জুয়ায় সেলিমের মাসিক আয় ৮ কোটি টাকা

জুয়ায় সেলিমের মাসিক আয় ৮ কোটি টাকা
সেলিম প্রধান - মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ০৩ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:২০,  আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:৩৩

বাংলাদেশে অনলাইনভিত্তিক অবৈধ ক্যাসিনো কারবারের মূল হোতা সেলিম প্রধান গুলশানে অনৈতিক স্পা ব্যবসা ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে জাপান বাংলাদেশ (জেবি) প্রেসের আড়ালে অপরাধ জগতের একজন মাফিয়া ডন। এমন কোনো অপকর্ম নেই যা তিনি করেননি। বহু বছর ধরে নানা অবৈধ কারবার, চোরাচালানি, জমি দখল, চাঁদাবাজি করে শত শত কোটি টাকার মালিক বনে যান সেলিম।

শুধু জুয়ার কারবারেই মাসে তার আয় হতো অন্তত আট কোটি টাকা। থাইল্যান্ডে ‘সেকেন্ড হোম’ বানিয়েছেন তিনি। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে বিতর্কিত ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুন এবং তারেক রহমানের হাত ধরে প্রথমে উত্থান হয় এই জুয়াড়ি সেলিম প্রধানের।

সর্বশেষ তৃতীয় মেয়াদে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর একাধিক সিনিয়র নেতা ও এমপির সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন ভার্চুয়াল জগতের জুয়াড়ি সেলিম। তাদের কাউকে কাউকে ব্যবসায়িক পার্টনার বানিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণের নামে হাতিয়ে নিয়েছেন কয়েক শ’ কোটি টাকা। সেই ঋণের অধিকাংশ অর্থই তিনি থাইল্যান্ডের ব্যাংককে পাচার করে সেখানে বিলাসী জীবনযাপন করতেন। সেলিম প্রধানের ব্যাংককের পাতায়ায় বিলাসবহুল হোটেল, ডিসকো বারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। রাশিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশে দুজনসহ মোট পাঁচজন স্ত্রী রয়েছে তার।

ইন্টারনেটের অবৈধ ক্যাসিনো কারবারের মূল হোতা সেলিম প্রধান র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে, কে এই সেলিম প্রধান দেশ ছেড়ে পালানোর সময় সোমবার দুপুরে শাহজালাল বিমানবন্দরের থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট ছাড়ার আগ মুহূর্তে এই জুয়াড়িকে বিমান থেকে আটক করে র‌্যাব। এরপর সোমবার গভীর রাতে ও মঙ্গলবার দুপুরে সেলিমের গুলশান বাসা ও বনানী অফিসে দীর্ঘ অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, বিদেশি মুদ্রা, ১২টি পাসপোর্ট, মদ, হরিণের চামড়া উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব সূত্র জানায়, গত ২৬ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হওয়া বিসিবি পরিচালক ও মোহামেডান ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন ভ‚ঁইয়া এবং সেলিম প্রধান মতিঝিল ও গুলশান এলাকায় ক্যাসিনো ব্যবসা করতেন। ব্যবসায়িক পার্টনারের মাধ্যমে ওয়ান্ডার্স ক্লাবের সহসভাপতি পদও বাগিয়ে নেন সেলিম। সূত্র জানায়, গুলশানের ৩৩ নম্বর সড়কে ‘প্রধান স্পা’ নামের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানটির মালিক এই সেলিম। সেখানে স্পার নামে মূলত নারী দিয়ে অনৈতিক কারবার চলত। যেখানে ভিআইপিদের আসা-যাওয়া ছিল। এ ছাড়া আরো কয়েকটি স্পা সেন্টার ও অভিজাত হোটেল এবং বারে নর্তকী হিসেবে সুন্দরী তরুণীদের সরবরাহের কাজ করতেন সেলিম। সেই মেয়েরা ভিআইপিদের বিনোদন দেয়ার কাজ করত।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তারা জানন, সেলিম প্রধান একজন ঋণখেলাপি ও বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ড এবং জাপানসহ কয়েকটি দেশে অর্থ পাচারকারী। তিনি জাপান থেকে অর্থায়ন করে রূপগজ্ঞে জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস বানিয়েছেন। এই সেলিম প্রধান শুধু রূপালী ব্যাংক থেকেই ১০০ কোটি টাকা লোন নিয়েছেন। ওই ব্যাংকের ঋণ খেলাপি তিনি। আরো ব্যাংক থেকে তিনি ঋণ নিয়েছেন জানতে পেরে অনুসন্ধান চলছে।

