ক্যাসিনো সম্রাট ও আরমানকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ


poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৩৫

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ বহিষ্কৃত সভাপতি ও ক্যাসিনো (জুয়ার আসর) হিসেবে খ্যাত ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী এনামুল হক আরমানকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছে র‌্যাব। অবৈধ ক্যাসিনো কারবার, চাঁদাবাজি, টেন্টারবাজি ও মাদক কারবার চালিয়ে দেশ-বিদেশে অঢেল সম্পদ ও শত কোটি টাকার মালিক হওয়ার রহস্য জানতে তাদের মুখোমুখি করে জেরা করেছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। র‌্যাবের তদন্তে ও পৃথক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য সামনে রেখে সম্রাট ও আরমানকে জেরায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চমকপ্রদ তথ্য মিলেছে। অবৈধভাবে অর্জিত সম্রাটের টাকার ভাগ কয়েকজন সিনিয়র রাজনীতিবিদ, এমপি, প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পেশার কতিপয় ব্যক্তি পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।


এদিকে আলোচিত কাসিনোকাণ্ডে গ্রেফতার গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগ সহসভাপতি এনামুল হক ও তার ভাই থানা আওয়ামী লীগ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রূপন ভ‚ঁইয়ার ৩৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাই এই দুজনের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক মামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। সূত্র জানায়, মঙ্গলবার কমিশনের সভায় দুটি মামলার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আজ দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলা হবে।


দুদক সূত্র বলছে, এনামুল হক বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা ও অবৈধ কার্যক্রমের মাধ্যমে ২১ কোটি ৮৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহিভর্‚ত সম্পদ অর্জন করেছেন। তাকে অবৈধ অর্থ অর্জনে সহায়তা করেছেন ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের কর্মচারী আবুল কালাম ও এনামুলের বন্ধু হিসেবে পরিচিত হারুন অর রশিদ। তাই এই তিনজনকে একটি মামলায় আসামি করা হচ্ছে।


অন্যদিকে মাত্র কয়েক বছরে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ‘সুলতান’ বনে যাওয়া ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবের অঢেল অবৈধ সম্পদ ও এর উৎস জানার চেষ্টার চালাচ্ছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। চাঁদাবাজি, দখলবাজি, হাটবাজার নিয়ন্ত্রণ ও মাদক কারবারসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে বিতর্কিত এই কাউন্সিলরকে সোমবার থেকে টানা জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা ও মোহাম্মদপুর এলাকার সাবেক একজন এমপি তার ‘গডফাদার’ বলে ইতোমধ্যে রাজীব স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বলে ডিবি সূত্র জানায়। ভাটারা থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনের দুই মামলায় সাতদিন করে মোট ১৪ দিন রিমান্ডে রয়েছেন বিতর্কিত কাউন্সিলর রাজীব।


গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় অবৈধ ক্যাসিনোবিরোধী র‌্যাবের সাঁড়াশি অভিযানের ধারাবাহিকতায় গ্রেফতার হন বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভুইয়া, জি কে শামীম, ইসমাইল হোসেন সম্রাট, তার সহযোগী আরমান, গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগ সহসভাপতি এনামুল হক ও তার ভাই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রূপন ভ‚ঁইয়া, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পরিচালক লোকমান ভ‚ইয়া ও অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান, মোহাম্মদপুরে কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ও কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব।
অবৈধ ক্যাসিনো (জুয়ার আসর) চলার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর আত্মগোপনে চলে যান যুবলীগ প্রভাবশালী নেতা সম্রাট। নানা গুঞ্জনের পর ৭ আগস্ট কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সম্রাটকে দুই মামলায় ৫ দিন করে ১০ দিন ও তার সহযোগী আরমানকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সম্রাট ও আরমানের মামলা তদন্ত করছে র‌্যাব। আরমানকে সোমবার আরো ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে র‌্যাব। উত্তরা র‌্যাব-১ এর কার্যালয়ে রেখে সম্রাট ও আরমানকে জিজ্জাসাবাদ করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট র‌্যাব কর্মকর্তারা।


র‌্যাব সূত্র জানায়, সম্রাটকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া ও মাসোয়ারা নেয়ার অভিযোগ ওঠা প্রবীণ রাজনীতিবিদ রাশেদ খান মেনন ও বহিষ্কৃত যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধেও অ্যাকশনে যেতে পারে র‌্যাব। তবে কাউকে অযথা হয়রানি করা হবে না।


জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখা পরিচালক এবং মুখপাত্র লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, সম্রাট ও আরমানকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। তারা অনেক বিষয়ে অকপটে মুখ খুলেছেন। প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে জড়িত অপর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে চার্জশিট দেয়া হবে।


এদিকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অবৈধভাবে জমি দখলের অভিযোগে শনিবার রাত ১১টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এক বন্ধুর বাড়ি থেকে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, তিন রাউন্ড গুলি, একটি ম্যাগজিন, ৭ বোতল বিদেশি মদ, একটি পাসপোর্ট ও ৩৩ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।


র‌্যাব সদর দফতর সূত্র জানায়, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হওয়া যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভ‚ইয়া, মোহাম্মদপুরের ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পরিচালক লোকমান ভ‚ইয়া ও গুলশানের স্পা সম্রাট খ্যাত ক্যাসিনো সেলিম প্রধান গ্রেফতার হওয়ার পর রিমান্ডে সবাই তারেকুজ্জামান রাজীবের নাম বলেছে। সেই সূত্র ধরে তাকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব তার অবৈধ সম্পদের কিছু তথ্য র‌্যাবের কাছে জানিয়েছেন।


অপরদিকে চলমান ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ২৪ সেপ্টেম্বর এনামুল হক ও তার ভাই থানা রূপন ভ‚ঁইয়ার গেণ্ডারিয়ার বাসায় অভিযান চালায় র?্যাব। সেখান থেকে টাকা ও গয়না জব্দ করার পর ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের কর্মচারী আবুল কালাম ও এনামুলের বন্ধু হিসেবে পরিচিত হারুন অর রশিদের বাসায় অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে সব মিলিয়ে ৫ কোটি ৫ লাখ টাকা, ৪ কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার ও ৬টি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করে র?্যাব।


অভিযান শেষে র‍্যাব জানিয়েছিল, এনামুল হক ও রূপন ভ‚ঁইয়া ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের শেয়ারহোল্ডার। ওয়ান্ডারার্স ক্লাব থেকে ক্যাসিনোর টাকা এনে এনামুল বাসায় রাখতেন। কিন্তু বিপুল পরিমাণ টাকা রাখার জায়গাও হতো না। তাই টাকা দিয়ে তিনি স্বর্ণালঙ্কার কিনতেন। ওয়ারী থানায় করা অস্ত্র আইনের মামলায় বলা হয়, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চলাকালে র‍্যাব জানতে পারে, ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের অবৈধ ক্যাসিনোর অংশীদার এনামুল হকের অর্থ বিশ্বস্ত কর্মচারী আবুল কালাম ও হারুন অর রশীদের বাসায় আছে। র?্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সোনা, আগ্নেয়াস্ত্র ও টাকা উদ্ধার করে। বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের করা মামলায় দুই ভাইকে আসামি করা হয়।

মানবকণ্ঠ/এইচকে 




Loading...
ads





Loading...