গ্রেফতার আতঙ্কে যুবলীগ ও আ.লীগের অনেক নেতা


poisha bazar

  • ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ০১:২৮

ক্যাসিনো, দুর্নীতি ও টেন্ডারবাজির বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের পরবর্তী টার্গেট কে? যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান নাকি মহানগর উত্তর যুবলীগ কোনো নেতা, নাকি গ্রেফতারকৃত যুবলীগ নেতার কোনো গডফাদার এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে গুঞ্জন চলছে। তাদের প্রশ্ন- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জালে এবারকার আটক হওয়ার পালা? যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্যাসিনো কারবার থেকে সুবিধা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযানে গ্রেফতার খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া ও জি কে শামীমকে যুবলীগে পদ দেয়ার ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের প্রথম দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টাও করেছেন এক সময় জাতীয় পার্টি করা বর্তমান যুবলীগ চেয়ারম্যান। এ ছাড়া যুবলীগ উত্তর, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামীদের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক ব্যক্তির নামও গোয়েন্দাদের তালিকায় রয়েছে। যথাযথ তথ্য-প্রমাণ ও ওপর মহলের নির্দেশ পেলে এদের কেউ সম্রাটের মতো আটক হতে পারেন বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলছেন, ‘দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের চক্র ভেঙে দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। যারাই দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, সামনে আরো অ্যারেস্ট হবে। এটা কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, যে অপরাধী তাকেই গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে। এটা সরকারের ইচ্ছা। সরকার এ ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে।

সূত্রে জানা যায়, অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনায় নাম আসার পর যুবলীগের বিভিন্ন নেতার পর এবার সংগঠনটির চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তার নামে থাকা সব হিসাবের লেনদেন তথ্য, বিবরণীসহ তিন কার্যদিবসের মধ্যে পাঠাতে নির্দেশ দেয়া হয়। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক অভিযানের প্রথম দিকে যেসব বিতর্কিত নেতাদের অবৈধ কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে এদের মধ্যে ওমর ফারুকের নাম রয়েছে। দেশ-বিদেশে তার সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তার ওপর দূরবর্তী গোয়েন্দা নজরদারিও রয়েছে। এ ছাড়া ক্ষমতাকে ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা মালিক বনে যাওয়া আরো কয়েকজন সরকারি দলের বিতর্কিত নেতার কর্মকাণ্ডের ওপরও নজরদারি চলছে। একই সঙ্গে বহুল আলোচিত যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের গডফাদার কিংবা পৃষ্ঠপোষক কারা কারা ছিলেন, সে ব্যাপারেও খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক অভিযানের গ্রেফতার যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া, জি কে শামীম ও কৃষক লীগ নেতা ফিরোজ জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাব ও পুলিশকে জানিয়েছেন, বছরের পর বছরজুড়ে অবৈধ ক্যাসিনো কারবার চালানোর বিষয়টি যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী জানতেন। ক্ষেত্র বিশেষে তিনি সুবিধাও নিয়েছেন। তার অনেক অজ্ঞাত সম্পদের তথ্য দিয়েছেন গ্রেফতারকৃতরা। এ ছাড়া অভিযানের শুরুতে পুলিশ ও র‌্যাবকে প্রশ্নবিদ্ধ করার হীন চেষ্টাকেও ভালো চোখে দেখেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও ক্যাসিনো ব্যবসা ও চাঁদাবাজির প্রমাণ গোয়েন্দাদের হাতে রয়েছে। এদের বর্তমান গতিবিধির দিকেও নজর রাখছেন গোয়েন্দারা।

