মুখ থুবড়ে পড়ছে সোলার মিনি গ্রিড


poisha bazar

  • আসাদ জোবায়ের
  • ১২ জুলাই ২০১৯, ০৯:২৯,  আপডেট: ১২ জুলাই ২০১৯, ১৬:৫৯

আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম একটা ভিশন ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়া। আর টেকসই উন্নয়ন তথা এসডিজি অর্জনের জন্য মোট বিদ্যুতের ১০ শতাংশ রিনিউয়েবল এনার্জি থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনাও সরকারের। এক্ষেত্রে দূরবর্তী দ্বীপ অঞ্চলে বিশ্বব্যাংকের গ্রান্ট ও ব্যক্তিউদ্যোগে স্থাপন করা হয় সোলার মিনি গ্রিড।

তবে কয়েক বছরের মধ্যে এই উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে একটি মিনি গ্রিড। অন্যগুলোয় লোকসানে পড়ে উদ্যোক্তাদের গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইডকলের মডেল অনুযায়ীই এসব মিনি গ্রিড স্থাপন করা হয়েছে। তবে এই মডেলে টেকনিক্যাল ভুল থাকায় কাক্সিক্ষত বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না কোনো মিনি গ্রিডেই। এর মধ্যে আবার একই অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করছে পিডিবি ও আরইবি।

এমনই এক প্রকল্প স›দ্বীপ মিনি গ্রিড। যেখানে পিডিবি বিদ্যুতের লাইন নিয়ে যাওয়ায় মিনি গ্রিডটি দুই মাস আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। যদিও উদ্যোক্তাদের এই ক্ষতি কিভাবে পুষিয়ে দেয়া হবে এ ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বিদ্যুৎ বিভাগ। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০ বছরের জন্য এসব মিনি গ্রিড স্থাপনের আগে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) থেকে এনওসি নেয়া হয়েছিল। সেখানে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, এসব অঞ্চলে আরইবি ও পিডিবির বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। অথচ কয়েক বছরের মধ্যেই বেশ কয়েকটি অঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া শুরু করেছে এ দুটি প্রতিষ্ঠান। এতে সোলার মিনি গ্রিডের গ্রাহকরা স্বল্পমূল্যে সরকারি বিদ্যুতের সংযোগ নিচ্ছে। অন্যদিকে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এখন হাহুতাশ করছেন উদ্যোক্তারা।

তবে এসব মিনি গ্রিডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। মাস তিনেক আগে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এ বিষয়ে কথা হয় বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ আলাউদ্দীনের সঙ্গে। যিনি বিদ্যুৎ বিভাগের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত। তিনি বলেন, সরকার এ ব্যাপারে ইতিবাচক। সে ডার (টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি কতৃপক্ষ) নেতৃত্বে একটি কমিটি করে দেয়া হয়েছে। মিনি গ্রিডগুলোর বিদ্যুৎ কোনো প্রক্রিয়ায় সরকার কিনে নিতে পারে, তা কমিটি নির্ধারণ করবে। তবে সেস্য সিদ্দিক জোবায়ের বললেন, সে ডার নেতৃত্বে কোনো কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়নি। বিদ্যুৎ সচিবের নেতৃত্বে একটি বৈঠকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয় বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ আলাউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠনের। তবে কমিটি গঠন হয়েছে কিনা আমি জানি না। দেশের প্রথম সোলার মিনি গ্রিড প্রকল্প স›দ্বীপে স্থাপন করা হয় ২০১০ সালের অক্টোবরে।

এটিকে একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এতে বিনিয়োগ করেছে পূরবী গ্রিন এনার্জি লিমিটেড। ২০ বছরের এই প্রকল্পের ৮ বছর যেতেই সেখানে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে সংযোগ নিয়ে যায় পিডিবি। এই সংযোগ স্থাপনের কাজ শুরু হওয়া থেকেই সোলার মিনি গ্রিডের গ্রাহকরা বিদ্যুতের বিল পরিশোধে গড়িমসি শুরু করে। ফলে আর্থিকভাবে চরম সঙ্কটে পড়ে যায় মিনি গ্রিডটি। এরপর পিডিবির লাইন স্থাপন হলে একে একে সব গ্রাহক সেই লাইনের সংযোগ নেয়। দুই মাস আগে মিনি গ্রিডটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসমা হক এ প্রসঙ্গে বলেন, বিশ্বব্যাংকের গ্রান্টের পাশাপাশি আমরা ৫ জন উদ্যোক্তা মিলে সোয়া কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি। এ ছাড়া এক কোটি ৭০ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছিল ইডকল। আমরা এই ৯ বছরে একটি টাকাও সেখান থেকে নিজেরা নিতে পারিনি। উপরন্তু ইডকলের ঋণ আমরা অন্য জায়গা থেকে টাকা এনে পরিশোধ করেছি। আমাদের এই দুর্দশায় রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইডকল একটুও ছাড় দেয়নি। অথচ তাদেরই ফর্মুলা অনুযায়ী আমরা সেখানে বিনিয়োগ করেছিলাম।

