দুই সপ্তাহেও প্রয়োগ হয়নি নতুন সড়ক পরিবহন আইন

মানবকণ্ঠ
ছবি - সংগৃহীত।

poisha bazar

  • আব্দুল্লাহ রায়হান
  • ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১০:১৭

নতুন সড়ক পরিবহন আইন চালু হওয়ার পর দুই সপ্তাহ পার হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। তারপরও আলোচিত ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ সড়কে প্রয়োগ হতে দেখা যায়নি। নতুন আইন কার্যকর হলেও এখনো সেটি প্রয়োগে সক্ষম হয়নি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভ্রাম্যমাণ আদালত। মোবাইল কোর্ট অ্যাক্ট, ২০০৯-এর তফসিলভুক্ত না হওয়ায় নতুন আইনে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। একইভাবে সফটওয়্যার হালনাগাদ না থাকায় জরিমানা আদায় করতে পারছে না ট্রাফিক পুলিশও। আর বিধি প্রণয়ন না হওয়ায় আইনটি কার্যকরের সুফল নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছিলেন, এক সপ্তাহ কোনো জরিমানা আদায় হবে না। চালক-মালিক, যাত্রী-পথচারীসহ সংশ্লিষ্টদের আইনটি নিয়ে সচেতন করা হবে। এজন্য সারাদেশে চালানো হবে প্রচারণা।

সেই হিসেবে এক সপ্তাহ আগেই নতুন সড়ক আইনে শাস্তি দেয়া শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু গত প্রায় দুই সপ্তাহে আইনটি নিয়ে প্রচারণা দেখা গেলেও এর অনুশীলন দেখা যায়নি। না ট্রাফিক পুলিশের মাঝে, না পথচারীদের। তারা যত্রতত্র ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার হচ্ছেন। অধিকাংশ চালক এখনো যত্রতত্র গাড়ি থামান। তবে মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট ছাড়া চলাচলের প্রবণতা অনেকটাই কমে এসেছে। পুরনো আইনে চালকের লাইসেন্স পাওয়ার পরীক্ষার সিলেবাস ও ফি বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল। কিন্তু নতুন আইনে এ দুটি বিষয়ের উল্লেখ নেই। তবে নতুন আইন অনুযায়ী চালকের লাইসেন্স পাওয়ার সর্বনিম্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টি বিআরটিএ কার্যকর করছে। কিন্তু চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা এখনো আগের আইন অনুযায়ী হচ্ছে বলে বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন আইন নিয়ে প্রচারণার পাশাপাশি সড়কে অনুশীলনেরও দরকার ছিল। বিশেষ করে যেসব পথচারী বেআইনিভাবে রাস্তা পার হচ্ছেন তাদের আটক করে প্রতীকী জরিমানা করা যেত। গাড়িচালকদের প্রতীকী মামলা দিয়ে অনুশীলন করা যেত নতুন আইনের। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বলছে, আইন কার্যকর করার আগে সবাইকে সে সম্পর্কে ঠিক ঠিক জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। শনিবার থেকে নতুন আইনে মামলা কার্যক্রম শুরু হতে পারে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে, সড়কে আগের মতোই বিশৃঙ্খলা। দেখা গেছে মাঝ রাস্তায় বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী তুলতে-নামাতে। চলেছে লক্কড়-ঝক্কড় বাসও। পাল্লা দিয়ে নিষিদ্ধ সড়কে চলতে দেখা গেছে রিকশাও। পথচারীরাও শামিল হয়েছে নিয়ম ভাঙার মিছিলে। ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে আয়েসি ভঙ্গিতে পার হচ্ছেন রাস্তা।

বিআরটিএ বলছে, সড়ক আইন কার্যকরে বড় ভ‚মিকা পালনের কথা পুলিশের। কিন্তু তাদের মামলা করার যন্ত্রের সফটওয়্যার হালনাগাদ করা হয়নি। এ কারণে সড়কে আইন অমান্যের জন্য তারা জরিমানা ও মামলা করতে পারছে না। তবে নতুন সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী বিভিন্ন অপরাধের সাজা উল্লেখ করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে বিলবোর্ড লাগানো হয়েছে। মাইকে প্রচারও চালানো হচ্ছে। পুলিশ সড়কে আইন অমান্য করার দায়ে মামলা ও জরিমানা করে থাকে। অন্যদিকে বিআরটিএর দায়িত্ব হচ্ছে আইন মেনে মোটরযানের নিবন্ধন, মালিকানা বদলি, ফিটনেস প্রদান করা। লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও বাতিল করাও বিআরটিএর কাজ। আইনি জটিলতার কারণে বিআরটিএ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা বন্ধ রেখেছে।

সূত্রে জানা যায়, আইন কার্যকর ঠিকমতো করা হচ্ছে কিনা সেজন্য সার্জেন্টের পোশাকে ক্যামেরা লাগানো থাকবে। সেটি বন্ধ থাকলে বুঝে নেয়া হবে, অবৈধ কাজের জন্য ক্যামেরা বন্ধ ছিল। এ ব্যবস্থাটি আগেও ছিল কিন্তু কিছুদিন প্রয়োগের পর তা মুখ থুবড়ে পড়ে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৫৫ জন মারা যান। আর বাংলাদেশ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, দেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ১২ হাজার মানুষ নিহত ও ৩৫ হাজার আহত হন। এমন প্রেক্ষাপটে গত বছর বাসের চাপায় দুই স্কুল শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর ঢাকায় শুরু হয় শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলন। এরপর শাস্তির বিধান কঠোর করে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করে সরকার। ১ নভেম্বর থকে তা কার্যকরের জন্য ২২ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি হয়। সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ আইনে চালকেরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা জানালেও নতুন সড়ক পরিবহন আইনের জেরে যানবাহনের মালিক-চালকদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে। তবে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর নামে পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে শাস্তি বাড়ানোর বিরোধিতা করেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান। বিরোধিতা করেছে আরো কয়েকটি পরিবহন মালিক শ্রমিকদের সংগঠন। শাজাহান খান বলেছেন, নতুন আইনে মালিকদের বেশি ছাড় দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বিধিমালা প্রণয়ন করে আইন কার্যকরের প্রস্তাব দিয়েছেন। সেই সঙ্গে আইনের বিভিন্ন ধারা সংস্কার চান পরিবহন মালিকরা।

