সিটিংয়ের নামে রাজধানীতে ‘ভাড়া সন্ত্রাস’ চরমে


poisha bazar

  • হাসান মাহমুদ রিপন
  • ১১ অক্টোবর ২০১৯, ০০:৫৭

রাজধানীতে সিটিংয়ের নামে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় থামছে না। সিটিং, গেটলক, স্পেশাল ও বিরতিহীন নাম দিয়ে চলেছে এই ভাড়া আদায়। যাত্রীদের এক রকম জিম্মি করেই কোনো কোনো রুটে নেয়া হচ্ছে চারগুণ ভাড়া। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে এমন ভাড়া আদায়কে অনেকেই আখ্যায়িত করেছেন ‘ভাড়া সন্ত্রাস’। বাড়তি ভাড়া নিলেও যাত্রী বহন করছে লোকালের মতোই। আবার কেউ এর প্রতিবাদ করলে পরিবহন শ্রমিকের হাতে হতে হয় নাজেহাল। দীর্ঘদিন এভাবে ভাড়া সন্ত্রাস চললেও এসব দেখার যেন কেউ নেই। যদিও এর দায় নিতে নারাজ বাস মালিক সমিতি।

সমস্যা নিরসনে ফ্র্যাঞ্জাইজিভিত্তিক বাস পরিচালনার যে সমাধান বাতলে দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা, সেটিও ২০২০ সালের ডিসেম্বরের আগে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দেখছে না খোদ বিআরটিএ। সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর বেশিরভাগ বাসই সিটিং সার্ভিসের নামে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। এসব বাসের বেশির ভাগই রংচটা, পুরনো এমনকি যাত্রীদের বসার ভালো সিটও নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাঁড়িয়েও যাত্রী বহন করছে। এ নিয়ে প্রায়ই যাত্রীদের সঙ্গে চালক ও হেলপারের কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতিও হচ্ছে। ভাড়া নৈরাজ্য দূর করতে দ্রুত ফ্র্যাঞ্জাইজিভিত্তিক বাস চালুর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, বাস রুট ফ্র্যাঞ্জাইজি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারলে শুধু ভাড়ার নৈরাজ্য কমবে না, সবদিকে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
রাজধানীর বিভিন্ন রুটে সরেজমিন দেখা যায়, বাসে ওঠার আগে ও পরে যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হচ্ছে। প্রত্যেক বাসের জন্য সিট সংখ্যা অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া নিলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবুও কোনো কিছুতেই যেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না ভাড়া সন্ত্রাসসহ পরিবহন খাতের নানা অনিয়ম।

আইনের তোয়াক্কা না করে সিটিং, গেটলকের নামে দেদার চলছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়। আর এ ভাড়া সন্ত্রাস করতে তারা দোহাই দিচ্ছে ‘ওয়েবিল’ পদ্ধতির। এ পদ্ধতিতে ভাড়া নির্ধারণে বেশি ভোগান্তিতে কম দূরত্বের যাত্রীরা। কারণ দূরত্ব যাই হোক চেকার যাত্রী সংখ্যা উল্লেখ করার পর সব যাত্রীকে গুণতে হয় একই ভাড়া। এই ওয়েবিল পদ্ধতি শুরু করে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করলেও সিটের চেয়ে বাড়তি যাত্রী না নেয়ায় অনেকেরই বাড়তি ভাড়া নেয়ায় সমর্থন ছিল। কিন্তু কিছুদিন যেতে-না যেতেই বাড়তি ভাড়া ঠিক থাকলেও যাত্রী নিচ্ছে লোকাল বাসের মতোই। তার ওপর ভাড়া আদায়ের সময় দোহাই দেয় ওয়ে বিলের কিন্তু যাত্রী তোলে লোকাল বাসের মতো গাদাগাদি করে। বিগত ২০১৭ সালের এপ্রিলে সিটিং সার্ভিস বন্ধের সিদ্ধান্ত হলেও পরে আর তা বাস্তবায়ন হয়নি। তবে সিটিং সার্ভিসের নামে যাত্রী হয়রানির দায় নিতে রাজি নয় মালিক সমিতি।

সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, আপনারা (সাংবাদিকরা) শুধু অনিয়ম তুলে ধরতে চাইছেন, ভালো কিছুর দিকে দৃষ্টি কেন দিচ্ছেন না। আমরা বলতে চাচ্ছি যে, অনিয়ম ছিল বিধায় তখন সেটা বন্ধ করতে চেয়েছিলাম। ওই সময় বিআরটিএ দায়িত্ব নিল, গেট লক সার্ভিস বন্ধ হবে না, চলবে আমরা এটা নিয়ে ভেবে দেখব।

জানা গেছে, আরটিসিভুক্ত রুটের সংখ্যা ৩৫৯টি। এর মধ্যে কয়েকটি রুটে যাত্রী কম থাকায় সেসব রুটে তেমন একটা গাড়ি চলে না। বাস মালিকদের হিসেবে এসব এলাকায় পাঁচ হাজারের কিছু বেশি বাস ও মিনিবাস চলাচল করে। আর শ্রমিক সংগঠনের মতে, চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের সংখ্যা কম-বেশি চার হাজার ৭০০টি। তবে বিআরটিএর তথ্যমতে এসব এলাকায় বাস পাঁচ হাজার ২৪৭টি ও মিনিবাস দুই হাজার ৬৯২টি। সব মিলিয়ে বাস-মিনিবাসের সংখ্যা সাত হাজার ৯৩৯টি।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায় : রাজধানীর বনানী থেকে ইসিবি চত্বর। বনানী ফ্লাইওভার দিয়ে এ রুটের দূরত্ব ৩ কিলোমিটারের মতো। রাজধানীতে কিলোমিটার প্রতি বিআরটিএ নির্ধারিত বাস ভাড়া ১ টাকা ৭০ পয়সা হিসেবে বনানী থেকে ইসিবি চত্বর এতটুকু রাস্তার ভাড়া ৫ টাকা ১০ পয়সা। কিন্তু এ রুটে চলাচলকারী বাসে এ দূরত্বের জন্যই গুণতে হচ্ছে কমপক্ষে ২০ টাকা। আবার কালশী থেকে বিশ্বরোড। বনানী (এমইএস) ফ্লাইওভার দিয়ে পার হওয়া এ রুটের দূরত্ব ৫ কিলোমিটারের মতো।

কালশী থেকে বিশ্বরোড এতটুকু রাস্তার ভাড়া সাড়ে ৮ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এ রুটে চলাচলকারী যে কোনো বাসে এ দূরত্বের জন্যই গুণতে হচ্ছে কমপক্ষে ৩০ টাকা। এদিকে বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ১.৭০ টাকা, মিনিবাস ১.৬০ টাকা। এ ছাড়া বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৭ টাকা, মিনিবাসের ৫ টাকা।
বাড়তি ভাড়া নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে যাত্রীদের প্রায়ই কথা কাটাকাটি হচ্ছে। মানসম্মান হারানোর ভয়ে অনেক যাত্রী প্রতিবাদ করতে দ্বিধা করেন।
বনানীতে একটি বেসরকারি কোম্পানির ঊর্ধতন কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ বলেন, আজিমপুর বা নিউমার্কেট থেকে ভিআইপি ২৭ নামের গাড়িতে উঠে ফার্মগেট, বনানী বা উত্তরা যেখানেই নামি না কেন ৫০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। এটা কিসের নিয়ম? নিউমার্কেট থেকে ফার্মগেটের ভাড়া ৫০ টাকা হয় কোন যুক্তিতে? আমি বনানী নামলে কেন উত্তরার ভাড়া দেব।

সিটিংয়ের নামে প্রতারণা : গেটলক, স্পেশাল সার্ভিস, কম স্টপিজ, সিটিং সার্ভিস, হাফ পাস নেই লিখে যে যার ইচ্ছামতো বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। লেখার সঙ্গে কোনো মিল নেই সার্ভিসের। এর নিয়ন্ত্রণ নেই কারো হাতে, নেই জবাবদিহিতাও। সব মিলিয়ে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের কাছে অসহায় যাত্রীরা। ঢাকার বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসের মালিকরা এসব নাম দিয়ে সরকার-নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া নিচ্ছেন। মানা হচ্ছে না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়ার নিয়ম।