সূত্র জানায়, ওমর ফারুকের উত্থানের যেন রূপকথার মতো। চট্টগ্রামে তামাক ব্যবসা শুরু করলেও পরবর্তীতে করেন তৈরি পোশাকের ব্যবসা। কিন্তু ব্যবসায় সাফল্য পাননি তিনি। হয়েছেন ঋণখেলাপি। তবে যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান হয়েই ভাগ্য বদলে যায় তার। ওমর ফারুক চৌধুরী ২০০৩ সালে যুবলীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন। এর আগের কমিটিতে ছিলেন কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। ২০০৯ সালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এরপর ২০১২ সালে হন চেয়ারম্যান।
দলীয় ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ১৯৪৮ সালে জš§ নেয়া ওমর ফারুক চৌধুরী সত্তরের দশকে চট্টগ্রাম জেলা বিড়ি শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিড়ি শ্রমিক লীগের নেতা হয়ে মিয়ানমার থেকে তামাকের বিকল্প টেন্ডু পাতা আমদানি শুরু করেন তিনি। এরপর এরশাদ ক্ষমতায় আশার পর ওমর ফারুক চৌধুরী শ্রমিক লীগের রাজনীতি ছেড়ে যোগ দেন জাতীয় পার্টির যুব সংহতিতে। এরশাদের পতনের পর ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সদস্য হন তিনি।

একই সূত্রমতে, ১৯৮৮ সালে রাউজানে পোশাক কারখানা স্থাপন করেন তিনি। তবে এই ব্যবসা করতে গিয়ে সম্পদ নিলামে ওঠার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় ওমর ফারুকের। ১৯৯৭ সালে তিনি ও তার স্ত্রীর নামে ১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ নেন। যা পরে ৪৪ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। ঋণের টাকা আদায় না করতে পেরে অর্থ আদায়ে আদালত যায় ব্যাংক। যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী জাতীয় পার্টির প্রয়াত নেতা নাজিউর রহমান মঞ্জুর ভায়রা ভাই ও আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্যের ভগ্নিপতি। এসব বিষয়ে যুবলীগ চেয়ারম্যান বক্তব্য জানা যায়নি। গতকাল তার মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

গত মাসে রাজধানীতে ক্লাব ব্যবসার আড়ালে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগে র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েন সম্রাটের ডান হাত হিসেবে পরিচিত যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভ‚ঁইয়া। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের শুরু থেকেই নজরদারিতে ছিলেন সম্রাট। তবে সেই সময় সম্রাটকে না ধরা হলেও ধরা হয় রাজধানীর টেন্ডার কিং আরেক যুবলীগ নেতা জি কে শামীমকে। তার কার্যালয় থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকার এফডিআর উদ্ধার করা হয়। এক পর্যায়ে ২২ সেপ্টেম্বর সম্রাটের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত একটি আদেশ দেশের বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে পাঠানো হয়। তার ব্যাংক হিসাবও তলব করা হয়।
তবু সম্রাট ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযান শুরুর প্রথম তিন দিন দৃশ্যমান ছিলেন তিনি। ফোনও ধরতেন। অবশেষে সেই অপেক্ষার পাল শেষ হয়। রোববার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে সহযোগী আরমানসহ গ্রেফতার হন সম্রাট। বর্তমানে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে সাধারণ বন্দি হিসেবে ‘কষ্টের আমদানি’ নামে ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে বহিষ্কৃত এই যুবলীগ নেতাকে।

বুধবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক হোটেল সোনারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মাধ্যমে দেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর বাণিজ্যিক স¤প্রচার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। দল, আত্মীয়, পরিবার বলে কিছু নেই, সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোনো ছাড় দেয়া হবে না। যারাই এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদক দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা অভিযান শুরু করেছি এবং এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ক্ষমতাসীন দল এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে চলমান শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে কথা বলছেন সরকারের মন্ত্রীরা। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, মন্ত্রী কিংবা এমপি হোক, দুর্নীতির প্রমাণ পেলেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্যদিকে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, আওয়ামী লীগে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা মদ, জুয়ার আসর বসিয়েছে। কারা পেছন থেকে মদদ দিয়েছেন সে তালিকাও সরকারের কাছে রয়েছে। সবাইকে একে একে আইনের আওতায় আনা হবে। খালিদ মাহমুদ ও জি কে শামিমের কাছ থেকে যারা কমিশন খেয়েছেন তাদের তালিকাও করা হচ্ছে। কেউ রেহাই পাবে না বলেন তথ্যমন্ত্রী।

মানবকণ্ঠ/টিএইচ




Loading...
ads




Loading...