কয়েক জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি


poisha bazar

  • মানবকণ্ঠ ডেস্ক
  • ১২ জুলাই ২০১৯, ১৭:৫০

টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের আনোয়ারার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পটিয়ার পাহাড়ি ঢলে ৬টি বসতবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। বান্দরবানে পাহাড়ি ঢলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় পনেরো হাজার মানুষ। মুহুরি নদীর বাঁধ ভেঙে ফেনীর দশটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জামালপুরে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে পাঁচ গ্রামের কয়েকশ’ পরিবার।

লালমনিরহাটে তিস্তার পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া উজানের ঢল আর ভারি বর্ষণে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে নীলফামারীতে। সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৯৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

চট্টগ্রাম: টানা বৃষ্টিতে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। আনোয়ারার ১১টি ও কর্ণফুলীর ৫টি ইউনিয়নের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ফলে রাস্তাঘাট ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বৈরাগ, বারশত, জুঁইদন্ডি, রায়পুর, পরৈকোড়া, বরুমচড়া, বারখাইনসহ বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এদিকে কর্ণফুলীর বড়উঠান, চরপাথর ঘাটা, শিকলবাহা, চরলক্ষ্যা ও জুলধা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কয়েকটি সড়ক ভেঙে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে এলাকার অনেক স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা। এছাড়া শতাধিক পুকুরের মাছের পোনা পানিতে ভেসে গেছে। আনোয়ারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসানুজ্জামান বলেন, উপজেলায় সবজি ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কত হেক্টর ক্ষতি হয়েছে বৃষ্টি শেষ হলে তা জানা যাবে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ সহায়তার আশ্বাস দেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জোবায়ের আহমেদ ও কর্ণফুলী উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরী।

পটিয়ায় অতি বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে বর্তমানে উপজেলার ভাটিখাইন, কচুয়াই, খরনা, কেলিশহর, হাইদগাঁও, আশিয়া, কাশিয়াইশ এলাকার নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কচুয়াই ইউনিয়নের পারিগ্রাম এলাকায় বুধবার রাতে ৬টি বসত ঘর পাহাড়ি ঢলের পানিতে বিলীন হয়ে গেছে। পানিতে মাটির বসত ঘর ভেঙে যাওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। পঞ্চাশ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে নগদ অর্থ ও শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। উপজেলার হাইদগাঁও, কচুয়াই, কেলিশহর, খরনা, কচুয়াই, ছনহরা, ভাটিখাইন, হাবিলাসদ্বীপ, জঙ্গলখাইন, বড়লিয়া, দক্ষিণ ভ‚র্ষি, ধলঘাট, আশিয়া, কাশিয়াইশ, কোলাগাঁও এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল হাসান জানান, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১০ মে.টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

বান্দরবান: ভারি বর্ষণে পাহাড়ি ঢলের পানিতে পৌর এলাকাসহ লামার নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। মাতামুহুরী নদী, লামা, বমু, ইয়াংছা, বগাইছড়ি, ইয়াংছা ও পোপা খালসহ পাহাড়ি ঝিরিতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধস দেখা দিয়েছে। মাতামহুরী নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ ৫৫টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। লামা পৌর এলাকার নয়াপাড়া, বাসস্ট্যান্ড, টিএন্ডটি পাড়া, বাজারপাড়া, গজালিয়া জিপ স্টেশন, লামা বাজার, চেয়ারম্যান পাড়া, ছোট নুনারবিলপাড়া, বড় নুনারবিলপাড়া, উপজেলা পরিষদের আবাসিক কোয়ার্টার, থানা এলাকা, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছা বাজারসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের কিছু নিচু এলাকা প্লাবিত হয়। লামা আলীকদম সড়কের কেয়ারারঝিরি পানিতে ডুবে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এদিকে খাল ও ঝিরির পানি বৃদ্ধি পেয়ে লামা সদর, গজালিয়া, ফাইতং, ফাঁসিয়াখালী, আজিজনগর, সরই ও রুপসীপাড়া ইউনিয়নের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে।

