পেঁয়াজের ঝাঁজে সারাদেশ উত্তাল: রাজধানীতে বিক্ষোভ

মানবকণ্ঠ
ছবি - সংগৃহীত।

poisha bazar

  • আসাদ জোবায়ের
  • ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৫৩

পেঁয়াজের বাজার কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। ইতোমধ্যে যা ২০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এটাই ইতিহাসে সর্বোচ্চ দাম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে চায়ের দোকান সব জায়গায় এখন পেঁয়াজ নিয়ে আলোচনা। সবার একই প্রশ্ন কোথায় গিয়ে ঠেকবে এই পাগলা ঘোড়া। সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন সময় আস্থার বাণী শোনানো হলেও তা বাস্তবতার মুখ দেখেনি। তিন দিন আগে শিল্পমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে আছে। এ বক্তব্যের পরপরই দেড়শ’ টাকা থেকে ২০০ টাকা অতিক্রম করল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন সাড়ে ৬ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ দরকার। সেখানে তিনশ’ টন থেকে পাঁচশ’ টন পেঁয়াজ আমদানির খবর প্রচার করে আশ্বাসের বাণী শুনিয়ে লাভ নেই। বরং সরবরাহ না বাড়িয়ে মনিটরিংয়ে উল্টো ফল হচ্ছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে পেয়াজের দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এমপিরা। তারা দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। পেঁয়াজের দাম কমানোর দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন খেটে খাওয়া মানুষরা। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর কাওরান বাজারের কাঁচাবাজার আড়ত সংলগ্ন এলাকায় ‘আমরা সাধারণ জনগণ’-এর ব্যানারে তারা এ বিক্ষোভ সমাবেশ করে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সব ধরনের পেঁয়াজ ২০০ টাকা থেকে ক্ষেত্রবিশেষে ২৪০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়েছে। গতকাল দুপুরে কাওরানবাজারে গিয়ে দেখা যায়, এক পাল্লা (৫ কেজি) পেঁয়াজ ১০০০ টাকা দর হাঁকছেন বিক্রেতারা। বেশির ভাগ ক্রেতা মলিন মুখে এক কেজি পেঁয়াজ কিনে ফিরে যাচ্ছেন। দাম কেন বেড়েছে জানতে চাইলে, বেশির ভাগ বিক্রেতা জানান, বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ নেই। দেশি পেঁয়াজের মজুতও প্রায় শেষ। তার ওপর ঘূর্ণিঝড়ে পেঁয়াজ পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। তাই দাম বেড়েছে। কারওয়ানবাজার ঘুরে দেখা যায়, ভালো মানের দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১ কেজি ২০০ টাকা দরে। অপেক্ষাকৃত খারাপ মানের ছোট পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকা দরে। আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে থেকে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা দরে। রাজধানীসহ সারাদেশেই একই পরিস্থিতি বলে জানা গেছে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত সরকার পেঁয়াজ রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পরপরই বাংলাদেশের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগ পর্যন্ত এটি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় ছিল। এরপর ধাপে ধাপে তা বাড়তে থাকে। তিনদিন আগেও ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে পেঁয়াজ। এরপর হঠাৎই তা ২০০ টাকা অতিক্রম করল।

গত সপ্তাহে সরকার জোর মনিটরিংয়ে নেমেছিল। ফলে কিছুটা কমেও এসেছিল দাম। সরকার ও ব্যবসায়ীরা বসে পেঁয়াজের সর্বোচ্চ দামও ঠিক করেছিল। সরকারের বেঁধে দেয়া দাম ছিল প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৯০, মিয়ানমারের ৮৫ এবং চীন, মিসর ও তুরস্কের ৬০ টাকা। কিন্তু সেখানে ব্যবসায়ীনা স্থির থাকতে পারেননি। জানা গেছে, ৭ নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাতে সরকার-মজুদদার ও আড়তদার মিলে পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ করে দেয়ার পরদিন শুক্রবার প্রায় সব আড়তে বেঁধে দেয়া দামে বিক্রি শুরু করে। কিন্তু পরের দিন শনিবার থেকে লোকসানের অজুহাতে মজুদদাররা আড়তে পেঁয়াজ দেয়া কমিয়ে দেয়। এরপর রোববার ও সোমবার পেঁয়াজ দেয়নি বেশিরভাগ মজুদদার। গত মঙ্গলবার অল্পকিছু পেঁয়াজ বাজারে ঢুকেছে। তবে আড়তদারদের মজুদদার জানান, তাদের নির্ধারিত দামে বিক্রি না করলে শ্যামবাজারে আর পেঁয়াজ দেয়া হবে না। এ কারণেই সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে।

