বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি পক্ষ-বিপক্ষ


poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ০১:০৩,  আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ১৪:৩৯

শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এনিয়েও দেখা দিয়েছে মত-দ্বিমত। ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি পুরোপুরি বন্ধের পক্ষে নন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ ও সাবেক ছাত্রনেতারা। তারা মনে করেন, শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতি দরকার। তবে বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি অনেকটা লক্ষ্যভ্রষ্ট বলেও মনে করেন অনেকে। যে কারণে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে বাড়ছে বিতৃষ্ণা। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতাদের দাপটে ক্যাম্পাসে আসতে পারেন না বিরোধী ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা। নেই সহাবস্থানও। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র নেতারা ছাত্রদের অধিকার আদায়ের চেয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকেই প্রাধান্য দেন বেশি। তাই ক্যাম্পাসে সব দলের জন্য সহাবস্থান নিশ্চিতকরণের বিশ্লেষকদের। তারা মনে করেন, সহাবস্থান নিশ্চিত ও ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকলেই ক্যাম্পাসে হানাহানি কমে যাবে।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার ফাহাদ (২১)। এরই জের ধরে গত রোববার রাতে ক্যাম্পাসে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর রুমে তাকে বর্বরভাবে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ২০০২ সালে বুয়েটে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে ছাত্রদল নেতাদের গুলিতে নিহত হন সাবেকুন নাহার সনি। এখানেই শেষ নয়। স্বাধীনতার পর গত চার দশকে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত দেড়শ’ ছাত্র প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ১ হাজার শিক্ষার্থী।

সূত্রমতে, গত চার দশকে দেশের চারটি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন সব মিলিয়ে ১২৯ জন ছাত্র। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়জন ছাত্র মারা যান।
বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে ছাত্রলীগের সঙ্গে প্রতিপক্ষ বা নিজেদের মধ্যে প্রায় ৫শ’ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব সংঘর্ষে মোট ৭১ জন মারা যান। এর মধ্যে ৫৫ জনই নিহত হন নিজেদের কোন্দলে। বিএনপি আমলেও একইভাবে নিজেদের মধ্যে কোন্দলে জড়িয়ে ছিল ছাত্রদল। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর পরই বিশ্ববিদ্যালয় প্রথা মেনে তদন্ত কমিটি করেছিল। থানাতেও মামলা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ডামাডোলে হারিয়ে গেছে এসব মামলা। তাই বিচারের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের আহাজারি কখনোই শেষ হয় না।

ছাত্র রাজনীতির এই গৌরবের ধারা স্বাধীন বাংলাদেশেও ছিল। সেটি এখন সেখানে উল্টো হয়ে গেছে। ক্যাম্পাসগুলোয় নেই কোনো ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতাদের দাপটে ক্যাম্পাসে আসতে পারেন না বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। নেই সহাবস্থানও। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র নেতারা ছাত্রদের অধিকার আদায়ের চেয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকেই প্রাধান্য দেন। ফলে রাজনীতি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে বিতৃষ্ণা। শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর আবারো ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি তুলেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। আন্দোলনের এ লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বুয়েট ক্যাম্পাসে সকল ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

তবে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার পক্ষে নন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদসহ সাবেক ও বর্তমান ছাত্রনেতারা। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ক্যাম্পাসে যদি ভিন্নমত না থাকে তাহলে তো আমরা ভয়ঙ্কর অন্ধকারের দিকে যাচ্ছি। এটি খুবই ভয়ঙ্কর। অনেক বছর বুয়েট থেকে এমন খবর আমরা পাইনি। সেখানে শান্ত পরিস্থিতি ছিল। হলের মধ্যেই ছেলেটি খুন হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে। একই (আবাসিক) হলে আছে। তাকে এভাবে হত্যা করলÑ সে তো ফেসবুকে তার মত প্রকাশ করেছে। একটা মত তো দিতেই পারে। নানা জনের নানা মত থাকবেই।

তিনি বলেন, এগুলো প্রমাণ করে আমাদের সমাজে টলারেন্স এখন নিম্ন পর্যায়ে চলে গেছে। আরেকটি কারণ আমি সব সময়ই মনে করি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরিবেশটা মোটেই সুস্থ না। এর কারণ হচ্ছে, এখানে ভিন্নমত নেই। এখানে যেটা হয় সেটা হলো যে, সরকারি দলের আধিপত্য, তারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। যদি সেখানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকত তাহলে এমন ঘটনা ঘটত না।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গত ২৮ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো নির্বাচন হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে নির্বাচন হলোÑ এটাও যে খুব একটা পারফেক্ট হয়েছে তা কিন্তু নয়। আমি মনে করি সমাজে তো অসহিষ্ণুতা আছেই। ভিন্নমত সহ্য করাই হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি ভিন্নমত না থাকে তাহলে তো ভয়ঙ্কর অন্ধকারের দিকে যাচ্ছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা শাস্তি দেয়া এগুলোর মাধ্যমে প্রতিকার হবে না। ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশের মাধ্যমে সহিষ্ণুতা গড়ে উঠবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো সমাজের মডেল। সেখানে এ রকম ঘটনা ঘটলে আমাদের আর আশা করার কিছুই থাকে না।

