শ্রমবাজারে স্থবিরতা কাটছে না


poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ০১:৩৪

চলতি বছরের নয় মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মী ফেরত এসেছেন। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরব থেকে ফেরত এসেছেন ১২ হাজার বাংলাদেশি কর্মী। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ২৫০ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠিয়েছে সৌদি আরব। আর পূর্ব আফ্রিকার মরিশাস ফেরত পাঠাচ্ছে ৮০ জন বাংলাদেশি কর্মীকে। এদের মধ্যে বৃহস্পতিবার (৩ অক্টোবর) রাতে ১৫ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকিদেরও পাঠানো হবে। অন্যদিকে বিদেশে শ্রমশক্তি পাঠানো প্রক্রিয়া প্রায় সংকুচিত। মালয়েশিয়া ও আরব আমিরাতে বাজার বন্ধ। সৌদি আরবের শ্রমবাজারে ধীরগতি। বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারের বাজার বিরূপ পরিস্থিতিতে প্রায় থমকে আছে। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমবাজার খোলা নিয়ে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগও নেই জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রার। সব মিলিয়ে শ্রমবাজারের স্থবিরতা কাটছে না।

এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল ইসলাম মানবকণ্ঠকে বলেন, ফেরত আসা শ্রমিকদের অনেকের কাছেই বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। কেন তারা ফিরে আসছেন- সেটা খুঁজে বের করা জরুরি। পরে সে অনুযায়ী করণীয় ঠিক করতে হবে। কারণ না জানলে করণীয় তো ঠিক করা যাবে না। তিনি বলেন, ফ্রি ভিসা বলে কিছু নেই। তারপরও বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সি ফ্রি ভিসার নাম করে বিদেশে শ্রমিক পাঠাচ্ছে। এ বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা উচিত। জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রার যুগ্ম সম্পাদক তাজুল ইসলাম মানবকণ্ঠকে বলেন, বায়রার পক্ষ থেকে বন্ধ দেশগুলোর শ্রমবাজার ফের চালু করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমরা শ্রমবাজার চালু করতে ইতোমধ্যে সৌদি আরবে বৈঠক করেছি, শিগগির মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করব। অন্যান্য দেশেও বৈঠক করে চালু করার চেষ্টা করব। বায়রার আরেক যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, আসলে বন্ধ শ্রমবাজারগুলো খোলার যোগ্যতা বায়রার নেই। কিন্তু বন্ধ শ্রমবাজারগুলো খোলার জন্য যেসব উদ্যোগ বায়রার পক্ষ থেকে নেয়ার কথা সেগুলো আমার নিচ্ছি। নতুন বাজার খুঁজে বের করার চেষ্টাও আমরা করছি।

তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্বের শ্রমবাজার অন্যদিকে ধাবিত হচ্ছে। শ্রমশক্তি নিয়োগ দাতারা এখন দক্ষ শ্রমিক চাচ্ছে। এদিকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তাই আমরা চাচ্ছি জনশক্তিকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে। শ্রমবাজার যাতে বন্ধ না হয়, শ্রমবাজার যাতে এগিয়ে যায় সে চেষ্টা বায়রার পক্ষ থেকে করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গন্তব্য দেশগুলোতে আইনি কঠোরতা এবং শ্রমিকদের অনিবন্ধিত হয়ে পড়ার কারণেই তাদের ধরে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এ নয় মাসে প্রায় এক হাজার নারীকর্মীও দেশে ফেরত এসেছেন। সৌদি আরব থেকে গত ২৬ আগস্ট একদিনে ফিরে আসা ১১১ জন নারী গৃহশ্রমিকের ৩৮ জন শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। আর ৪৮ জনকে নিয়মিত বেতন-ভাতা দেয়া হতো না। সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের দেশে ফেরা এখনো অব্যাহত রয়েছে। গত শুক্রবার (৪ অক্টোবর) দিনগত রাতেও সৌদি এয়ারলাইন্সে ১২০ জন বাংলাদেশি কর্মী দেশে ফিরেছেন। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে ফেরেন আরও ১৩০ জন। অর্থাৎ গত দু’দিনে ২৫০ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠিয়েছে সৌদি আবর।

সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা কর্মীদের অভিযোগ, সৌদি আরবে বেশ কিছুদিন ধরে ধরপাকড়ের শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা। সেই অভিযানে বাদ যাচ্ছেন না বৈধ কর্মীরাও।
শুক্রবার রাতে ফেরত আসা ঢাকার দোহার উপজেলার আনোয়ার হোসেন জানান, সৌদি আরবে একটি দোকানে তিনি কাজ করতেন। আকামার মেয়াদ ছিল আরও ১১ মাস। কিন্তু দোকান থেকে ধরে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

ফেরত আসা কর্মীদের অনেকে অভিযোগ করেন, তারা কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পথে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে, সে সময় নিয়োগকর্তাকে ফোন করা হলেও তারা দায়িত্ব নেননি। আকামা থাকা সত্তে¡ও কর্মীদেরকে ডির্পোটেশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আবার দীর্ঘদিন অবৈধভাবে থাকার কারণেও অনেককে আটক করে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

এছাড়া পূর্ব আফ্রিকার মরিশাস পোশাক কারখানায় আন্দোলন ও ভাঙচুর করার জের ধরে ৮০ জন বাংলাদেশি কর্মীকে ফেরত পাঠাচ্ছে দেশটি। এদের মধ্যে বৃহস্পতিবার (৩ অক্টোবর) রাতে ১৫ জনকে ফেরত পাঠানো হয়। পর্যায়ক্রমে বাকিদেরও পাঠানো হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, হামলার সাথে জড়িত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী মামলা হওয়ার কথা। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেদিকে না যেয়ে তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে।
সূত্র জানায়, মরিশাসের সাইফেলিক্স নামক দ্বীপে ফায়ার মাউন্ট টেক্সাইল লিমিডেট বেতন, ভাতাসহ বেশ কয়েকটি দাবি নিয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত এই আন্দোলন করে বাংলাদেশের কিছু কর্মী। তাদের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ হয় ৮ হাজার ৪০ মরিশাস রুপি। কিন্তু আমাদের থাকার জন্য ১৪শ রুপি এবং খাওয়া বাবদ ১৯৫০ রুপি বেতন থেকে কেটে নেয় কোম্পানি। তাছাড়া খাবারের মানও অত্যন্ত নি¤œ। থাকার পরিবেশও ভাল নয়। একটি কক্ষে ৩০-৩৫ জন কর্মী থাকলেও পর্যাপ্ত ফ্যানের অভাবে শীতের মধ্যেও গরম লাগে।

আন্দোলনরত কর্মীরা জানান, ছয় দফা দাবি নিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে কর্মবিরতিতে যান বাংলাদেশি নারী ও পুরুষ কর্মীরা। আট হাজার ৫৪০ রুপি বেতন, থাকা খাওয়ার খরচ কোম্পানি কর্তৃক বহন, চুক্তি শেষের আগে কাউকে দেশে ফেরত না পাঠানো, ব্যক্তিগতভাবে রান্না করে খাওয়ার সুবিধা দেয়াসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছিলেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরো জানায়, শ্রমবাজারে এ অস্থির সঙ্কটের কারণে ২০১৮ সালে জনশক্তি রফতানি কমেছে ২৭ শতাংশ। এ বছরের প্রথম তিন মাসেও নি¤œমুখী ধারায় আছে শ্রম রফতানি। এ থেকে উত্তরণের জন্য নতুন বাজার খোঁজার বিকল্প নেই। কিন্তু সেখানেও লক্ষণীয় কোনো উদ্যোগ নেই। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে বৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে ৭ লাখ ৩৪ হাজার ১৮১ জন কর্মী কাজ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যান। আগের বছর এটি ছিল ১০ লাখ ৮ হাজার ৫২৫ জন। আবার গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) জনশক্তি রফতানি ছিল ২ লাখ ৪ হাজার ২০১ জন। এ বছর তা ১৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৯ জন।