শ্যামবাজারের আমদানিকারক ও পাইকারি বিক্রেতা আবদুল মাজেদ গতকাল বলেন, চাহিদার বিপরীতে জোগান একদম কম। দেশি পেঁয়াজ এখনো ওঠেনি। ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানি নেই। সব মিলিয়ে অস্থির বাজার।

এর আগে গত মঙ্গলবার সংসদে শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ুন বলেন, শিগগিরই পেঁয়াজের মূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে উপজেলা পর্যায় বাজার মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, এখন লিন সিজন (পেঁয়াজের মৌসুম শুরু হওয়ার আগমুহূর্ত) চলছে। এ সময় একটা সঙ্কট থাকে। আমাদের নতুন পেঁয়াজ এখনো ওঠেনি। কিছুদিনের মধ্যে নতুন পেঁয়াজ উঠবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মিয়ানমার ও তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভারত থেকেও আমদানি চালু হয়েছে। পেঁয়াজের বাজার যেটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিলে, সেটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালু আছে, কোথাও কেউ যেন বেশি দামে বিক্রি করতে না পারে। যদিও ৫ দিন কোনো অভিযান চলেনি বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ভারতীয় পেঁয়াজ না আসা পর্যন্ত দাম বাড়বে। যদিও দেশটি থেকে পুরনো ও সংশোধিত ঋণপত্রের (এলসি) পেঁয়াজ ছাড়ের বিষয়ে আজ শুক্রবার সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে দেশটির বাজারেও পেঁয়াজের দাম চড়া এবং তারাও পণ্যটি আমদানি করছে। এদিকে মিসর ও তুরস্ক থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের বড় তিনটি চালান কয়েক দিনের মধ্যে আসার সম্ভাবনা রয়েছে, যে পেঁয়াজ পাইকারিতে ৪০-৪১ টাকায় বিক্রির কথা আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সঙ্গে। তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। এটা মেনে নিতেই হবে। এখন এই ঘাটতিকে পুঁজি করে এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা ঘরে তুলছেন কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। তিনি বলেন, বাজারে কী পরিমাণ মজুত আছে, আমদানির পাইপলাইনে কী পরিমাণ আছে, এলসি খোলা হয়েছে কী পরিমাণ- এসব তথ্য সপ্তাহভিত্তিক প্রকাশ করতে হবে। এসব তথ্য না থাকায় ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা অন্ধকারে রয়েছেন। ফলে সহজেই পেনিক সৃষ্টি হয়ে দাম বাড়ছে। তিনি বলেন, শুধু অভিযান চালিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। প্রতিদিন যেখানে সাড়ে ৬ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ দরকার সেখানে তিনশ’ টন কিংবা হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করে লাভ হবে না। সরকার এখন দ্রুততার সাথে এক লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে পারে। এটি টিসিবির মাধ্যমে বিক্রি করতে পারে। টিসিবি এখন যেটা করছে তা বাজারে কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না।

কার্যকর পদক্ষেপ চান এমপিরা পেঁয়াজের ঝাঁজে সংসদে ক্ষোভ : লাফিয়ে লাফিয়ে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সরকারদলীয় সিনিয়র সংসদ সদস্যরা। এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি তারা পেঁয়াজ আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। কেউ আবার এটিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিষয়টির অবতারণা করেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। এরপর আলোচনায় অংশ নেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি তোফায়েল আহমেদ, সাবেক চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এত সুদক্ষ একটি মন্ত্রিসভা, তার দুজন মন্ত্রী এখানে আছেন। তাদের অনুরোধ করতে চাই। পেঁয়াজের ঝাঁজ বেশি হয়ে গেছে। জনগণের মধ্যে একটা রিঅ্যাকশন হচ্ছে। আজকে পর্যন্ত যে খবর আছে প্রায় ২০০ টাকা হয়ে গেছে পেঁয়াজের কেজি।