ফেনী: ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারি বর্ষণে মুহুরী নদীর বাঁধ ভেঙে পশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার দশটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে মুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ১.৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পশুরামের শালধর, দুর্গাপুর, ফুলগাজীর, জয়পুর, কিসমত ঘনিয়ামোড়া, দুর্গাপুর, রামপুর ও পশ্চিম ঘনিয়া মোড়া গ্রাম তলিয়ে গেছে। চিথলিয়া ইউনিয়নের উত্তর শালধর, দক্ষিণ শালধর, মালিপাথর, নিলক্ষী, দেরপাড়া গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ফুলগাজীতে বন্যার পানিতে উত্তর শ্রীপুর,নিলক্ষী,পশ্চিম ঘনিয়ামোড়া,কিসমত ঘনিয়া মোড়া,জয়পুর,সাহাপাড়া ও বৈরাগপুর প্লাবিত হয়েছে। কয়েকটি মৎস খামারসহ পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। পশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাসেলুল কাদের জানান, ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ ও এলাকা পরির্দশন করা হয়েছে। উপজেলায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।

জামালপুর: বকশিগঞ্জ উপজেলায় অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় বাঁধ ভেঙে ৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কামালপুর ইউনিয়নের সাতানীপাড়া, বালঝুড়ি, কনেকান্দা, সোমনাথ পাড়াসহ ৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বাক্কার মোড় বন্যা নিয়ন্ত্রণকারী বাঁধ ভেঙে ২০টি পুকুর, ২টি মাছের প্রকল্প ও অসংখ্য বীজতলা পানিতে ডুবে গেছে। বকশিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেওয়ান মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানান, দ্রæত সময়ের মধ্যে বাঁধটি সংস্কার করা হবে।

লালমনিরহাট: টানা চার দিনের ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। তিস্তা ও ধরলা নদীর চরাঞ্চল ও নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৮০ সেন্টিমিটার। যা স্বাভাবিক ৫২ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার। পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, সিংগিমারী, ডাউয়াবাড়ী, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, কাকিনা,আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, গোকুন্ডা, কুলাঘাট ও মোগলহাট ইউনিয়নের তিস্তা ও ধরলার নদীর চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এসব ইউনিয়নের প্রায় ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলী হায়দার বলেন, ৬৮ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

নীলফামারী: উজানের ঢল আর ভারি বর্ষণে নীলফামারীতে নয়শ’ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। টেপাখড়িবাড়ি, চরখড়িবাড়ি ও পূর্ব খড়িবাড়ি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জলঢাকা উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের বানপাড়ায় তিস্তার ডানতীর রক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এলাকার কয়েক হাজার মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। বাঁধ রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড বস্তায় বালু ভরে জিওব্যাগ ফেলে রক্ষার চেষ্টা করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হাফিজুল হক জানান, বাঁধের ৬০ মিটার পর্যন্ত ভাঙন দেখা দিয়েছে, জিওব্যাগ ফেলে রক্ষার চেষ্টা চলছে। বাঁধটি স্থায়ীভাবে রক্ষার জন্য প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ: সুরমা নদীর পানি ৯৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জে ১৬৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। শহরের বড়পাড়া, নবীনগর, উকিলপাড়া, মধ্যবাজারে পানি প্রবেশ করেছে। নতুনপাড়া, বিলপাড়, ষোলঘর এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সদর উপজেলার জাহাঙ্গীর নগর, সুরমা, গৌরারং, মোহনপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কের ৬ কিলোমিটার ডুবে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভুইয়া মানবকণ্ঠকে জানান, সুরমা নদীর পানি ষোলঘর পয়েন্টে বিপদসীমার ৮৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সীমান্ত ও যাদুকাটা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. ফরিদুল হক জানান, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার ও সদর উপজেলায় আড়াই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ২শ’ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এআইএস




Loading...
ads




Loading...