নতুন আইন কার্যকর হলেও পুরনো আইনেই ভরসা

নতুন আইন কার্যকর হলেও পুরনো আইনেই ভরসা
নতুন আইন কার্যকর হলেও পুরনো আইনেই ভরসা - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • আব্দুল্লাহ রায়হান
  • ০২ নভেম্বর ২০১৯, ১০:০৬

গতকাল শুক্রবার থেকে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বাধার মুখে ঝুলে থাকা নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হয়েছে। নতুন আইন কার্যকরের প্রথম দিনে রাজধানীতে আইন প্রয়োগকারীরা পুরনো আইনেই পরিবহন চালকদের সাজা দিয়েছেন। এছাড়া আইনটি সম্পর্কে খোদ প্রয়োগকারী সংস্থা, জনসাধারণ ও পরিবহন চালক-হেলপার কিংবা পথচারীদের অধিকাংশই তেমন কিছু জানেন না।

এদিকে কার্যকর হওয়া আইন নিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সড়ক আইন পাস হয়েছে। সড়কে শৃঙ্খলা না থাকলে উন্নয়নের কোনো মূল্য নেই। তাই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হলেও এখনো প্রয়োগ হবে পুরনো আইনই। পর্যায়ক্রমে সহনীয় মাত্রায় নতুন আইনটি প্রয়োগ শুরু হবে। তার আগে প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের আইনটি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা ও বিশেষ করে যাদের জন্য আইন অর্থাৎ পথচারী, চালক ও হেলপারদের মোটিভেশন করা হবে। অন্য দেশের তুলনায় আইনটি বেশ কঠিন। আইনটি প্রয়োগের আগে উচিত ছিল সড়ক ও পরিবহন অবকাঠামো ঢেলে সাজানো। এছাড়া নতুন আইনে কঠোর শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে।

সরেজমিনে রাজধানীর শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, গুলিস্তান, শাহবাগ, ধানমণ্ডি, মিরপুর, শেরেবাংলা নগর, বিজয় সরণি, তেজগাঁও এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ছুটির দিন হওয়ায় সড়কে যানবাহনের চাপ ছিল কম। সড়কে যানবাহন চলাচল করছে আগের মতোই। কোনো বাসেই ভাড়ার চার্ট টাঙানো নেই, পথচারীরা ফুটপাত ছেড়ে সড়কে হাঁটছেন, যেখানে সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো নামানো হচ্ছে।

পরিবহনের চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকরা কমবেশি কার্যকর হওয়া নতুন সড়ক পরিবহন আইন সম্পর্কে জানেন বা সচেতন রয়েছেন। কিন্তু গণপরিবহন বা বাসের অধিকাংশ চালক নতুন আইন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তারা জানেন যে, শুক্রবার থেকে রাজধানীতে বাস ও চালকদের বিরুদ্ধে রাস্তায় বিশেষ অভিযান চালাবে ট্রাফিক পুলিশ। আর এই তথ্য তারা তাদের নেতা ও মালিকদের কাছ থেকে জেনেছেন। এজন্য অনেক মালিকই তাদের ত্রæটিপূর্ণ বাস রাস্তায় নামাননি।

ঠিকানা পরিবহনের একটি বাসের চালক নাবিল বলেন, গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার আগে মালিক বলছে আজ নাকি সারা শহরে অভিযান হবে। কিন্তু যাত্রী ও বিভিন্ন মানুষের কথা শুনে জানতে পেরেছি নতুন আইন কার্যকর হয়েছে। আইনের ব্যাপারে পুরোপুরি না জানলেও আজকের মধ্যে এ বিষয়ে অনেক কিছু জানব।
স্বাধীন এক্সপ্রেসের বাসচালক সেলিম মিয়া বলেন, আগে তো গ্যাসের দাম বাড়লে বা কোনো আইন হলে মালিকরা এবং নেতারা আমাদের বলতেন। কিন্তু এবার তারা কেন অভিযানের কথা বলছেন বুঝতেছি না। কিন্তু রাস্তায় এসে শুনি নতুন আইন পাস হয়েছে। বিসমিল্লাহ পরিবহনের আবুল কালাম জানান, গণপরিবহনের মালিকপক্ষ বা শ্রমিক নেতারা নতুন আইন সম্পর্কে তাদের কিছুই জানায়নি। এই আইন সম্পর্কে অন্য কোনো পক্ষ থেকেও তারা কিছু জানেননি। তাই নতুন আইন সম্পর্কে রাজধানীর অনেক বাসচালকই অজ্ঞ।

অটোরিকশা চালক মামুন সরদার বলেন, নতুন আইন কার্যকর হবে দেখে এক মাস আগেই লাইসেন্স করেছি। এখন লাইসেন্স ছাড়া আর গাড়ি চালানো যাবে না। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ছয় মাসের জেল আর ২৫ হাজার টাকা জরিমানা। তাই আইন মেনে গাড়ি না চালালে বিপদ!