তিনি বলেন, আমরা এখন চাই পিডিবি এই মিনি গ্রিড পুরোপুরি কিনে নিক। এটি একটি পাইলট প্রকল্প। পাইলটিংয়ের জন্য সরকারকে অর্থ খরচ করার দরকার ছিল। তা না করে আমাদের ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। আমরা এর প্রতিকার চাই। এদিকে শরীয়তপুরের নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার চরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার কাজ শুরু করেছে আরইবি। নড়িয়া উপজেলার নওয়াপাড়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার কাচিকাটা ইউনিয়নের পুরোটাই সোলার মিনি গ্রিডের আওতায় রয়েছে। সোলার ইলেক্ট্রো বাংলাদেশ (এসইবিএল) এই দুটি মিনিগ্রিডের উদ্যোক্তা। নওয়াপাড়ায় ২৫০ কিলোওয়াটের মিনি গ্রিডে ৬০০ সংযোগ রয়েছে। সক্ষমতা রয়েছে ১৩০০ সংযোগের। ৩০০ হাজার মানুষ এখানে বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। সোলার বিদ্যুতেই চলছে একটি ডকইয়ার্ড, দুটি বরফকল, ৫টি ওয়ার্কশপসহ দুটি বড় বাজার। অন্যদিকে কাচিকাটার ২৫০ কিলোওয়াটের মিনি গ্রিডে ৬৫০ সংযোগ রয়েছে। এখানে দুটি বরফকল, ৭টি ওয়ার্কশপ, দুটি বড় হাট ও দুটি ঘাট চলছে এই বিদ্যুতে।

জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি এক চিঠিতে আরইবির চেয়ারম্যান জানিয়েছিলেন এ দুটি এলাকায় তাদের বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনো পরিকল্পনা নেই। তিন বছর পরেই সেখানে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ নিয়ে যাওয়া শুরু করেছে আরইবি। একইভাবে নারায়ণগঞ্জের নুনের টেক ও নরসংদীর পাড়াতলীর সোলার মিনি গ্রিড এলাকায় আরইবি বিদ্যুৎ নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। শরীয়তপুরের সোলার মিনি গ্রিড দুটির উদ্যোক্তা এসইবিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম মজিবর রহমান মানবকণ্ঠকে বলেন, একে তো ইডকলের টেকনিক্যাল ডিজাইনে সোলার মিনি গ্রিড স্থাপন করে আমরা লোকসানে পড়েছি, তার মধ্যে আবার আরইবি ঢুকে পড়ছে।

এখন মিনি গ্রিডগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চিন্তিত। সরকার একটি কমিটি করেছে শুনেছি, কিন্তু তার কোনো অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। এ প্রসঙ্গে আরইবি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মঈন উদ্দিন বলেন, তিন-চারশ’ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে সোলার মিনি গ্রিড থেকে। এজন্য তো আমরা বাকি হাজার হাজার মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারি না। মিনি গ্রিডগুলোর ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ এ ব্যাপারে একটি কমিটি করে দিয়েছে। এই কমিটি যা সিদ্ধান্ত নেবে তাই আমরা বাস্তবায়ন করব। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ১৩টি সোলার মিনি গ্রিড অপারেশনে আছে। তবে প্রতিটি মিনি গ্রিডের টেকনিক্যাল ডিজাইনে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে বলে ধরা হয়েছিল তার অর্ধেকও উৎপাদন হচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে মনপুরা সোলার মিনি গ্রিডের কথা উল্লেখ করেন এসইবিএল-এর এমডি মজিবর রহমান। এটিরও উদ্যোক্তা তিনিই। সোলার মিনি গ্রিড অ্যাসোসিয়েশনের এই সভাপতি বলেন, মনপুরা প্রকল্পে ইডকল আমাদের বলেছিল বছরভর প্রতিদিন ৬৫২ ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। বছরের বিভিন্ন ঋতুর সূর্যালোকের তারতম্য, বৃষ্টি, কুয়াশাসহ সিস্টেম ও জেনারেশন লসকে বিবেচনায় না নিয়ে সরল অঙ্কে এই হিসাব আমাদের ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে এটি ছিল সম্পূর্ণ ভুল।

তিনি বলেন, মনপুরায় এখন শতভাগ লোড রয়েছে। এই অবস্থায় আমরা সর্বোচ্চ ৫০০ ইউনিট এবং কোনো কোনো দিন ৫০ ইউনিটও বিদ্যুৎ পেয়েছি। গড়ে যা ৩০০ ইউনিটের বেশি হবে না। অর্থাৎ ইডকলের হিসাবের ৪৫ শতাংশ বিদ্যুৎ পাচ্ছি আমরা। অন্যান্য মিনি গ্রিডেরও একই অবস্থা। ফলে লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রতি মাসেই। অন্য ফান্ড থেকে টাকা এনে ইডকলের ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে আমাদের। এই নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ে আমরা এখন সরকারের কাছে এক্সিট পলিসি চাই। সরকার এখন এগুলো কিনে নিলে আমরা বেঁচে যাই।

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads




Loading...