তথ্য অধিকার সম্পর্কে জানেন না ৭৫ শতাংশ মানুষ

মানবকণ্ঠ
তথ্য অধিকার সম্পর্কে জানেন না ৭৫ শতাংশ মানুষ - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৪:০৮

তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে দেশের ৭৫ শতাংশ মানুষ জানেন না। ২৫ শতাংশ মানুষ এ সম্পর্কে জানলেও তাদের মধ্যে ২০ শতাংশের এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই বলে একটি গবেষণা প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস- ২০১৯ উপলক্ষে ‘তথ্য অধিকার আইন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের প্রথম দশকের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক সভায় গতকাল বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদন তুলে ধরে সংগঠনটি। গবেষণাটি ১০০ মানুষের ওপর নমুনায়ন পদ্ধতিতে করা হয়।

টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে তথ্য অধিকার পাওয়ার জন্য ৯৯ হাজার ২৩৮টি আবেদন জমা হয়েছে। গড়ে প্রতিবছর ১১ হাজারের বেশি আবেদন এসেছে, যা বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় খুবই সামান্য। গ্লোবাল রাইট টু ইনফরমেশন রেটিংয়ে ১২৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ২৬তম অবস্থানে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এতে আরো বলা হয়েছে, তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও বাংলাদেশের বেশকিছু সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এ আইনের ৪ ধারায় আবেদন সাপেক্ষে তথ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেয়া হলেও ৭ নম্বর ধারায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি- এসব যুক্তিতে বৃহৎ ব্যতিক্রম তালিকা সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে এর পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা না থাকায় অপব্যবহারের সুযোগ থাকে। পাশাপাশি জনগণের নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়া, মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে উপস্থাপনীয় সারসংক্ষেপসহ আনুষঙ্গিক দলিলাদি এবং বৈঠকের আলোচনা ও সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত তথ্যসহ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে তথ্য না দেয়ার ক্ষমতা দিয়ে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩ আইনকে তথ্য অধিকার আইনের ওপর স্থান দেয়া হয়েছে। এ কারণে জনমানুষ অবাধে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, তথ্য দেয়ার ক্ষেত্রে ৩২ ধারা অনুযায়ী মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ বা প্রদান করা বাধ্যবাধকতা সত্তে¡ও, জনগণের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তথ্যের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার সংস্কৃতি অব্যাহত রয়েছে। এর সুষ্ঠু তদন্ত হচ্ছে না। তদন্ত হলেও তার ফলাফল গোপন রাখা হচ্ছে। দুর্নীতির তথ্যের ক্ষেত্রেও একই চিত্র বিদ্যমান।

উš§ুক্ত আলোচনায় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, তথ্য অধিকার আইনে বেসরকারি খাতে তথ্য পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটি এ আইনের একটি বড় দুর্বলতা। তার চেয়ে বড় দুর্বলতা রাজনৈতিক দলগুলোর তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা। কারণ দেশের কোনো মেগা দুর্নীতি রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়া ছাড়া সম্ভব নয়।

তিনি আরো বলেন, তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা তথ্য কমিশন। মানুষের তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে এই কমিশন নানাভাবে হয়রানি করে থাকে।

অধ্যাপক আফসান চৌধুরী বলেন, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে কোনো লাভ নেই। কারণ যাদের কাছে অভিযোগ দাখিল করবেন তারা নিজেরাই দুর্নীতিবাজ। এ জন্য জনমানুষ এ বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখায় না। তথ্য অধিকার আইন বিষয়ে ৭৫ শতাংশ মানুষের কোনো ধারণা নেই। ২৫ শতাংশ এ আইনটির কথা শুনলেও এর মধ্যে ২০ শতাংশ মানুষের এ আইনটি কী তা জানেন না। মূলত ৫ শতাংশ মানুষের তথ্য অধিকার আইন ধারণা রয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ বিপদে পড়লেও পুলিশের কাছে যেতে চায় না। তারা মনে করেন পুলিশের কাছে গেলে ঝামেলা আরো বাড়বে। এ কারণে তারা আইনের আশ্রয় নিতে চায় না। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ডিনেটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অনন্য রায়হান বলেন, তথ্য অধিকার আইন পরিপালন না করা হলেও, এ আইনে সরকারের কোনো জবাবদিহিতার সুযোগ রাখা হয়নি। এটি একটি বড় দুর্বলতা। তবে আইনের অনেক ভালো দিক রয়েছে, যা ব্যবহার হচ্ছে না। তিনি বলেন, গত ১০ বছরে মত প্রকাশের স্বাধীনতা অনেক সংকুচিত হয়ে গেছে। ক্ষমতাসীন দল ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব কর্মসূচি পালনের সুযোগ নেই। নাগরিক সমাজের ভ‚মিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা স্বার্থের কারণে সঠিক কথা না বলে মুখ বন্ধ করে রাখছি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জনগণকে ক্ষমতায়িত করতে তথ্য অধিকার আইনটি করা হয়েছে। এটি শক্তিশালী আইন হলেও প্রয়োগ হচ্ছে না। তথ্য অধিকার আইনে তথ্য পেতে অনেকে হয়রানির শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, শতভাগ সরকারি কর্মকর্তারা তথ্য দিতে চান না। অধিকাংশ কমিশনগুলোতে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়ায় সেখান থেকে তথ্য পাওয়াটা জটিল হয়ে গেছে। সরকারি কর্মকর্তারা এ বিষয়ে সহযোগিতা না করলে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। তথ্য অধিকার আইনটি বাস্তবায়নের জন্য একটি জাতীয় কৌশলপত্র থাকা উচিত। যেখানে স্বল্প মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা থাকবে। এবারের দিবসটি উদযাপনের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নে সাফল্য অর্জনকারী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এবং তথ্য অধিকার বিষয়ে টিআইবির স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে ১২টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে- তথ্য অধিকার আইনের আওতায় ব্যবসা, রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যমে অন্তর্ভুক্তকরণ, প্রয়োজনীয় সংশোধন, তথ্য ফরম পূরণের আবশ্যকতা হিসেবে তথ্য কর্মকর্তার নাম উল্লেখকরণ অপরাসণ, সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় তথ্য অধিকার আইনে অনুরোধকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের বিবরণ প্রদানের বাধ্যবাধকতা বাদ দিয়ে অনুরোধকারী ব্যক্তি প্রদত্ত নির্দিষ্ট যে কোনো ঠিকানায় তথ্য প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি, আইনে তথ্য প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিধান, আইনের পরিপন্থী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর ৩২ ধারাসহ বাক স্বাধীনতার পরিপন্থী অন্যান্য ধারা বাতিল, তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে আলাদা ডেস্ক তৈরি ও অনলাইন ব্যবস্থা চালু করা।

মানবকণ্ঠ/এইচকে






ads
ads