খালগুলো যেন ভাগাড়


poisha bazar

  • হাসান মাহমুদ রিপন
  • ১২ জুলাই ২০১৯, ১৮:০৬

রাজধানীর খালগুলো কাগজে থাকলেও বাস্তবে এর অধিকাংশেরই হদিস মিলছে না। যা কয়েকটি রয়েছে তাও আবার আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ভরাট, দখল আর দূষণে নিঃস্ব হয়ে গেছে এসব খাল। রাজধানীর এসব খাল যেন নামেই। ঢাকা ওয়াসা বলছে, খাল পরিষ্কারের জন্য জলাবদ্ধতা রোধে শুধু বর্ষাকালে একবার বরাদ্দ দেয়া হয়। আর তাই বছরের অন্য সময়ে খাল পরিষ্কারের দায় ওয়াসার নয়। অপরদিকে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন বলছে নগরীর খাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ওয়াসার। এ অবস্থায় ঢাকার খাল রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পরামর্শ দিয়েছেন পরিবেশবিদগণ।

জানা গেছে, রাজধানীর খালগুলো উদ্ধারে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে নগর ভবনে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়। সভায় প্রাথমিকভাবে খালগুলোর প্রকৃত সীমানা চিহ্নিতকরণ, দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও নাব্য নিশ্চিতে জোর দেন দুই মেয়র। এ সময় ঢাকা ওয়াসা দিয়েছে খাল দখলমুক্ত রাখতে পাড় বাঁধাই ও ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরামর্শ। ঢাকার দুই মেয়র সাঈদ খোকন ও প্রয়াত আনিসুল হক নানা প্রকল্প নিলেও এখন পর্যন্ত কাজের কাজ কিছুই দৃশ্যমান নয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর প্রায় সব খালেরই কম বেশি বেহাল দশা। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় দুর্গন্ধ ও মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ তাদের জীবন। সামান্য বৃষ্টি হলেই আগের মতো জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ নিলেও খাল পরিষ্কারের দায় ওয়াসার নয় বলে দাবি করছেন সংস্থাটির এমডি। ঢাকার অন্য ৭টি সংস্থার ঘাড়ে দায় চাপিয়েছেন তিনি।

এরই মধ্যে গত ২ জুলাই আসন্ন বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা ওয়াসার মালিকানাধীন রাজধানীর কল্যাণপুর ‘খ’ খালটি পরিষ্কারের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান বলেন, রাজধানীর খালগুলো পরিষ্কার কে করবে এটা ঠিক নেই। এগুলোর জন্য সরকারের কাছে ৬০ কোটি টাকা চেয়েছিলাম, ‘কিন্তু সরকার ৪০ কোটি টাকা দিয়েছে। এখন কাজ করে তো লাভ নেই। আবারো ময়লা হয়ে যাবে। আমাদের যে উদ্দেশ্য তা হলো বৃষ্টির পানি যেনো বেরিয়ে যেতে পারে। সেই ব্যবস্থা করতে হবে। কাগজ-কলমে ২৬টি খাল থাকলেও নগরীতে ১৩টি খালের অস্তিত্ব আছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ওয়াসার পক্ষ থেকে ১৩ খাল প্রবহমান বলা হলেও বর্তমানে ২১ খাল বর্ষা মৌসুমে প্রবহমান থাকে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে এ খালগুলো সারা বছর প্রবহমান রাখা সম্ভব। ওয়াসার এমডি বলেন, নগরীতে পানিবদ্ধতা সৃষ্টি এবং নিরসনের সাথে সাতটি সংস্থার কার্যক্রম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। এ সব সংস্থা হলো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (ডিসিসি), পরিবেশ অধিদফতর, ভ‚মি অধিদফতর, রেল কর্তৃপক্ষ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড।

এই সাতটি সংস্থার একক সিদ্ধান্ত ও সমন্বয়হীনতার কারণে নগরীর পানিবদ্ধতা নিরসনে কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। তাই আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রাজধানীতে আবারো জলাবদ্ধতার আশঙ্কা নগরবিদদের।

পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের সমন্বয়হীনতা, অপরিকল্পিত, অদূরদর্শী কার্যক্রম এবং নগরবাসীর অসচেতনতার কারণে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সুফল মিলছে না। জনসচেতনতার ঘাটতি বড় সমস্যা হলেও এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম নেই।

জানা গেছে, দখলে যাওয়া ৪৩ খাল উচ্ছেদ অভিযানে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নামার কথা থাকলেও এখনো তা যেন অনেকটাই ঘোষণাতে সীমাবদ্ধ। অপরদিকে ঢাকার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাজধানীর খালগুলোর অধিকাংশ দখল করে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এসব অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করলে খালগুলো আগের মতো সচল হতে পারে। তাছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন খালের মালিকানা ব্যক্তির নামেও রেকর্ড হয়ে গেছে। এসব জটিলতাও নিরসন জরুরি হয়ে পড়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ২০১৭ সালের ২২ জানুয়ারি রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল, বক্স কালভার্ট অবৈধ দখলমুক্ত করার জন্য ঘোষণা দেন। প্রাথমিকভাবে নন্দীপাড়া-ত্রিমোহনী খাল ও হাজারীবাগ বেড়িবাঁধ এলাকার রাস্তা অবৈধ দখলমুক্ত করার অভিযান চালানো হয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, জলাবদ্ধতা ঢাকা শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা। অথচ নগরীর আশপাশের খালগুলো অবৈধভাবে দখল হয়ে আছে। কেউ কেউ খালের ওপর নির্মাণ করছে বহুতল ভবন। এগুলো পরিষ্কার ও দখলমুক্ত করতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। তাছাড়া খাল দখলকারী কিছু কিছু অবৈধ স্থাপনায় উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সেখানে আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব। জলাবদ্ধতা নিরসন করতে হলে অবশ্যই খালগুলো দূষণ-দখলমুক্ত করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।

অপরদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, খুব দ্রæতই আমাদের প্রতিটি এলাকার জলাধার ও খালগুলোকে দখলমুক্ত করে সচল করা হবে। এটি করতে পারলে নগরীর জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমে যাবে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি কালশী থেকে বাউনিয়া খাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১৮৮ মিটার দীর্ঘ বাইপাস পাইপ ড্রেন সংযোগের উদ্বোধন করা হয়েছে।

আতিকুল ইসলাম বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী সমাধানের জন্য এ অঞ্চলের সব খালকে নিয়ে সমন্বিতভাবে ওয়াসার পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ খালগুলো ওয়াসার অধীন। ডিএনসিসি এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয় এমন সব স্থানে ওয়াসা এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। খালের পাড় ঢাকা জেলা প্রশাসনের অধীন। জেলা প্রশাসককে বলেছি আপনি আসেন, পর্যবেক্ষণ করেন। খালের দু’পাশে যেসব অবৈধ স্থাপনা আছে, এগুলো ভেঙে ফেলা উচিত।

ঢাকা সিটির খালগুলোকে বাঁচানো গেলেই ঢাকাকে বাঁচানো যাবে। তাই প্রতিনিয়ত যেভাবে ময়লা পড়ছে সেভাবে ঠিক প্রতিনিয়ত ময়লা পরিষ্কার করতে হবে ঢাকা ওয়াসাকে। এমন পরামর্শ পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বক্স-কালভার্টগুলো ভেঙে হলেও খাল উদ্ধার করতে হবে। ওয়াসার গাফিলতির কারণে খালগুলো নালায় পরিণত হয়ে অস্তিত্ব হারাচ্ছে। বাপার পক্ষ থেকে খাল উদ্ধারের একটি প্রস্তাব তৈরি করে সরকারের কাছে দেয়ার পরিকল্পনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ওই প্রস্তাবেও দেখানো হয়েছে কত সহজেই রাজধানীর ২৬ খাল উদ্ধার করে সচল রাখা সম্ভব।

এদিকে বর্ষার আগেই রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনকে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। মন্ত্রী বলেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ রাজধানী ঢাকার সারফেস ড্রেন, অগভীর নর্দমাসমূহ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। ঢাকা মহানগরীতে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই উভয় সিটি কর্পোরেশনকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

রাজধানীর জলাবদ্ধতার মূল কারণ নিয়ে সম্প্রতি ঢাকার খালগুলো নিয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন তৈরি করেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন। এতে দেখা গেছে, ঢাকা মহানগরীতে খালের সংখ্যা ৪৩। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসা রক্ষণাবেক্ষণ করে ২৬টি। নয়টি খাল রাস্তা, বক্স কালভার্ট ও ব্রিক সুয়্যারেজ লাইনে পরিবর্তন করা হয়েছে। বাকি আটটি খাল রয়েছে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে।

অধ্যাপক ড.আইনুন নিশাত বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসাকে ননফানশনাল বললে কম হয়ে যাবে। তাদের কোনোরকম জবাবদিহিতা নেই। তবে খালগুলোকে বাঁচাতে হলে ওয়াসাসহ অন্য সব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এক সাথে বসতে হবে।’

ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৫টি খালের ২০ কিলোমিটার ও ৩শ’ কিলোমিটার স্টর্ম ওয়াটার পাইপ ড্রেন পরিষ্কার করছে তারা। এছাড়া চারটি স্থায়ী ও ১৫টি অস্থায়ী পাম্পের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি অপসারণ পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। তাছাড়া ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ড্রেনগুলো পরিষ্কার করছে।

তবে সিটি কর্পোরেশন বলছে, ওয়াসাকে পানি নিষ্কাশনের জন্য পাম্পের সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। পানি যেন দ্রæত ড্রেন দিয়ে চলে যেতে পারে এ জন্য ৩শ’ কিলোমিটার স্টর্ম ওয়াটার পাইপ পরিষ্কার করা হয়েছে। রাস্তার পানি যেন দ্রæত পাইপ ড্রেনে প্রবেশ করতে পারে এ জন্যও ৭০০টি ক্যাচপিট পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার পরিচালক (কারিগরি) এ কে এম সহিদ উদ্দিন বলেন, রাজধানীতে যেন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয় সেজন্য আমরা কাজ করছি। ওয়াসার ৩৭০ কিলোমিটার পাইপ ড্রেন, ১০ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট, চারটি স্থায়ী পাম্পিং স্টেশন এবং ১৬টি অস্থায়ী পাম্পিং স্টেশন আছে। আমরা আমাদের কাজ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর খিলগাঁও রেলগেট ফ্লাইওভারসংলগ্ন ফার্নিচার দোকানগুলোর সামনে ‘খিলগাঁও-বাসাবো’ খালের নাম সংবলিত ঢাকা ওয়াসার একটি ফলক রয়েছে। এতে খাল দখলমুক্ত রাখতে সচেতনতামূলক বিভিন্ন কথা লেখা রয়েছে। তবে ফলকটির আশপাশের কোথাও খালের কোনো অস্তিত্ব নেই। খিলগাঁও-বাসাবো খালটিতে ময়লা পড়ে কয়েক স্তরে ময়লা জমা পড়েছে।

মানবকণ্ঠ/এআইএস




Loading...
ads





Loading...