ঢাকাসুর সাবেক ভিপি ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, আবরার হত্যার জন্য ছাত্র রাজনীতিকে কোনোভাবেই দায়ী করা যায় না। বরং ছাত্র রাজনীতি না থাকার কারণেই আবরার হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। এই জন্য সমাধান হল- ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ নয়, দুর্বৃত্তায়িত শক্তিকে অপসারণ করে এবং ছাত্র রাজনীতি স্বাধীনভাবে করতে দিতে হবে। ছাত্র রাজনীতি কমানো নয়, তা উন্মুক্ত করে দেয়াই হবে সমাধান।
বুয়েটে ছাত্র হত্যার চেয়ে ‘বড় বড় অপরাধ’ জাতীয় রাজনীতিতে চলছে মন্তব্য করে এই বাম নেতা প্রশ্ন করেন, ‘তাহলে কি জাতীয় রাজনীতি বন্ধ করে দিতে হবে? মাথাব্যথা হলে কি মাথা কেটে দিতে হবে?’

ছাত্র রাজনীতি নয়, এর নামে সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব বন্ধ চান ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক এ সভাপতি। তিনি আরো বলেন, বুয়েটে এমনিতেই ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়ে আছে, নতুন করে রাজনীতি নিষিদ্ধ করাটা ‘একটা মুরগি দ্বিতীয় বার জবাই করার’ মতো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন মানবকণ্ঠকে বলেন, এখন যারা শিক্ষার্থী, দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনীতির চেয়ে অপরাজনীতির কুফলই তারা বেশি দেখেছেন। রাজনীতি বলতে তারা প্রধানত দেখেছেন, সন্ত্রাস-দখলদারি-চাঁদাবাজি, জুলুম করে মিটিং-মিছিলে নিয়ে যাওয়া এবং সর্বোপরি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতি যে তাদের অধিকার আদায়ে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, সাহসের সঙ্গে নিজেদের মনোভাব ব্যক্ত করতে সহায়তা করবে; এমন পরিবেশ তারা কখনো পাননি। তাই আমার মনে হয়, রাজনীতি বন্ধ করা’ বলতে তারা বোঝাচ্ছেন, দলবাজি ও লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে অন্যের অধিকার হনন বন্ধ করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার মানবকণ্ঠকে বলেন, বুয়েটের ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করাকে আমি নেতিবাচকভাবে দেখি। তবে ছাত্র রাজনীতিতে বড় ধরনের সমস্যা চলছে সেটা থেকে উত্তরণের দরকার। আবার ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত সকল ছেলেমেয়ে দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে জড়িত নয়। সমস্ত সংগঠন সন্ত্রাস করে এটাও ঠিক নয়। বাংলাদেশের একটি মহল দীর্ঘদিন থেকে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার জন্য। কিন্তু আমি যদি ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল অতীতের কথা বাদ দেই তাহলে ভবিষ্যৎ রাজনীতির তৈরির যে প্রক্রিয়া যেগুলো আমাদের বন্ধ করে দেয়া সমীচীন নয়। ক্যাম্পাসে মাঝে মাঝে যেসব ঘটনা ঘটছে সেগুলো সাধারণ মানুষও সমর্থন করে না। তাই ছাত্র রাজনীতির নাম ধারণ করে যে দুর্বৃত্তরা ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের যে কোনোভাবেই দমন করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) নুরুল হক জানান, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণেই ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে। তবে সামগ্রিকভাবে ছাত্র রাজনীতি নয়, বরং সন্ত্রাসী ও দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধের জন্য সবার দাবি তোলা উচিত।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় জানান, বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হলে মৌলবাদী, জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। এছাড়া প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতা বেড়ে যাবে। যা মোটেও শিক্ষার্থীদের জন্য কল্যাণকর হবে না। ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক অনিক রায় জানান, বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, এটি একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। আর এটির জন্য ছাত্রলীগই দায়ী থাকবে। কারণ তারাই ক্যাম্পাসগুলোতে দখলদারিত্ব এবং সন্ত্রাসবাদী রাজনীতি চালু করেছে। বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হলে প্রশাসনের স্বৈরাচারিতা বাড়বে।

মানবকণ্ঠ/টিএইচ




Loading...
ads





Loading...