জনশক্তি বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানিতে আস্থার প্রতীক ছিল উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা-জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভিসা জটিলতা, ক‚টনৈতিক ব্যর্থতাসহ নানা প্রতিক‚লতায় ক্রমেই সংকুচিত হয়ে এসেছে এ শ্রমবাজার। ফলে প্রতি বছর কমছে জনশক্তি রফতানি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে জনশক্তি প্রেরণের গতি প্রায় থমকে গেছে। সৌদি আরবে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়ার পরিবর্তে পাকিস্তান থেকে শ্রমিক নেয়ার কোটা বাড়ানো হয়েছে।

এ ছাড়া যুদ্ধবিগ্রহের কারণে সৌদি আরবে এমনিতেই শ্রমিক নেয়ার পরিমাণ কমেছে। সেখানে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের বিষয়ে আগ্রহ দেখানো হচ্ছে। কিন্তু নির্যাতনের অভিযোগও কম নয়। বাংলাদেশের অন্য শ্রমবাজার আরব আমিরাতের বাজার দীর্ঘদিন বন্ধ। এ ছাড়া সেখানে তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না কাউকেই। এক সময় যে কুয়েত ছিল বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাজার, সে বাজার এখন পুরোপুরি বন্ধ। লিবিয়ার দুয়ারও বন্ধ। ইরাকও প্রায় বন্ধের মতোই। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোর দুয়ার বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য এখন কার্যত বন্ধ।

একমাত্র মালয়েশিয়ার বাজার ছিল চাঙ্গা। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর বন্ধ রাখা হয়েছে শ্রমিক নেয়া। বড় শ্রমবাজারগুলো বন্ধ থাকার পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের বিষয়েও তেমন কোনো উদ্যোগ কার্যকর হয়নি। শ্রমবাজারের এসব সঙ্কটের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নির্যাতিত-নিপীড়িত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের কর্মীরা প্রায়ই অবৈধ হয়ে পড়ছেন। ট্যুরিস্ট বা ভিজিট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসায় বাংলাদেশিদের বিদেশে গিয়ে অবস্থানের ঘটনাও বাড়ছে। বাংলাদেশে অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণের কথা বলা হলেও তা মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

অন্যদিকে চলতি বছরের নয় মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মী ফেরত এসেছেন। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার বাংলাদেশি সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সাড়ে চার হাজার, ওমান থেকে প্রায় তিন হাজার, মালয়েশিয়া থেকে আড়াই হাজার, কাতার থেকে দেড় হাজার এবং মালদ্বীপ থেকে ফিরেছেন এক হাজার বাংলাদেশি।

সূত্র জানায়, সৌদি থেকে একদিনে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের মধ্যে নিয়মিত বেতন না দেয়ায় ৪৮ জন, পর্যাপ্ত খাবার না দেয়ায় ২৩ জন, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনে ৩৮ জন, ছুটি না দেয়ায় চারজন, একাধিক বাড়িতে কাজ করানোর জন্য সাতজন, অন্য কফিলের কাছে বিক্রি করে দেয়ায় একজন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে ১০ জন, পারিবারিক কারণে একজন, ভিসার মেয়াদ না থাকায় আটজন, চুক্তি (দুই বছর) শেষ হওয়ায় ১৬ জন এবং অন্যান্য কারণে দুজন ফিরে এসেছেন। ওই ১১১ নারীর মধ্যে ৩৪ জন সৌদি আরব যাওয়ার এক থেকে ছয় মাসের মধ্যে দেশে ফিরে আসেন।

মানবকণ্ঠ/টিএইচ




Loading...
ads




Loading...