নাটের গুরু অমিত-রবিন আগের রাতেই নির্যাতনের নির্দেশ


poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ১১ অক্টোবর ২০১৯, ০০:৫৪

বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদের ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে প্রথম প্রতিক্রিয়া দেখান ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহা। পরে তিনি কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে বিষয়টি দেখান এবং আবরারকে শিবির হিসেবে প্রচারণা চালান। গত শনিবার বিকেলে কুষ্টিয়া শহরের বাসায় থেকে আবরার এ স্ট্যাটাস দেন। পরদিন রোববার দুপুর থেকে ফাহাদ হলে ফিরেছে কিনা খোঁজ নেন অমিত সাহা ও মেহেদী হাসান রবিনসহ কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা।

এ নিয়ে বুয়েট ছাত্রলীগের সিক্রেট মেসেঞ্জার গ্রুপে খুনিদের কথোপকথন হয়। যেখানে ফাহাদকে পিটিয়ে হলছাড়া করার নির্দেশ দেয়া হয়। আর রোববার শেষ বিকেলে বাড়ি থেকে ফেরার পর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ২০১১ ও ২০০৫ নম্বর কক্ষে আবরার ফাহাদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতনের নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা ইফতি মোশররফ সকাল, অনিক সরকার ও মেহেদী হাসান রবিন। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে অনিক ও সকাল আবরার ফাহাদকে পেটাতে পেটাতে ক্রিকেট স্টাম্প ভেঙে ফেলেন। ঘটনার রাতে অমিত, সকাল ও অনিকসহ অন্তত তিনজন মদ্যপ ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েট ক্যাম্পাসে আলোচনার শীর্ষে থাকা বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ১৬তম ব্যাচের ছাত্র অমিত সাহা ও ফাহাদের এক সহপাঠীসহ আরো তিনজনকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল সকালে সুবজবাগ এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এ নিয়ে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় ছাত্রলীগের ১৬ নেতাকর্মী গ্রেফতার হলেন। ঘটনার রাতে এক পর্যায়ে দুর্গাপূজা মণ্ডপে ঘুরতে যান অমিত। সেখানে থেকে মদ্যপ হয়ে হলে ফিরে আসেন বলে সূত্র জানায়। ডিবি সূত্র জানায়, গ্রেফতারকৃত ইফতি মোশাররফ সকাল ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গতকাল বিকেলে ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইফতি মোশররফ আদালতে এই স্বীকারোক্তি দেন। অন্যরাও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তাদের দাবি হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত ছিল না। তারাও আজ-কালের মধ্যে আদালতেও স্বীকারোক্তি দিতে পারেন।

একই সূত্র মতে, রোববার রাতে বুয়েট শেরেবাংলা হলে আবরার ফাহাদকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার পর লাশ সরিয়ে ফেলতে ডাক্তার মাসুক এলাহী ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানকে চাপ দেন হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল। কিন্তু খুনের বিষয়টি পুলিশ কেস হওয়ায় তারা তাতে রাজি হননি। সে কারণে লাশ সরিয়ে ফেলার চেষ্টা সফল হয়নি। ফাহাদের ওপর হামলাকারীরা ছাত্রলীগ নেতা রাসেলের অনুসারী।
এদিকে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুলিশ আদালতে দাখিল করবে বলে গতকাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। অন্যদিকে পুলিশের নিষ্ঠার কারণেই ফাহাদ হত্যার আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে মন্তব্য করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিট প্রধান মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঘটনার মোটিভ সম্পর্কে জানতে আমাদের আরো কয়েকদিন সময় লাগবে। বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড অনেকগুলো ঘটনার সমষ্টি। একটিমাত্র কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে, তা এখনই বলা যাবে না।

এদিকে মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদের গতকাল চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ করেছেন বুয়েটের বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। শনিবারের মধ্যে তাদের ১০ দফা দাবি মেনে না নিলে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষাসহ সকল একাডেমিক কাযক্রম বন্ধ করে দিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। বেলা ১২টার পর বুয়েট ক্যাম্পাসের সামনের সড়ক অবরোধ করে আন্দোলনরত ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তিথি বলেন, ‘ডিএসডাবি্লউ স্যার, প্রভোস্ট স্যার ও শিক্ষক সমিতির স্যারেরা আমাদের কথা শুনেছেন। তারা কথা বলেছেন। কিন্তু ভিসি সাইফুল ইসলাম স্যার আপনি কেন আসছেন না? আমরা আপনার কথা শুনতে চাই। আপনি বলবেন আমরা শুনবো। স্যার আপনি আসুন’।

এ ছাড়া ফাহাদ হত্যার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস গতকাল উত্তাল ছিল। এদিন খুনিদের বিচারের দাবিতে পদযাত্রা, মৌন মিছিল ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বুয়েট শিক্ষার্থীরা চার দিন ধরে যে ১০ দফা দাবি আদায়ে আন্দোলন করছেন, তার একটি হল ছাত্র সংগঠনের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পদযাত্রা কর্মসূচির শুরুর আগে ছাত্র সংসদের ভিপি নুরুল হক নূর বলেছেন, ছাত্র রাজনীতি নয়; বরং শিক্ষাঙ্গনে ক্ষমতাসীনদের ‘গুণ্ডামি’ বন্ধ করতে হবে। ছাত্র রাজনীতির স্বার্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালুর দাবি জানিয়েছেন তিনি।

হত্যার মোটিভ পরিষ্কার নয়: বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের মোটিভ এখনো পরিষ্কার নয় মন্তব্য করে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, পুলিশের আন্তরিকতার কারণেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে অধিকাংশ আসামিকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। তিনি জানান, মামলার এজাহারে নাম না থাকলেও তদন্তকালে অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গতকাল আরো ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

