হয়ে অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ঢাকায় আসেন সুমি। চাকরি নেন একটি গার্মেন্টসে। সেখানেই পরিচয় হয় আশুলিয়ার চারাবাগ এলাকার নুরুল ইসলামের সঙ্গে। ৬ মাস পর বিয়ে করেন তাকেই। বিয়ের পর জানতে পারেন, আগেও একটি বিয়ে করেছেন তার স্বামী। বাধ্য হয়ে সতীনের সঙ্গে সংসার শুরু করেন। বিয়ের দেড় বছর পর তার একটি সন্তান হয়। গত ৩০ মে স্বামী নুরুল ইসলামের পরামর্শে ‘রূপসী বাংলা ওভারসিজে’র মাধ্যমে গৃহকর্মীর ভিসায় সৌদি আরবের রিয়াদে যান। সেখানে গিয়ে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন সুমি। সৌদিতে থাকা প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসে তার ওপর চলে নির্যাতনের স্টিম রোলার। বন্দিশালা থেকে দেশে ফেরতে নানা কাটখড় পোড়াতে হয়েছে তাকে। দেশে ফেরার পর সুমি নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা করেন সাংবাদিকদের কাছে। সুমি জানান, তিনি অষ্টম শ্রেণি পাস করেন। দুই বছর আগে ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টসে চাকরি নেয়ার পর আশুলিয়ার চারাবাগ এলাকার নুরুল ইসলামের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরবর্তীতে তাদের বিয়ে হয়। সুমি আরো জানান, এরপর সৌদি আরব যাই। সেখানে সপ্তাহখানেক পর থেকেই প্রথম কর্মস্থলে মালিক তাকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও মারধর করেছে। হাতের তালুতে গরম তেল ঢেলে দিত ও রুমে আটকে রাখত। এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে ওই মালিক তাকে না জানিয়ে সৌদি আরবের ইয়ামেন সীমান্ত এলাকা নাজরানের এক ব্যক্তির কাছে প্রায় ২২ হাজার রিয়ালে বিক্রি করে দেন। ওই মালিকও তাকে নির্যাতন করত। উদ্ধার হওয়ার আগে ১৫ দিন তাকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হয়েছিল। ঠিকমতো খাবার দেয়া হয়নি। তার মোবাইলফোনটিও কেড়ে নিয়েছিল। এক সময় খুব কান্নাকাটি করে স্বামীর সঙ্গে একটু কথা বলার জন্য মোবাইলফোনটি চেয়ে নেন। বাথরুমে গিয়ে একটি ভিডিও ধারণ করেন। সেই ভিডিওতে নির্যাতনের কথা জানান এবং স্বামীর কাছে পাঠিয়ে দেন। ওই ভিডিও তার স্বামী ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন ও গণমাধ্যমকর্মীদের অবহিত করেন।

গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সুমিকে উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়। তাদের আরেকজন মুন্সীগঞ্জের ডালিয়া বেগম। তিনি বলেন, ১৪ মাসের প্রবাসজীবনে শারীরিক-মানসিকসহ নানা নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে তাকে। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একদিন বাড়ির দ্বিতীয়তলা থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হাত-পা ভেঙে দুই মাস চিকিৎসা নেন রিয়াদের একটি হাসপাতালে। এরপর বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে চার মাস সেফ হোমে (নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র) কাটিয়ে পঙ্গু হয়ে দেশে ফেরেন। ভুক্তভোগী প্রবাস ফেরত নারীদের অভিযোগ, বিদেশে যাওয়ার পর তাদের খোঁজ নেয় না আর কেউ। নির্যাতনের শিকার হয়ে কেউ দূতাবাসের কাছে এলে অথবা ভুক্তভোগী নারীদের স্বজনরা কোনো অভিযোগ করলেই শুধু সরকার এ-সংক্রান্ত তথ্য জানতে পারে। তবে সৌদি আরবে নারী কর্মীদের সমস্যা নিয়ে ২০১৬ সালের মার্চেও রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং ঢাকায় প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছিল। এতে বলা হয়, বিদ্যমান ব্যবস্থায় সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব রয়েছে। দূতাবাস এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বা মন্ত্রণালয়ের ভ‚মিকা অনেকটাই গৌণ। পুরোটাই একপেশে এবং সৌদি আরব আরোপিত।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন বা অন্যান্য দেশের চুক্তির মতো বাংলাদেশের সঙ্গে করা চুক্তিতে গৃহকর্ম বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। ফলে গৃহকর্মী ও গৃহকর্তা (সৌদি আরবের) উভয়ের কাজ নিয়ে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির গরমিল হচ্ছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত ভাষাজ্ঞান না থাকায় গৃহকর্মীরা গৃহকর্তার চড়া মেজাজ ও শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হন। প্রতিবেদনে নির্যাতনের শিকার হওয়া ৪২ জন নারীর কথাও উল্লেখ ছিল, যাদের একজন গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। অন্যদিকে নারী কর্মীদের সমস্যা নিয়ে ২৬ ও ২৭ নভেম্বর সৌদি আরব ও বাংলাদেশের যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠক হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। এদিকে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। খোদ জাতীয় সংসদে ১২ নভেম্বর প্রশ্নোত্তরপর্বে সম্পূরক প্রশ্ন করতে গিয়ে তিনজন সাংসদ এই দাবি জানান। সেদিন সংসদে জাতীয় পার্টির সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘মা-বোনদের আমরা পাঠিয়ে দিচ্ছি। তারা ওইখান থেকে যৌন নির্যাতনসহ নানা রকম অন্যায়-অত্যাচারের শিকার হয়ে অবশেষে লাশ হয়ে ফিরে আসেন। মন্ত্রণালয় কোনো পদক্ষেপ নেয় না।’ এ ছাড়া বিভিন্ন মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠনও প্রবাসে নারী শ্রমিক পাঠানোর ব্যাপারে আপত্তি তুলছে।

