বিশ্ব শান্তি সূচকে পিছিয়েছে দেশ: ১৬৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০১তম


poisha bazar

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ১২ জুলাই ২০১৯, ১৭:২৯

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, রেমিট্যান্স কিংবা সামাজিক উন্নয়নে দেশ এগিয়ে গেলেও শান্তি সূচকে পিছিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস’-এর (আইইপি) বৈশ্বিক শান্তি সূচকে (জিপিআই) এবার ১৬৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০১তম। গত বছর ছিল ৯৩তম। গত বছরও এ সূচকে ৯ ধাপ পিছিয়েছিল দেশ। সে বছর এর প্রধান কারণ হিসেবে রোহিঙ্গা সঙ্কটকে চিহ্নিত করেছিল আইইপি।

২০০৮ সাল থেকে শান্তিপূর্ণ দেশের শীর্ষে থাকা আইসল্যান্ড বরাবরের মতো এবারো প্রথম স্থান ধরে রেখেছে। এর পরে আছে নিউজিল্যান্ড, পর্তুগাল, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, কানাডা, সিঙ্গাপুর, সেøাভেনিয়া, জাপান ও চেক প্রজাতন্ত্র। সিরিয়াকে পেছনে ফেলে এবার বিশ্বের সবচেয়ে অশান্তির দেশ হয়েছে আফগানিস্তান। সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে থাকা দশ দেশের বাকি ৯টি হলো সিরিয়া, দক্ষিণ সুদান, ইয়েমেন, ইরাক, সোমালিয়া, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, লিবিয়া, ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো ও রাশিয়া।

আইইপি বলছে, গত বছর বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ২৯৭.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার; যা মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ ভাগ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বস্তিতে বসবাসরতদের ৮১ শতাংশই জলবায়ু উদ্বাস্তু। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে তারা নিজেদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে ঢাকার বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে ১৬ শতাংশ ভ‚মি হারিয়ে যাবে। সূচকে বিশ্বের স্বাধীন ১৬৩টি দেশের নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন, অর্থনৈতিক মূল্য, ট্রেন্ড এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে দেশগুলোর নেয়া পদক্ষেপের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এ সূচক তৈরি করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের চেয়ে পিছিয়ে আছে। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে এবার শীর্ষে অবস্থান করছে ভুটান। সূচকে তাদের অবস্থান ১৫তম। তাদের পরে জায়গা পেয়েছে ৭২ নম্বরে থাকা শ্রীলঙ্কা। প্রথম ২০টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে ভুটান। গত ১২ বছরে তারা এগিয়েছে ৪৩ ধাপ। জিপিআইর গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিকভাবে সীমিত আকারে শান্তি বেড়েছে। দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর সহিংসতা কী ধরনের প্রভাব ফেলছে তা সূচক গণনায় বিবেচনা করা হয়েছে। ২০১৮ সালে সংঘাত-সহিংসতার কারণে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১৪.১ ট্রিলিয়ন ডলার। এই অঙ্ক বিশ্বের মোট উৎপাদনের ১১.২ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ২০১৮ সালে বাংলাদেশসহ ৯টি দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা মারাত্মক ব্যাহত হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে এ দেশের এক কোটি ৮০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশ ১৬ শতাংশ ভ‚মি হারানোর শঙ্কায় আছে। জলবায়ু পরিবর্তন আগামী দিনে বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটি মানুষের জীবন উচ্চ ঝুঁকিতে আছে। এরই মধ্যে তাদের ৪০ শতাংশ লড়াই ও সংঘাতে জড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সংঘাত এড়াতে যে বিপুল সংখ্যক মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রাণ হাতে পালাতে হচ্ছে, তা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশ প্রায়। সাম্প্রতিক ইতিহাসে আর কখনো এত বেশি মানুষকে শরণার্থী হতে হয়নি। সমাজে বিদ্যমান অপরাধ প্রবণতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দ্ব›দ্ব-সংঘাত, সংঘাতে মৃত্যু, বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা, অস্ত্রের বিস্তারসহ বেশ কিছু বিষয়ে মূল্যায়ন করেছে ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আইইপির চেয়ারম্যান স্টিভ কিলেলিয়া বলেন, ‘বৈশ্বিক শান্তিতে জলবায়ু পবির্তন বড় ধরনের অন্তরায় হতে চলেছে। কোন দেশগুলো উচ্চ ঝুঁকিতে আছে, কী ধরনের ঝুঁকিতে আছে এবং কী ধরনের প্রভাব হতে পারে- এসবে নজর দিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে।’ মধ্যপ্রাচ্যের দ্ব›দ্ব-সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ এবং ভয়াবহ আকারে বিশ্বব্যাপী শরণার্থী বাড়ার কারণে গত ১০ বছরের মধ্যে এখন সবচেয়ে কম শান্তি বিরাজ করছে। সূচকটি মূলত এক থেকে পাঁচের মধ্যে করা হয়েছে, এক হলো সেরা শান্তিপূর্ণ এবং পাঁচ হলো সবচেয়ে অশান্তির দেশ। মোটামুটি ২৩টি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এই গবেষণা সূচক তৈরি করা হয়েছে। স্টিভ কিলেলিয়া বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবই আমাদের কাছে মূল সমস্যা মনে হয়েছে। কিছু দেশে যা দুশ্চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর অতিক্রম করেছে, আবার কিছু দেশ অবশ্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে এক দেশের প্রতি আরেক দেশের সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

তিনি আরো যোগ করেন, যদি না এই বিশ্বাস এবং সহযোগিতা বাড়ানো যায়, তাহলে এসব সমস্যা থেকে মুক্ত হওয়া অসম্ভব, তেমনি শান্তিও আসবে না।

ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, চলতি বছরের শান্তি সূচকে বিশ্বজুড়েই সামান্য পরিমাণে শান্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। গড়ে ০.০৯ শতাংশ হারে শান্তি বেড়েছে। ১৬৩টি দেশের মধ্যে ৮৬ দেশে শান্তি বাড়লেও কমেছে ৭৬টিতে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, কিছু জায়গায় শান্তির উপলব্ধি বেড়েছে, আবার অন্য জায়গায় কমেছে। ২০০৮ সালের তুলনায় এখন বিশ্বের আরো বেশি সংখ্যক মানুষ মনে করছেন যে, তারা জীবনে অধিক স্বাধীনতা পাচ্ছেন, জীবন নিয়ে অধিকতর সন্তুষ্ট ও তাদের সঙ্গে আরো সম্মানসূচক আচরণ করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট (ডবিøউআরআই) বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনই সংঘাত-ঝুঁকির মূল কারণ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিষ বাপনা বলেন, ‘আমরা জানি যে, পরিবেশগত অবনমন এবং পানির চাপের কারণে সারাবিশ্বে ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ এবং বাস্তুচ্যুতি ঘটছে। ফলে অর্থনীতিক এবং রাজনীতিক অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে, যা শরণার্থী সমস্যা এবং দ্ব›েদ্বর সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যাটিই মূলত বর্তমান বৈশ্বিক শান্তি সূচকের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে- যা চরম আশঙ্কার এবং কিভাবে এটা নিরসন করা যায়, তা নিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।

মানবকণ্ঠ/এআইএস




Loading...
ads





Loading...