নতুন আইনে বিভিন্ন অপরাধে জরিমানা নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের এক ধরনের ক্ষোভ কাজ করছে। তারা বলেন, অহেতুক বিভিন্ন জরিমানার পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে। ওয়েলকাম পরিবহনের চালক মো. হাসিব মনে করেন, চালকরাও চান নিয়মকানুন মেনে চলতে। কিন্তু রাস্তায় নামলেই অবস্থাটা এমন দাঁড়ায়, অনেক নিয়ম আর মানা সম্ভব হয় না। অনেক সময় সিগন্যাল ভাঙার জন্য যাত্রীরা চাপ দেন। নির্ধারিত সময়ে ট্রিপ শেষ করারও একটা ব্যাপার আছে। যাত্রীরা নির্ধারিত স্টপেজে যেমন দাঁড়ান না, তেমনি মাঝ রাস্তায়ও নেমে যেতে চান। পুরো সিস্টেমটাই খারাপ।

লাভলী পরিবহনের চালক আশরাফ বলেন, কঠোর আইন হয়েছে শুনেছি। কিন্তু জানি না আমাদের জন্য কী ধরনের বার্তা আছে। মালিকরা তো কিছু বলছেন না। নিউভিশন পরিবহনের চালক আলাল বলেন, আমাদের নাকি আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এখনো দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। তখন জানা যাবে নতুন আইনে করণীয় কী আছে। জাবালে নূর পরিবহনের কন্ডাক্টর রিয়াজ বলেন, আইনে নাকি সব দোষ আমাদের। মালিকরাও সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে কোনো দায় নেবে না। তাহলে আমরা কোথায় যাব।

অনেকে বলছেন, এখন জরিমানা বাড়ায় তারা আগে যেখানে দুশ’ টাকা ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দিত এখন সেখানে পাঁচশ’ টাকা দিতে হবে, নইলে বলবে পাঁচ হাজার টাকার মামলা দিচ্ছি। আরেকটি বিষয় বলা হচ্ছে, অবৈধ পার্কিং। আমাদের দেশে স্কুল, কলেজ, হাসপাতালের কোথাও প্রয়োজনীয় পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। যা রয়েছে তা অত্যন্ত সীমিত। এমনকি প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বলে পরিচিত সচিবালয়েও নেই প্রয়োজনীয় পার্কিং। রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করতে দেখা যায় সচিবালয়ে আসা দর্শনার্থীদের। তাহলে এসব সমস্যার সমাধান না করে জরিমানা করলে সেটা কতটা ভালো হবে বলা মুশকিল।

এ ছাড়া ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় আর চালক হেলপারদের কাছে জিম্মির ঘটনাতো রয়েছেই। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে বিভিন্ন সময় তাদের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন অনেকে। বয়সসীমা আগেও বেঁধে দেয়া হয়েছে কিন্তু কেউ মানেনি। বিশেষ করে লেগুনাগুলো চালায় অল্পবয়সী চালক। সার্টিফিকেট বেঁধে দিয়েছে ভালো, কিন্তু এর মাধ্যমে স্কুলগুলোর একটা ব্যবসা করার পরিবেশ তৈরি হলো। টাকা দিলে পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণির সার্টিফিকেট জোগাড় করতে বিশেষ বেগ পেতে হবে না। তাছাড়া নীলক্ষেত তো রয়েছেই। সবশেষে যে কথাটা বলা দরকার সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন করতে গেলে আগে অবকাঠামোগত উন্নয়নটা জরুরি। বিআরটিএর চেয়ারম্যান কামরুল হাসান বলেন, ছোটখাটো কিছু দুর্বলতা তারা চিহ্নিত করেছেন। নতুন বিধিমালায় সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সড়ক পরিবহন বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবদুল মালেকের নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ করছে। শিগগিরই তা চ‚ড়ান্ত হয়ে যাবে। এরপর আর আইন প্রয়োগে সমস্যা থাকবে না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, সচেতনতা সৃষ্টি ও আইনের অস্পষ্টতার বিষয়গুলো নিয়ে অনেক আগে থেকে কাজ শুরু করা দরকার ছিল। জোরেশোরে প্রচার চালিয়ে এবং অস্পষ্টতা সমাধান করে দ্রুত আইনটি প্রয়োগ করা জরুরি।

ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, আইন প্রয়োগের আগে জনসাধারণকে সচেতন করা হচ্ছে। বাস টার্মিনাল ও গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনে সচেতনতামূলক মাইকিং করা হচ্ছে। পরিবহন মালিক শ্রমিকদের একত্রে করে তাদের এ আইন সম্পর্কে ধারণা দেয়া হচ্ছে ও সচেতনতামূলক লিফলেট বিলি করা হচ্ছে। আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা প্রায় ৮০০ জন সার্জেন্ট ও টিআইকে নতুন আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কমিশনার আরো বলেন, নতুন আইনের জন্য পজ মেশিন সফটওয়্যার আপডেটের কাজ চলছে। সেটা না হওয়া পর্যন্ত আমরা কেস স্লিপের মাধ্যমে মামলা দেব।

মানবকণ্ঠ/এইচকে 




Loading...
ads
ads





Loading...