আইনি সুরক্ষার বিষয় নিশ্চিত না করে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচ দেশে নারীকর্মী পাঠানো বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। কক্সবাজারের বাসিন্দা রাজিয়া খাতুন হাইকোর্টে এ রিট দায়ের করেছেন। গত সোমবার রিটের বিষয়টি জানিয়েছেন রিটকারীর আইনজীবী জামান আক্তার বুলবুল। সৌদি আরব ছাড়াও অন্য যে চারটি দেশে নারী পাঠানো বন্ধে রিট করা হয়েছে সেই দেশগুলো হলো জর্ডান, লেবানন, ইরাক ও সিরিয়া। এদিকে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠাতে ২০১৫ সালের ফেব্রæয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি সই হয়। এরপর থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ লাখ ৯৩ হাজার ৫৮৮ নারী সৌদি আরবে গেছেন। এই তথ্য সরকারের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর। সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য বলছে, এ বছরের প্রথম মাসে দেশটি থেকে সরকারের মধ্যস্থতায় ফেরত এসেছেন ৮ হাজার ৬৩৭ জন। দূতাবাসের কর্মকর্তারা বলছেন, এর বাইরে আরো প্রায় দেড় হাজার নারী গৃহকর্মী ১০ মাসে নানাভাবে দেশে ফিরেছেন। সরকারের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে কাজ করতে গেছেন ৪ লাখ ৭০ হাজার ২৬৫ জন নারী শ্রমিক। যা ১৯৯১ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত পরিসংখ্যান হিসেবে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরব, ওমান ও কাতার এই তিনটি দেশে যথাক্রমে ২ লাখ ৬৮ হাজার ১১২ জন, ৫৩ হাজার ৯৮১ এবং ৪৪ হাজার ৬৮৪ জন নারী কর্মী গেছেন। আবার চলতি বছরের মে মাসে সৌদিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নারী শ্রমিক যান কিন্তু নির্যাতনের কারণে সেপ্টেম্বরে আবার নারী শ্রমিক গমনের হার কমে আসে। ২০১৮ সালে অনলাইনে শ্রমিকরা যেসব অভিযোগ করেন তার মধ্যে শুধু সৌদি আরব থেকেই শ্রমিকদের ১৭৮টি অভিযোগ রয়েছে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশনের তথ্যেমতে, চলতি বছরের ১০ মাসে ৯৫০ জন নারী শ্রমিক সৌদি আরব থেকে ফিরে এসেছেন। বিদেশে কাজ করতে যাওয়া ৪৮ নারীর মৃতদেহ দেশে এসেছে সৌদি আরব থেকে। তবে প্রবাসী কল্যাণ ডেক্সের তথ্যে, বিগত কয়েক মাসে দেশে ফিরেছেন ১ হাজার ২৫০ জন কর্মী। ২০১৬ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশ থেকে লাশ হয়ে দেশে ফিরেছে ৩৯০ জন নারী শ্রমিক। চলতি বছর প্রথম ১০ মাসেই দেশে এসেছে ১১৯ নারী শ্রমিকের লাশ। নারী কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সৌদি আরব, জর্ডান, লেবানন ওমান ও আরব-আমিরাতে মৃত্যু ঘটছে। নিয়োগ কর্তার মাধ্যমে যৌন নির্যাতন, অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণের জন্য আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত কাজের চাপ ও মানসিক যন্ত্রণার ফলে স্ট্রোকজনিত কারণেও তাদের মৃত্যু হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল ইসলাম জানান, বিদেশ থেকে কোনো নারী যখন নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসেন, তখন সে সমাজের চোখে অপরাধী হয়ে যায়। প্রত্যেকেই এমনভাবে দৃষ্টিভঙ্গি দেখায় যেন সে ভীষণ অপরাধ করে ফেলেছে।

অথচ এ অবস্থার জন্য তার কোনো ভ‚মিকা নেই। সমাজের উচিত বিদেশ ফেরত নারী শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানো। বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী দিলরুবা সরমিন মানবকণ্ঠকে বলেন, প্রথমেই সরকারকে দায়িত্বশীল ও আন্তরিক হতে হবে। বাংলাদেশ থেকে নারী বা পুরুষ যে শ্রমিকই বিদেশে যাক না কেন বিদেশ যাওয়ার পর তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। শ্রমিকদের নির্যাতন ও হয়রানি এড়াতে হলে সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে যেসব শ্রমিক বিদেশে যাচ্ছে সেসব এজেন্সিকে মনিটরিংয়ের মধ্যে আনতে হবে। তাদের কাছ থেকে ত্রৈমাসিক, ষাš§াসিক অথবা বার্ষিক একটি রিপোর্ট নিতে হবে। সে রিপোর্টে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকতে হবে প্রবাসে কতজন শ্রমিক গেছেন, কতজন ফেরত এসেছেন, কে কোথায় আছেন বা থাকছেন, কী হচ্ছে, শ্রমিকরা কোনো সমস্যায় আছে কিনা এসব বিষয়। এই মনিটরিং করার বিকল্প নেই।

আগামীকাল শেষ পর্বে পড়ুন : ভূমধ্যসাগরে ডুবছে ইউরোপযাত্রার স্বপ্ন

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...