অ্যাপসভিত্তিক মোটরসাইকেল চালান শামিম হোসেন। তিনি বলেন, নতুন আইন প্রয়োগ হলে কোনো চালক আর গাড়ি চালাতে চাইবে না। কারণ একজন পথচারী যদি তার নিজের দোষে যানবাহনের নিচে পড়ে যায়, হঠাৎ দৌড় দেয়ার ফলে দুর্ঘটনার শিকার হয় তাহলে এর দায় তো ওই পরিবহন চালকের হতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই সংশোধনী জরুরি। তাছাড়া যারা গরিব চালক বা হেলপার তাদের ক্ষেত্রে তো জরিমানা কিংবা জেল উভয়টাই বেশি। পথচারীদের জন্য এ আইনটা বেশি প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তবে অপরাধী হলে আইন প্রয়োগে কোনো সমস্যা নেই বলে মনে করেন তিনি।

ফার্মগেটে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক সার্জেন্ট শফিক আহমেদ বলেন, সদ্য কার্যকর হওয়ায় অনেকেই হয়ত আইন সম্পর্কে কিছু জানেন না। তবে আমরা চেষ্টা করছি নতুন আইন সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে। নতুন আইন কার্যকরের প্রথম দিন সড়কে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। তিনি বলেন, নতুন আইনে শাস্তির বিধান বেশি থাকায় কেউ লাইসেন্স বা হেলমেট ছাড়া রাস্তায় বের হচ্ছেন না। সকাল থেকে যতগুলো গাড়ি চেক করেছি কোথাও কোনো অনিয়ম পাইনি। মনে হচ্ছে নতুন আইনে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আইনটি যুগোপযোগী কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইনটি অবশ্যই যুগোপযোগী। আইনটি বাস্তবায়ন হলে অবশ্যই সড়কে আগের তুলনায় গতি বাড়বে, শৃঙ্খলা ফিরবে।

নতুন আইন কার্যকর হলেও যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মো. মাহবুব-ই-রাববানী বলেন, নতুন এ আইন একেবারে চাপিয়ে দেয়া হবে না। কারণ আগের আইনের সঙ্গে নতুন আইনের অনেক পার্থক্য রয়েছে। হঠাৎ করে নতুন আইন চাপিয়ে এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হবে না যাতে গাড়ি-ঘোড়া চলাচল বন্ধ হয়ে জনভোগান্তি তৈরি করে। তবে পর্যায়ক্রমে নতুন আইনটি সহনীয় মাত্রায় প্রয়োগ করা হবে। আপাতত কাজ চলবে পুরনো আইনে।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সংগঠনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, নতুন এ আইনের বিষয়গুলো প্রচার ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। জনসাধারণের কাছে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই সফলতা আসবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, আমাদের ট্রাফিক বিভাগে জনবল বাড়াতে হবে। যে জনবল আছে তাদের নতুন আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করতে ট্রেইনাপ করা হবে। তাছাড়া নতুন আইনটির সফল প্রয়োগের ক্ষেত্রে পথচারী, পরিবহন চালক হেলপারসহ সকল মহলের সহযোগিতা প্রয়োজন।

এই আইনকে ভালোভাবে মেনে নিতে পারছে না মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো। তারা বিধিমালা প্রণয়ন ছাড়া আইন কার্যকর নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন। তিনি সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত ধারায় জামিনযোগ্য বিধান অন্তর্ভুক্তিসহ ৫ দফা দাবি জানিয়ে বলেছেন, ভয় দেখিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা আনা যাবে না।

নতুন আইন প্রসঙ্গে বিআরটিএ চেয়ারম্যান ড. মো. কামরুল আহসান বলেন, আইন প্রয়োগে প্রথমদিকে কিছুটা সমস্যা হতে পারে। তা ধীরে ধীরে কেটে যাবে। আইনের উদ্দেশ্য ঢালাও সাজা দেয়া নয়, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা।

মানবকণ্ঠ/এআইএস




Loading...
ads





Loading...