তিনি বলেন, আমরা এত জনপ্রিয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কাজ করে যাচ্ছি। কি কারণে প্রতিদিন বেড়ে যাচ্ছে পেঁয়াজের দাম? বাণিজ্যমন্ত্রী যখন সংসদে বলেন ১০০ টাকার নিচে নামবে না, তখন তো ব্যবসায়ীরা সুযোগ পেয়ে যায়। তাই অনুরোধ করব প্রয়োজনে বিদেশ থেকে আমদানি করছেন বলেছেন। তারপরেও কেন দাম বাড়ছে? ব্যাপারটা বোধগম্য না। এতে আমাদের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ভারতে গিয়ে বলেছিলেন পেঁয়াজের ঝাঁজ বেড়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেছিলেন পেঁয়াজের রফতানি বন্ধ করবেন না। পেঁয়াজের ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত। তিনি বলেন, বাণিজ্যমন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষের মধ্যে রিঅ্যাকশন খারাপ হবে।

খেটে-খাওয়া শ্রমিকদের বিক্ষোভ: অবিলম্বে পেঁয়াজের দাম কমানোসহ ৬ দফা দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে খেটে-খাওয়া সাধারণ শ্রমিকরা। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর কাওরান বাজারের কাঁচাবাজার আড়ত সংলগ্ন এলাকায় ‘আমরা সাধারণ জনগণ’-এর ব্যানারে তারা এ বিক্ষোভ সমাবেশ করে।

৬ দফায় দাবিগুলো হলো- দ্রব্যমূল্য হ্রাসকরণ, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ, মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ, ও যানজট নিরসন করা। বিক্ষোভ সমাবেশে নেতৃত্ব দেন আয়োজক সংগঠনের আহ্বায়ক ফিরোজা বেগম। তিনি বলেন, আমরা খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষ। আমরা দিন এনে দিন খাই। একদিন কাজ করতে না পারলে আমাদের না খেয়ে দিন-রাত কাটাতে হয়। এর মধ্যে প্রতিনিয়ত যেভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে তাতে আমাদের মতো খেটে-খাওয়া সাধারণ শ্রমিকদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। ২০/৩০ টাকার পেঁয়াজ এভাবে ১৩০-১৫০ টাকা হতে পারে না। এর পেছনে অবশ্যই কেউ কলকাঠি নাড়ছে। অবিলম্বে পেঁয়াজের দাম কমানোর জন্য আমরা সাধারণ জনগণ প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। পাশাপাশি অন্যান্য সকল পণ্যের দাম ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আনার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, আমরা কাওরান বাজারের কাঁচাবাজার আড়তের দিনমজুর। আমরা পণ্য উঠা-নামা করি, বাজার পরিষ্কার-পরিচ্ছন রাখি। হঠাৎ এই বাজার উচ্ছেদ করলে আমরা বিপদে পরে যাই। এতে আমাদের না খেয়ে থাকতে হয়। তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আকুল আবেদন, আমাদের কোনো কাজের ব্যবস্থা বা পুনর্বাসন না করে উচ্ছেদ করবেন না। আমরা তো বেশি কিছু চাই না। আমাদের বাড়ি-গাড়ি-অট্টালিকা গড়ার স্বপ্ন নেই। আমরা তিন বেলা পেট ভরে ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে চাই। আমাদের সেই ডাল-ভাতও যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে পরিবারের অন্য সদস্যসহ আমাদের না খেয়ে মরা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। এজন্য আমাদের একটাই দাবি- আমাদের কোনো কাজের ব্যবস্থা বা পুনর্বাসন না করে উচ্ছেদ করবেন না। এ সময় সমাবেশে শতাধিক সাধারণ খেটে-খাওয়া শ্রমিকরা উপস্থিত ছিলেন।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads
ads





Loading...