ক্যাসিনো ও সম্রাটের সাতকাহন

ক্যাসিনো ও সম্রাটের সাতকাহন
ক্যাসিনো ও সম্রাটের সাতকাহন - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ১১:২৬,  আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ১১:৩১

ক্যাসিনো কাণ্ডকে কেন্দ্র করে হঠাৎই সরগরম হয়ে উঠেছিল রাজনীতির মাঠ। পেশাদার ক্লাবগুলোতে একেরপর এক অভিযানে বেরিয়ে আসে সর্বস্ব খোয়ানর নেশা লাগানো খেলা জুয়ার অস্তিত্ব। লাস ভেগাসের মত ঢাকার ভেতরে খোঁজ মেলে ক্যাসিনো সামগ্রীর। অভিযানে বেরিয়ে আসে এসবের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সম্পৃক্ততার। অভিযান শুরুর পর থেকে মুখে মুখে ফিরতে থাকে এই ঘটনা। গ্রেফতার হন যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। সরকার জানিয়ে দেয় এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় নয়। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলেন, শুদ্ধি অভিযান চলবে নিজের ঘর থেকেই।

গত ৭ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভায় ছাত্রলীগের নেতাদের নিয়ে নানা ক্ষোভ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সভায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের দুই নেতাকে ইঙ্গিত করে সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। ওই দুই যুবলীগ নেতার একজন মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে বুধবার র‌্যাব আটক করেছে।

অবৈধ ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া বুধবার রাতে গ্রেফতার হওয়ার পর হাজারখানেক নেতাকর্মী নিয়ে সংগঠনের কার্যালয়ে অবস্থান নেন মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট। তিনিও ঢাকার অন্তত একটি ক্যাসিনোর মালিক, সেই সঙ্গে একাধিক ক্যাসিনোর টাকা ভাগাভাগির সঙ্গে তার জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে তাকে যুবলীগ থেকে শোকজও করা হয়েছে।

দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া অস্ত্রসহ গ্রেফতার হওয়ার পর যুবলীগের কাকরাইল কার্যালয়ে উপস্থিত হন বিভিন্ন ইউনিটের সহস্রাধিক নেতাকর্মী। তাদের ধারণা, চলমান অভিযানে গ্রেফতার হতে পারেন সম্রাট। সে জন্য তারা কার্যালয়ে অবস্থান নিয়েছেন।

রাত ৩টার পরও কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের ভিড়ের কারণ জানতে চাইলে ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার কাছে নেতাকর্মীরা প্রতিদিনই আসে। রাত ১টা-২টা পর্যন্ত থাকে। এটা নতুন কিছু নয়।’

ক্যাসিনো গুরু কে এই সম্রাট :

রাজধানীর ‘ক্যাসিনো সম্রাট’ হিসেবে জুয়াড়িদের কাছে বেশ পরিচিত নাম। তিনি ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। সম্রাটের নেশা ও ‘পেশা’ জুয়া খেলা। তিনি একজন পেশাদার জুয়াড়ি। ঢাকায় অবৈধভাবে ক্যাসিনো ও জুয়ার বোর্ড পরিচালনার অভিযোগে এখন পুলিশের নজরদারীতে রয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। বুধবার সকাল থেকেই সম্রাটকে নজরদারিতে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের বিরুদ্ধে আনা নানা অভিযোগের একটি প্রতিবেদন এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরীর চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও তার কিছু লোকজনের দৌরাত্ম্যে। এ বিষয়ে যাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হয় তার অনুরোধ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের অফিস রাজধানীর কাকরাইলে রাজমণি সিনেমা হলের উল্টোপাশে। সেখানেও গভীর রাত পর্যন্ত ভিআইপি জুয়া খেলা চলে। প্রতিদিনই ঢাকার একাধিক বড় জুয়াড়িকে সেখানে জুয়া খেলার আমন্ত্রণ জানানো হয়।

ঢাকার ১২টি ক্লাবে জুয়া চললেও মূলত রমরমা অবস্থায় ফকিরাপুল ইয়াংম্যানস ক্লাব, আরামবাগ ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, অ্যাজাক্স ক্লাব, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, সৈনিক ক্লাব ও কলাবাগান ক্লাব। এর বাইরে মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব, পল্টনের জামাল টাওয়ার, যুবলীগ নেতা সম্রাটের কাকরাইলের অফিসসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় গভীর রাত পর্যন্ত ক্যাসিনো চলে।