আলোচিত অমিত গ্রেফতার: মনিরুল ইসলাম বলেন, নতুন করে গ্রেফতারকৃতরা হলেন, ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহা, নিহতের রুমমেট মিজানুর রহমান ও এজাহারভুক্ত আসামি হোসেন মো. তোহা। এ নিয়ে মোট ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হলো। এর মধ্যে এজাহারবহির্ভূত গ্রেফতার ৩ জন হলো অমিত সাহা, মিজানুর রহমান ও শামসুল আরেফীন রাফা। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের কাছে জানতে চাওয়া হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া স্ট্যাটাস বা শিবির সন্দেহে আবরার ফাহাদকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে কিনা। এর জবাবে তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি অনেক ঘটনার কারণের মধ্যে একটি কারণ হতে পারে। এটিই একমাত্র কারণ কিনা, তা এখনই বলা যাবে না। আরো কারণ থাকতে পারে।

অমিত সাহার ব্যাপারে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, একজন মানুষ ঘটনাস্থলে থেকেও ঘটনা সংঘটিত করতে পারে, আবার দেখা যায় ঘটনাস্থলে না থেকেও করতে পারে। প্রাথমিক তদন্তে আমাদের কাছে মনে হয়েছে, অমিত সাহা ঘটনাস্থলে ছিল না। তবে এই ঘটনায় তার দায়-দায়িত্ব রয়েছে। তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়ার কারণেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তিনি জানান, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা ঘটনার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চাইছে। তাদের দেয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে তদন্তকাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। কোনো মেসেজ পেয়ে পুলিশ হলে গিয়েছিল-সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে মনিরুল বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, কেউ একজন পুলিশকে জানিয়েছে ভেতর একটি গোলমাল হচ্ছে। সেই মেসেজে টহল পুলিশ গিয়েছিল। কিন্তু হলের বাইরে থেকে ভেতরে কী হয়েছে তা বোঝা যায়নি।

নির্যাতনের নেতৃত্বে ছিল অনিক-সকাল-রবিন : পুলিশ সূত্র জানায়, পুলিশের কাছে আসামিদের দেয়া জবানবন্দি বলছে, আবরার ফাহাদকে ঘটনার রাতে ‘শিবির’ আখ্যা দিয়ে দফায় দফায় পেটানো হয়। টানা প্রায় ৬ ঘণ্টা চলে এ নির্যাতন। নির্যাতনের একপর্যায়ে ঘাতকরা তার কাছে জানতে চায়, বুয়েটে কারা কারা শিবির করে। এ সময় প্রাণ বাঁচাতে ফাহাদ কয়েকজনের নাম বলেন। ছাত্রলীগ নেতারা তার দেয়া নামগুলোর তথ্য যাচাই করে। এতে দেখা যায়, তাদের সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এরপর আবরার ফাহাদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। ছাত্রলীগ নেতা অনিক সরকার ও ইফতি মোশররফ সকাল পেটাতে পেটাতে ভেঙে ফেলে ক্রিকেট স্টাম্প। রোবাবার রাত ৮টা থেকে সোয়া ১টা পর্যন্ত বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ ও ২০০৫ নম্বর রুমে দফায় দফায় ফাহাদের ওপর এভাবে নিষ্ঠুর নির্যাতন চলে। এরপর রাত আড়াইটার পর তার নিস্তেজ দেহ নিয়ে ছোটাছুটি করেন ঘাতকরা।

পুলিশ ও ছাত্রলীগ সূত্র জানায়, প্রথমে মারধর শুরু করেন বুয়েট ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন। পুরো নির্যাতনে সক্রিয় অংশ নেন ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশররফ সকাল, উপ-দফতর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ, সদস্য এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মুনতাসির আল জেমি, ছাত্রলীগ কর্মী সাদাত, হোসেন মোহাম্মদ তোহা ও তানভীর আহম্মেদসহ আরো বেশ কয়েকজন।
একই সূত্র মতে, রাত ১১টার পর দ্বিতীয় দফায় ফাহাদকে মারপিট শুরু হয় মুন্নার ২০০৫ নম্বর কক্ষে। তখন দফায় দফায় নির্যাতন করা হয়। এ সময় সব চেয়ে বেশি মারমুখী ছিলেন অনিক। এর আগে রোববার রাত ৮টার দিকে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের নিচতলায় ১০১১ কক্ষের আবাসিক ছাত্র আবরার ফাহাদকে মুনতাসির আল জেমি ও এহতেশামুল রাব্বি তানিম দোতলায় ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নেন। এ সময় ফাহাদকে প্রথমে জেরা করেন ছাত্রলীগ নেতা রাসেল, সকাল ও অমিতসহ বেশ কয়েকজন। এ সময় তারা ফাহাদের মোবাইল, ল্যাপটপ সবকিছু পরীক্ষা করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আবরারকে শিবিরকর্মী এটা স্বীকার করার জন্য চাপ দেয়া হয়।

প্রথম স্বীকারোক্তি সকালের: বুয়েটছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতার আসামিদের মধ্যে প্রথম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ইফতি মোশাররফ সকাল। বুয়েটের বায়ো মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ইফতি বুয়েট ছাত্রলীগের উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ছিলেন। পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, গতকাল দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি মহানগর হাকিম সাদবির ইয়াসির আহসান চৌধুরীর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি নেয়ার পর বুয়েটছাত্র ইফতিকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন বিচারক।

মানবকণ্ঠ/টিএইচ




Loading...
ads




Loading...