বিআরটিসি বাসে বেশি ভাড়া : রাজধানী ঢাকার বেশিরভাগ বাসে নেই ভাড়ার তালিকা। মিরপুর-মতিঝিল রুটে চলাচলকারী রাষ্ট্রায়ত্ত বিআরটিসির বাসে উঠেও দেখা যায় ভাড়ার তালিকা নেই। এই সরকারি বাসেও ভাড়া বেশি নেয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে বেশ কয়েকটি রুটে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত যত টাকা বা পয়সা ভাড়া বাড়ার কথা, তার চেয়ে ২০ গুণ পর্যন্ত বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে প্রতিটি গণপরিবহনে। স্বল্প দূরত্বের কোনো ভাড়া মানছেন না মালিকরা।

খিলগাঁওয়ের যাত্রী মানিক জানান, বিআরটিসির বাসে সবচেয়ে বেশি নাজেহাল হতে হয় যাত্রীদের। তাদের বাসে ১০ টাকার নিচে কোনো ভাড়া নেই। জায়গায় জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। প্রতিবাদ করলে যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের অধিকাংশ বাস লিজে চালানো হয়। যার নামে লিজ নেয় তিনি আবার অন্যজনকে চুক্তিতে দেয়। অনেক সময় চুক্তিতে নেয়া ব্যক্তি আবার বাসের চালককে আবারো চুক্তিতে দেয়। যার ফলে প্রত্যেকেই নিজ নিজ লাভের কথা ভেবে কাজ করে বলে বাড়তি ভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রে তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

এ ছাড়া রাজপথে দেখা যাচ্ছে কম দূরত্বে যাত্রীদের গাড়িতে ওঠানো হচ্ছে না। কারণ জিজ্ঞেস করলে কখনো উত্তর দেয়, কখনো দেয় না। যদিও বা ওঠানো হয় ভাড়া আদায় করে চার থেকে পাঁচগুণ। এ ছাড়া এখন অনেক বাসই নির্দিষ্ট স্থানে চলে সিটিং। এরপর চলে লোকাল হিসেবে। বিভিন্ন রুটে এসব ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে।
যদিও ২০২০ সালের ডিসেম্বরের আগে এ পদ্ধতিতে যাওয়ার কোনো আশা দেখাতে পারছে না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ।

বিআরটিএর পরিচালক মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, আগামী ২০২০ সাল নাগাদ ২২টা রুটে এ বাস পরিচালনা করা হবে। এ লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজধানীর ৭০ ভাগ গণপরিবহন সর্বনিম্ন ভাড়া আদায় করছে ১০ টাকা। ২০ ভাগ গাড়ি আদায় করছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। অর্থাৎ ১০ ভাগ গাড়ি নিয়ম অনুযায়ী ৫ বা ৭ টাকা সর্বনিম্ন ভাড়া আদায় করছে।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী হয়রানি বেড়ে গেছে। বাসের সর্বনি¤œ ভাড়া ধার্য করলেও সঠিক ভাড়া আদায় করছেন না কেউই। যেমন ধরেন গুলিস্তান থেকে রামপুরা ভাড়া হচ্ছে ৮ টাকা। কিন্তু গণপরিবহনের চালকরা নিচ্ছেন ২০ টাকা। আর টাকা কম দিলে যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন তারা। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে আপনাদের কোনো পদক্ষেপ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরাই প্রথম গণশুনানির আয়োজন করেছি। তবে এ বিষয়টি নিয়ে আমরা প্রতিবাদ করেছি মিডিয়ার মাধ্যমে। যখন মিডিয়ায় এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়, তখন কর্তৃপক্ষের এটি নজরে আসে। তখন তারা ব্যবস্থা নেয়।’

তিনি বলেন, টিকিট অব্যবস্থাপনা, সড়ক অব্যবস্থাপনাসহ যাত্রী চলাচলে নানা ক্ষেত্রে গলদ থাকায় যাত্রীরা পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছে। ভাড়া নৈরাজ্যে ও যাত্রী হয়রানি প্রতিরোধে বিআরটিএ ও বিআইডবি্লউটিএর পক্ষ থেকে মালিক-শ্রমিকদের নিয়ে গতানুগতিক পদ্ধতিতে ভিজিল্যান্স টিম বা মনিটরিং কমিটি গঠন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে কোথাও তাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্ভোগের শিকার যাত্রীরা রাস্তায় কারো সহযোগিতা পাচ্ছে না বলে দাবি করেন মোজাম্মেল হক।

মানবকণ্ঠ/টিএইচ




Loading...
ads




Loading...