কিন্তু সম্রাটের অফিসে খেলার নিয়ম ভিন্ন। সেখান থেকে জিতে আসা যাবে না। কোনো জুয়াড়ি জিতলেও তার টাকা জোরপূর্বক রেখে দেয়া হয়। নিপীড়নমূলক এই জুয়া খেলার পদ্ধতিকে জুয়াড়িরা বলেন ‘চুঙ্গি ফিট’। অনেকে এটাকে ‘অল ইন’ও বলেন। জুয়াজগতে ‘অল ইন’ শব্দটি খুবই পরিচিত। অল ইন মানে একেবারেই সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়া। সংসারের ঘটিবাটি বিক্রি করে একেবারেই নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার মতোই জুয়াড়িদের অল ইন হওয়া।

যুবলীগ দক্ষিণের নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট টাকার বস্তা নিয়ে জুয়া খেলতে যান সিঙ্গাপুরে। প্রতি মাসে অন্তত ১০ দিন তিনি সিঙ্গাপুরে জুয়া খেলেন। এটি তার নেশা। সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় জুয়ার আস্তানা মেরিনা বে স্যান্ডস ক্যাসিনোতে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ থেকেও আসেন জুয়াড়িরা।

কিন্তু সেখানেও সম্রাট ভিআইপি জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত। প্রথমসারির জুয়াড়ি হওয়ায় সিঙ্গাপুরের চেঙ্গি এয়ারপোর্টে তাকে রিসিভ করার বিশেষ ব্যবস্থাও আছে। এয়ারপোর্ট থেকে মেরিনা বে স্যান্ডস ক্যাসিনো পর্যন্ত তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বিলাসবহুল গাড়ি ‘লিমুজিন’যোগে।

সিঙ্গাপুরে জুয়া খেলতে গেলে সম্রাটের নিয়মিত সঙ্গী হন যুবলীগ দক্ষিণের নেতা আরমানুল হক আরমান, মোমিনুল হক সাঈদ ওরফে সাঈদ কমিশনার, সম্রাটের ভাই বাদল ও জুয়াড়ি খোরশেদ আলম।

সূত্র জানায়, ক্যাসিনো নামে রাজধানীতে জমজমাট ১২টি ক্লাব। এসব জুয়ার আসর থেকে যুবলীগের নামে দৈনিক ভিত্তিতে বিপুল পরিমাণ চাঁদা তোলা হয়। প্রতিটি ক্লাব থেকে দৈনিক চাঁদা নির্ধারণ করা আছে ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে দৈনিক চাঁদার পরিমাণ ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। মাসে চাঁদা ওঠে ৩৬ কোটি টাকা।

বছরে এই টাকার পরিমাণ ৪৩২ কোটি, যা অবিশ্বাস্য বটে। তবে বিশাল অঙ্কের এই টাকার ভাগ যায় সরকারি দলের বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতাদের পকেটে। প্রতি মাসে চাঁদা হিসেবে আদায় করা এই টাকাকে বলা হয় ‘প্রক্রিয়ার টাকা’।

এসব ক্যাসিনো দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে। নির্দিষ্ট ফি দিয়ে সেখানে ঢুকে যেতে পারেন যে কেউ। ক্যাসিনোতে একদিকে হলরুমে চলতে থাকে খেলা, অন্যদিকে চলতে থাকে খাবার, মদসহ নেশাজাতদ্রব্য পরিবেশন। নিয়ম অনুযায়ী খেলতে গেলে খাবার ফ্রি। এসব খাবারের সঙ্গে জুয়ারিরা চাইলেই উন্নতমানের মদ-বিয়ার নিয়ে নিতে পারেন। নেশা-জুয়া আর টাকা হারা জেতার এই খেলায় তাই বুদ হয়ে থাকেন তারা।

বিভিন্ন খবরে জানা যায়, দিনশেষে রাত গড়িয়ে আসতেই ক্যাসিনোতে আসতে শুরু করেন উঠতি মডেল ও শোবিজ জগতের গ্লামার গার্লরা। আকর্ষণীয় সেসব মডেলদের ঝলকানি আর মদের নেশায় বড় বড় টাকার বাজি ধরেন জুয়াড়িরা। এতে কেউ হন মিলিয়নিয়ার, কেউ হারান সর্বস্ব।

মানবকণ্ঠ/এআইএস





ads







Loading...