কার্যকর হচ্ছে সড়ক পরিবহন আইন, উপকৃত হবেন ১৮ কোটি মানুষ

আব্দুল্লাহ রায়হান

মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২৫ অক্টোবর ২০১৯, ১১:৩৯,  আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০১৯, ১১:৫০

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও দুর্ঘটনা কমাতে এমন অনেক বিধান রেখে নতুন সড়ক পরিবহন আইন আগামী ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হচ্ছে। সংসদে পাস হওয়ার প্রায় এক বছর পর আইনটি কার্যকর হওয়ার পথে রয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে দেশের ১৮ কোটি মানুষের দাবি বাস্তবায়ন হবে বলে মনে করছেন সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে সড়ক পরিবহন আইনটি কার্যকর না করতে এতদিন ধরে সরকারের ওপর মালিক-শ্রমিকদের চাপ ছিল। ফলে আইনটি পাস করা হবে না কিনা তা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বাধার মুখে এতদিন আইনটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার।

গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হন। সেদিন থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারাদেশে রাস্তায় নেমে আসেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর তড়িঘড়ি করে সংসদে পাস করা হয় সড়ক পরিবহন আইন।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ কার্যকরের জন্য ২২ অক্টোবর তারিখ ঘোষণা করে আদেশ জারি করা হয়। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’-এর ধারা ১ এর উপ-ধারা (২) এ দেয়া ক্ষমতাবলে সরকার ১ নভেম্বর আইন কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করেছে।

জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ সড়ক পরিবহন আইনের খসড়াটি নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। এরপর থেমে ছিল উদ্যোগ। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নের দাবিতে রাজধানীজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী আইনটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর আইন মন্ত্রণালয় খসড়া আইনটি দ্রুত ভেটিং (পরীক্ষা-নিরীক্ষা) করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। অল্প সময়ের মধ্যে আইনটি সংসদেও পাস হয়।

বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনার মাধ্যমে গুরুতর আহত করলে বা প্রাণহানি ঘটালে চালকের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বিধান রাখা হয় এই আইনে। একই সঙ্গে আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি নির্ধারণ ও বিভিন্ন অপরাধের ধারাগুলো জামিন অযোগ্য রাখা হয়। এতদিন নতুন সড়ক পরিবহন আইনের বিভিন্ন ধারার বিরোধিতা করেছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। তারা আইনের বিভিন্ন ধারা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনেও নামেন। মালিক-শ্রমিকদের দাবির মধ্যে রয়েছে-সড়ক পরিবহন আইনের সব ধারা জামিনযোগ্য করা, সড়কুর্ঘটনায় শ্রমিকের অর্থদণ্ড পাঁচ লাখ টাকার বিধান বাতিল করা, ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি করা ইত্যাদি।

এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সরকার শাস্তির বিধানে কোনো পরিবর্তন না করে সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে আইনের বাস্তবায়ন শুরু করা হবে। দেরিতে হলেও আইনটি বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা বলেন। ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদের সড়ক পরিবহনের জন্য সবারই প্রত্যাশা ছিল আইনটি বাস্তবায়ন হোক। বিধি-বিধানের বিষয় আছে। আবার পরিবহনের দিক থেকে কিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি ছিল। তারপরও আমরা এখনো যে যেটা বলুক আইনটা হয়েছে। আইনের কার্যকারিতা জাতির দাবি। এটা আমরা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি।

আইনে বিধি সংযুক্ত হলে কোনো পরিবর্তন আসছে কিনা জানতে চাইলে ওবায়ুল কাদের বলেন, কিছু বিধি যোগ হতে পারে। বিধি তো মূল আইনের সংশোধনী, এখানে নেই। বিধি তো হবেই আইন থাকলে।

আইন পাসের আগে-পরে বিরোধিতা:
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর যুগোপযোগী সড়ক পরিবহন আইন করার উদ্যোগ নেয়। একাধিকবার আইনের খসড়াও তৈরি করা হয়। প্রতিবারই খসড়া আইনের বিরোধিতা করেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। তাদের বাধার মুখে সড়ক পরিবহন আইনটি পাস হচ্ছিল না।

