কাউন্সিলর রাজীবের উত্থান যেভাবে


poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০৬:১৩

তারেকুজ্জামান রাজীব। প্রায় এক যুগ আগে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় বাবার সঙ্গে টুকটাক রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন তিনি। পরে একই এলাকায় টং দোকানদারও ছিলেন রাজীব। এক কক্ষের বাসায় পাঁচ হাজার টাকায় ভাড়া থাকতেন। বছর আটেক আগে নাম লেখান মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগে। সিনিয়র নেতাদের ম্যানেজ করে দ্রুতই বনে যান নেতা। ২০১৫ সালের ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে তরুণ কাউন্সিলর নির্বাচিত হন রাজীব। এরপরই যেন পেয়ে যান আলাদিনের চেরাগ। যুবলীগের সাইনবোর্ড আর কাউন্সিলরের পদটি ব্যবহার করে বর্তমানে তিনি শত কোটি টাকার মালিক।

মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটি এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীর মাধ্যমে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন তরুণ রাজীব। বিগত ৫ বছরে ৮-১০টির বেশি নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনেছেন। যার মধ্যে মার্সিডিজ, বিএমডবিøউ, ক্রাউন প্রাডো, ল্যান্ডক্রুজার ভি-৮, বিএমডবিøউ স্পোর্টস কার রয়েছে। গুলশান ও মোহাম্মদপুরে অন্তত ৫টি ফ্ল্যাট রয়েছে আঙ্গুল ফুলে বটগাছ বনে যাওয়া রাজীবের।
কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবের। শনিবার রাতে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। উদ্ধার করা হয় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, বিদেশি মদ, পাঁচ কোটি টাকার চেক ও নগদ টাকা। পরে গভীর রাতে রাজীবের মোহাম্মদপুরের বাসায় ও অফিসে তল্লাশি চালায় র‌্যাব। এই আলোচিত কাউন্সিলরকে গ্রেফতারের পর তার উত্থান, অঢেল অবৈধ সম্পদ ও নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের তথ্য বেরিয়ে আসে। এদিকে শনিবার রাতেই আলোচিত-সমালোচিত কাউন্সিলর রাজীবকে দল থেকে বহিষ্কার করে যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।

জানা যায়, মোহাম্মদপুর এলাকায় যুবলীগের রাজনীতি দিয়েই রাজীবের রাজনৈতিক জীবন শুরু। অল্পদিনেই নেতাদের সান্নিধ্যে মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহŸায়ক পদ বাগিয়ে নেন তিনি। থানা আওয়ামী লীগের বীর মুক্তিযোদ্ধা নেতাকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করায় বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। পরে কেন্দ্রীয় যুবলীগের এক নেতাকে ১ কোটি টাকা দিয়ে উল্টো তিনিই হয়ে যান ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। স্থানীয় সূত্র মতে, মোহাম্মদপুর এলাকার একজন সাবেক এমপি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের ‘কথিত’ ছেলে রাজীব। মোহাম্মদপুরে রাজত্ব গড়ে তুলেছেন তিনি। এলাকায় নিয়ন্ত্রণ করেন চাঁদাবাজি। বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি স্ট্যান্ড, কাঁচাবাজার ও ফুটপাতই তার চাঁদা তোলার মূল উৎস।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব নিজের এলাকায় রাজত্ব গড়ে তুলেছেন। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, টেন্ডারবাজি, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ আর মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত করেছেন তার সাম্রাজ্য। ২০১৫ সালের কাউন্সিলর নির্বাচনে তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। দলীয় প্রার্থী ও মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি শেখ বজলুর রহমানকে হারিয়ে নির্বাচিত হন তিনি। এরপর আর তাকে পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। বিগত মাত্র ৫ বছর ব্যবধানে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে তরুণ এই কাউন্সিলর।