র‌্যাবের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, বিগত বিএনপি সরকারের আমলে তারেক রহমান ও তার ব্যবসায়িক পার্টনার গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল সেলিম প্রধানের। ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে সেলিম মামুনকে বিএমডবিøউ গাড়ি উপহার দেন। ওই সময় বিএনপির কয়েক নেতার মনোরঞ্জনের জন্য সুন্দরী নারী সরবরাহ করতেন সেলিম প্রধান। এর বিনিময়ে কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিতেন। এ ছাড়া বিএনপি আমলের এক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও সেলিমের সুসম্পর্ক ছিল বলে তথ্য মিলেছে।

র‌্যাব জানায়, ১৯৭৩ সালে ঢাকায় সেলিমের জন্ম। ১৯৮৮ সালে তিনি জাপানে যান। সেখানে গিয়ে জাপানিদের সঙ্গে মিলে গাড়ি ব্যবসায় নাম লেখান। জাপানিদের মাধ্যমেই উত্তর কোরিয়ার নাগরিক মি. দুর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মি. দু বাংলাদেশে কনস্ট্রাকশন ব্যবসায় আগ্রহ প্রকাশ করেন। ধীরে ধীরে সেলিমের সঙ্গে সখ্য বাড়ার পর মি. দু তাকে অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবসার পরিকল্পনার কথা বলেন। ২০১৮ সালে মি. দু এবং সেলিম অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশে অনলাইনে ক্যাসিনো ব্যবসা শুরু করেন। এ অবৈধ কারবার প্রতিমাসে তার আয় হতো অন্তত আট কোটি টাকা। এ টাকার একটি অংশ তিনি বিদেশে পাচার করতেন। এভাবে নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এক পর্যায়ে অপরাধ জগতের ডনে পরিণত হন এই জুয়াড়ি সেলিম।
র‌্যাব কর্মকর্তা আরো জানান, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে।

বর্তমানের সরকারের কয়েক প্রভাবশালী নেতার পৃষ্ঠপোষকতায় সেলিম প্রধান অবাধে ক্যাসিনো ব্যবসা চালাতেন। অবৈধ এসব ব্যবসা ছাড়াও চাঁদাবাজি থেকেও কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন তিনি। তার মধ্যে রাজশাহীসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল সীমান্তে ভারতীয় গবাদিপশুর সব খাটাল ও মাদক সিন্ডিকেটগুলো থেকেও তিনি আয় করেছেন প্রায় ২০ কোটি টাকা। আর এই টাকা আয় করেছেন দুই বছরেই। এভাবে টাকার কুমির বনে থাইল্যান্ডে ও জাপানে বিলাসী জীবন কাটাতেন।

জানা গেছে, সেলিম প্রধানের গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মর্তুজাবাগে। তার বাবার নাম আব্দুল হান্নান ওরফে নান্নু মিয়া। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সেলিম সবার বড়। ঢাকার মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডেও তাদের বাসা রয়েছে।

মানিলন্ডারিং মামলা : সেলিমের সঙ্গে তিন কোরীয় নাগরিক আসামি : অনলাইন ক্যাসিনোর মূল হোতা সেলিম প্রধানসহ আট আসামির বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মানিলন্ডারিং আইনে গুলশান থানায় মামলা দায়ের করেছে র‌্যাব। আসামিদের তিনজন উত্তর কোরিয়ার নাগরিকও রয়েছেন। এ ছাড়া মাদক মামলায় সেলিম প্রধান ছাড়াও তার ব্যক্তিগত সহকারী রোমান ও আক্তারুজ্জামানকে আসামি করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে র‌্যাব-১-এর এক কর্মকর্তা মামলা দুটি দায়ের করেন বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান।

তিনি জানান, মানিলন্ডারিং আইনে দায়ের করা মামলার আসামি করা হয়েছে সেলিম প্রধানসহ আটজনকে। অপর আসামিরা হলেন তার ব্যক্তিগত সহকারী রোমান, সীমান্ত রনি, শান্ত ও আক্তারুজ্জামান। এ ছাড়া এই মামলায় উত্তর কোরিয়ার তিন নাগরিককেও আসামি করা হয়। এদের একজনের নাম মি. তু বা মিস্টার তু, লি ও লিম।

সোমবার দুপুরে বিমানবন্দর থেকে সেলিম প্রধানকে গ্রেফতার করার পর মঙ্গলবার দিন ও রাতে তার গুলশান ও বনানীর অফিস-বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। তার বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা, মাদক ও নগদ অর্থ জব্দ করা হয়। এ ছাড়া দুটি হরিণের চামড়াও জব্দ করা হয়েছে। হরিণ হত্যার দায়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে সেলিমকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। এরপর মঙ্গলবার রাতেই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

মানবকণ্ঠ/এএম

 





ads







Loading...