বর্তমান সড়ক পরিবহন আইনটির খসড়া ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। এই খসড়া সংশোধনের াবিতেও দেশের বিভিন্ন জেলায় পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা ধর্মঘট করেন। আইনটি পাসের পর এর বেশ কয়েকটি ধারা সংশোধনেরাবিতে আন্দোলনে নামেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা। ৮ দফা দাবিতে গত বছরের ২৮ অক্টোবর থেকে সারা দেশে ৪৮ ঘণ্টার পরিবহন ধর্মঘট পালন করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন।

পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের াবির মধ্যে রয়েছে সড়ক পরিবহন আইনের সব ধারা জামিনযোগ্য করা, সড়কুর্ঘটনায় শ্রমিকের অর্থদন্ড পাঁচ লাখ টাকার বিধান বাতিল করা, ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি করা। মূলত তাদের চাপের কারণে আইনটি কার্যকর করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ ছিল।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, আইনটি কার্যকর না করতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা কোনো চাপ দিয়েছেন, এ তথ্য ঠিক না। নতুন আইন তাড়াতাড়ি কার্যকর হোক, এটা মালিক-শ্রমিকেরাও চান।

সড়ক পরিবহন আইন বিষয়ে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বিরোধিতায় আইনে চালকের সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছরের বদলে ৫ বছর করা হয়েছে। তার পরও সংসদে পাস হওয়া আইন নিয়ে মালিক-শ্রমিকেরা আন্দোলনের নামে যাত্রীদের এতদিন হয়রানি করেছেন। এখন সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক পরিবহন আইনটির যথাযথ প্রয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে।

এদিকে আইনে বলা হয়েছে, অষ্টম শ্রেণি পাস না করলে লাইসেন্স পাবেন না চালকরা। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না। মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে এক মাসের কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। আইনে সাধারণ চালকের বয়স আগের মতোই কমপক্ষে ১৮ বছর এবং পেশাদার চালকদের বয়স হতে হবে কমপক্ষে ২১ বছর। জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহারের জন্য ২ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানা ৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়। ফিটনেস চলে যাওয়ার পরেও মোটরযান ব্যবহার করলে ১ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা করা হবে।

দুর্ঘটনার জন্য দণ্ডবিধি অনুযায়ী, তিন রকমের বিধান আছে। নরহত্যা হলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডে সাজা হবে। খুন না হলে ৩০৪ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু ঘটালে ৩০৪ (বি) ধারা অনুযায়ী ৩ বছরের কারাদণ্ড হবে। দুই গাড়ি প্রতিযােগিতা করে দুর্ঘটনা ঘটালে ৩ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেয়া হবে। দুর্ঘটনায় না পড়লেও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর জন্য আইনে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড অথবা ২ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে। মহিলা, শিশু, প্রতিবন্ধী এবং বয়োজ্যেষ্ঠ যাত্রীর জন্য সংরক্ষিত আসনে অন্য কোনো যাত্রী বসলে এক মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড করা হবে।

এ ছাড়া মদ পান করে বা নেশাজতীয় দ্রব্য খেয়ে গাড়ি চালালে, সহকারীকে দিয়ে গাড়ি চালালে, উল্টো দিকে গাড়ি চালালে, নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য স্থানে গাড়ি থামিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, চালক ছাড়া মোটরসাইকেল এক জনের বেশি সহযাত্রী উঠালে, মোটরসাইকেলের চালক ও সহযাত্রীর হেলমেট না থাকলে, ছাদে যাত্রী বা পণ্য বহন, সড়ক বা ফুটপাতে গাড়ি সারানোর নামে যানবাহন রেখে পথচারীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি, ফুটপাতের ওপর দিয়ে কোনো মোটরযান চলাচল করলে সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ড বা ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড প্রস্তাব করা হয়েছে।

মানবকণ্ঠ/আরবি




Loading...
ads





Loading...