অসম চুক্তিতে বিমানের গচ্চা ৬৫০ কোটি টাকা

আব্দুল্লাহ রায়হান


poisha bazar

  • ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ১০:১০,  আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৫৮

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তাদের খামখেয়ালিপনায় অসম চুক্তি করে মিসর (ইজিপ্ট এয়ারলাইন্স) থেকে ভাড়ায় আনা দুটি উড়োজাহাজ ফিরে গেছে। চলতি বছরের ১৬ জুলাই প্রথম উড়োজাহাজটি মিসর পাঠানো হলেও দ্বিতীয় উড়োজাহাজটি ফেরত গেছে গতকাল মঙ্গলবার। বোয়িং ৭৭৭-২০০ ইআর দুটি উড়োজাহাজের পেছনে গত পাঁচ বছরে বিমানের প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা গচ্চা গেছে। ভাড়া নেয়ার সময় উড়োজাহাজ দুটি যে অবস্থায় আনা হয়েছিল, ফেরত দেয়ার সময় সে অবস্থায় দিতে হবে বলে চুক্তি করেছিল বিমান। তাই নষ্ট উড়োজাহাজ দুটি মেরামত করার জন্য প্রায় ৬ মাস ফিলিপাইনের একটি ওভারহোলিং শপে পাঠানো হয়। সেখানে মেরামত শেষে উড়োজাহাজগুলো ফেরত পাঠানো হয়েছে। বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।


বিমান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজ দুটি ড্রাই লিজ চুক্তিতে আনা হয়েছিল মিথ্যা তথ্য দিয়ে। যে কারণে লাভের চেয়ে ক্ষতি হয়েছে বেশি। মাসে ১১ কোটি টাকা হারে পাঁচ বছরে ৬৫০ কোটি টাকার ওপরে মাশুল গুনতে হয়েছে। দুটি উড়োজাহাজ লিজের নামে হাতি পুষেছে বিমান। এ কারণে বছরে বিমানকে গচ্চা দিতে হয়েছে প্রায় ১৩২ কোটি টাকা।


সূত্র জানায়, উড়োজাহাজটি ফেরত পাঠাতে বিমানের পরিচালক ফ্লাইট অপারেশন (ডিএফও) ক্যাপ্টেন এবিএম ইসমাইল ও ক্যাপ্টেন ইসহাকের নেতৃত্বে একটি টিম গতকাল সকালে উড়োজাহাজটি নিয়ে মিসরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। উড়োজাহাজটি ইজিপ্ট এয়ারলাইন্সের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে অন্য এয়ারলাইন্সে তারা ঢাকায় ফিরবেন।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমানের ‘গলার কাঁটা’ নামে পরিচিত এ দুটি এয়ারক্র্যাফট নেয়ার সময় অসম চুক্তি করায় ফেরত দিতে এ বিশাল অঙ্কের টাকা গুনতে হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হকের নেতৃত্বে মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব ও বর্তমান বিমানের এমডি মোকাব্বির হোসেনের অক্লান্ত চেষ্টায় অবশেষে বিমানের এ কলঙ্ক মোচন সম্ভব হয়েছে।


চুক্তি অনুযায়ী, যাত্রী পরিবহন করুক আর না করুক প্রতি মাসে উড়োজাহাজ প্রতি ৪ কোটি ৭০ লাখ ১৬ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে বিমানকে। পাঁচ বছরের আগে চুক্তি বাতিল করা যাবে না, আবার লিজের মেয়াদ শেষে উড়োজাহাজ দুটি আগের অবস্থায় ফেরত দিতে হবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ ছিল।


এ প্রসঙ্গে বিমানের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ৫ বছর আগে লিজে আনা একটি উড়োজাহাজ কোনোভাবেই সেই অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এটি একটি অসম্ভব কাজ। অথচ বিমানের ওই সময়কার কর্তাব্যক্তিরা এই চুক্তিটি করেছিলেন।


বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের মার্চে পাঁচ বছরের চুক্তিতে ইজিপ্ট এয়ারলাইন্সের কাছ থেকে দুটি বোয়িং ৭৭৭-২০০ ইআর লিজ নেয় বিমান। এর একটি বিমানের বহরে যুক্ত হয় ওই বছরের মার্চে ও অন্যটি একই বছরের মে মাসে। কিন্তু উড়োজাহাজ দুটি এতটাই লক্কড়-ঝক্কড় ছিল ১১ মাস পার হতে না হতেই ২০১৫ সালের ফেব্রæয়ারিতে বিকল হয়ে পড়ে একটির ইঞ্জিন। ওই উড়োজাহাজটি মেরামত করতে ইজিপ্ট এয়ার থেকেই ভাড়ায় আনা হয় আরেকটি ইঞ্জিন। অপরদিকে দেড় বছরের মাথায় নষ্ট হয় বাকি ইঞ্জিনটিও।


আবারো চড়া দামে ভাড়ায় আনা হয় আরেকটি ইঞ্জিন। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অজুহাতে নষ্ট হতে থাকে উড়োজাহাজ দুটি। একপর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায় ভাড়ায় আনা ইঞ্জিনও। এরপর ইঞ্জিনগুলো মেরামত করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি শপে পাঠানো হয়। কারণ ইঞ্জিনগুলো এতোটাই পুরনো মডেলের ছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের ওই শপ ছাড়া বিশ্বের আর কোনো কারখানায় মেরামত সম্ভব ছিল না। এতে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় ওই শপ। মেরামত করতে পাঠানোর কারণে বিমানকে উড়োজাহাজ না চালিয়েও প্রতিমাসে ভাড়ার ১১ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।


বিমানের প্রকৌশল শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, বোয়িং দুটি লিজে দেয়ার আগে ইজিপ্ট এয়ার এক বছরের বেশি সময় ফেলে রেখেছিল। আমরা যে অবস্থায় উড়োজাহাজ দুটি পেয়েছিলাম তার থেকেও অনেক ভালো অবস্থায় ফেরত দেয়া হয়েছে।


বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাব্বির হোসেন জানান, পুরনো মডেলের এই উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ সহজলভ্য ছিল না। তাই মেরামতের জন্য উড়োজাহাজ দুটি ভিয়েতনামের বিমানবন্দরে পড়ে ছিল ছয় মাস। তবে দীর্ঘদিন পরে হলেও বিমান কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, অসম চুক্তির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।


বিমান বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, কর্তৃপক্ষ চাইলে আরো আগেই বিষয়টির সমাধান করতে পারত। নিজেদের স্বার্থ বিবেচনা না করে চুক্তি করায় উড়োজাহাজ দুটি বিমানের জন্য বোঝা হয়েছিল। দায়িত্ব নেয়ার পরই ইজিপ্ট এয়ারের সাথে কথা বলে দ্রæত উড়োজাহাজ দুটি ফেরত দেয়ার ব্যাপারে বিমানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী। তিনি বলেন, অসম চুক্তি করে উড়োজাহাজ দুটি লিজে আনার সাথে বিমানের কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর বিমানের ভাবমূর্তি উদ্ধারে সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্নীতি রোধ করা হবে।

মানবকণ্ঠ/এইচকে 




Loading...
ads





Loading...