জানা গেছে, এক সময় মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির এক কক্ষের বাসায় ভাড়া থাকতেন তারেকুজ্জামান রাজীব। তিনি এখন থাকেন নিজের ডুপ্লেক্স বাড়িতে। মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ১ নম্বর সড়কের ৩৩ নম্বর প্লটে রাজীবের আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ি। ওই বাড়িটির নিচে একটি গুপ্ত কক্ষ রয়েছে যেখানে রাজীব গোপনীয় কিছু কাজ করতেন। পাঁচ কাঠা জমির ওপর বাড়িটি করতে খরচ হয়েছে প্রায় ছয় কোটি টাকা। অথচ তার দৃশ্যমান কোনো আয় নেই, কোনো ব্যবসা নেই। মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম ও দুবাইতে তার বিনিয়োগ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র বলছে, কাউন্সিলর হওয়ার পরই যুবলীগের এই নেতার অবস্থা বদলে যেতে থাকে খুব দ্রুত। সবসময় তার চলাচলের বহরে থাকে শতাধিক নেতাকর্মী। তিনি চড়েন নিত্যনতুন অত্যাধুনিক গাড়িতে। তার ইশারাতেই স্থানীয় রহিম ব্যাপারী ঘাটের ৩৩নং ওয়ার্ড যুবলীগের অফিসটিও দখল করা।
গোয়েন্দা ও স্থানীয় সূত্র বলছে, গুলশান ও মোহাম্মদপুরে অন্তত পাঁচটি ফ্ল্যাট রয়েছে রাজীবের। কমিশনার হওয়ার পরপরই তিনি বাহিনী দিয়ে প্রচারণায় বনে যান স্বঘোষিত ‘জনতার কমিশনার’। তবে কথিত এই ‘জনতার কমিশনার’ এর বিরুদ্ধে জনতার কাছ থেকেই মাসে কোটি টাকা চাঁদা তোলার অভিযোগ রয়েছে। বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি স্ট্যান্ড, ফুটপাতই তার চাঁদা তোলার মূল উৎস।

অভিযোগ রয়েছে, মোহাম্মদপুরে যুবলীগ কর্মী তছির উদ্দিন হত্যা মামলার আসামিরা কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবের ঘনিষ্ঠ। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের জেরে তছিরকে খুন করা হয়। কাউন্সিলর হওয়ার পর রাজীবের লোকজন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা পাইন আহমেদকে মারধর করে। ঘটনাটি প্রধানমন্ত্রী জানার পর মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম-আহŸায়কের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয় রাজীবকে। কিন্তু পরে আবার তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এমনকি তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক পদ লাভ করেন।

অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে গ্রেফতার ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মোহাম্মদপুরের বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা তারেকুজ্জামান রাজীবের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা দায়ের করেছে র‌্যাব। গতকাল রোববার রাতে ভাটারা থানায় মামলা দুটি দায়ের করা হয়। এর আগে সন্ধ্যার পর তাকে ওই থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার সহকারী পরিচালক সিনিয়র এএসপি মিজানুর রহমান।

এর আগে শনিবার রাত ১১টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এক বন্ধুর বাড়ি থেকে কাউন্সিলর রাজীবকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অবৈধভাবে জমি দখলের অভিযোগে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এ সময় তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, তিন রাউন্ড গুলি, একটি ম্যাগজিন, ৭ বোতল বিদেশি মদ, একটি পাসপোর্ট ও ৩৩ হাজার নগদ টাকা জব্দ করা হয়। পরে তাকে নিয়ে মোহাম্মদপুরের বাসায় অভিযান চালালো হয়। ওই বাসা থেকে ৫ কোটি টাকার বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই জব্দ করেছে র‌্যাব। একইসঙ্গে জমিজমার বিভিন্ন কাগজপত্রও জব্দ করা হয়েছে। একই সময় আলামত ধ্বংস এবং কাজে অসহযোগিতার কারণে রাজীবের সহযোগী (পিও) সাদেককে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

মানবকণ্ঠ/টিএইচ




Loading...
ads





Loading...