থামছেই না শিশু নির্যাতন


poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ০৯ জুলাই ২০১৯, ০৯:৫৮,  আপডেট: ০৯ জুলাই ২০১৯, ১০:৩০

শিশু সায়মাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাটি পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে এমন ঘটনায় নিন্দার ঝড় উঠেছে। পাশাপাশি দাবি উঠেছে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। যাতে অপরাধীর ভেতরে ভীতি সঞ্চার হয় যে এ ধরনের জঘন্য কাজ করলে কারো ছাড় নেই। তাকে শাস্তি পেতেই হবে। শুধু সায়মা নয়, সম্প্রতি শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে।

মানুষরূপী দানবদের কারণে এ পরিসংখ্যানে প্রতিদিন একটির পর একটি ঘটনা যোগ হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী, মানবাধিকারকর্মী ও আইনজ্ঞসহ সমাজের সব পেশা-শ্রেণির মানুষের দাবি এখন একটাই, শিশুদের ওপর বন্ধ হোক নির্যাতন। শাস্তি হোক দানবের। এমন শাস্তি হোক যার ফলে আরেকটি ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। গত শুক্রবার রাতের ঘটনা। রাজধানীর ওয়ারীর বনগ্রামে সাত বছরের শিশু সামিয়া আফরিন সায়মাকে ছাদ ঘুরিয়ে দেখানোর কথা বলে নিয়ে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে ঘাতক হারুন অর রশিদ।

নৃশংস ঘটনার সময় গলায় দড়ি পেঁচিয়ে টেনেহিঁচড়ে সায়মাকে রান্নাঘরে রেখে পালিয়ে যায় সে। ঘাতককে গত শনিবার রাতে গ্রেফতারের পর গতকাল আদালতে নেয়া হলে স্বীকারোক্তি দেয়। একই দিন বরিশালের গৌরনদীতে ছয় বছরের একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর আগে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে মিজমিজি অক্সফোর্ড হাইস্কুলের শিক্ষক আরিফুল ইসলামকে অন্তত ২০ ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার হয়। এর কয়েকদিন পরে ফতুল্লার বায়তুল হুদা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আল আমিনকে ১২ জন শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

এভাবে রাজধানীসহ সারাদেশে একের পর বর্বরতার শিকার হচ্ছে অবোধ শিশু ও শিশু শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের নারীরা। দেশজুড়ে বেড়েই চলছে যৌন হয়রানি। বাড়ির আঙিনা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েশিশুরা কোথাও যেন নিরাপদ নয়। দু-একটি ঘটনার প্রতিবাদ করলে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অভিযুক্ত ধর্ষক-শিক্ষক গ্রেফতার হচ্ছে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, শিশু ও নারীদের ওপর এ বর্বরতা শেষ কোথায়? চীন সফর শেষে গতকাল গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনেও বিষয়টি উঠে আসে। ধর্ষণ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি পুরুষদেরও সোচ্চার হওয়ার তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী।

সমাজ বিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকরা বলছেন, কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক সাজার অভাবে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ। এসব রোধে সমাজে সংস্কৃতি চর্চা যেমন বাড়াতে হবে তেমনই সহশিক্ষার প্রসারেও গুরুত্ব দিতে হবে। এ ছাড়া কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের কাউন্সিলিং প্রয়োজন। এ ছাড়া ধর্ষণের হাত থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক তেমন কোনো ব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই বলে মনে করেন ঢাকায় জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ শাবনাজ জাহিরিন।

বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাসে দেশে ৩৯৯ জন শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর একজন ছেলে শিশুসহ মোট ১৬ জন শিশু মারা গেছে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম সম্প্রতি দেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনক বেড়ে যাওয়ায় শিশুদের প্রতি চলমান সহিংসতা ও নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

অপরদিকে বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুদের হত্যা ও নির্যাতনের সংখ্যা আশঙ্কাজনক বেড়েছে। গত ছয় মাসে ৮৯৫ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে যৌন হয়রানিসহ নানা কারণে ১০৪ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে, ৪০ জন আত্মহত্যা করেছে। গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩৯ জন শিশু। গত দুই সপ্তাহে দেশে কমপক্ষে ১৫টি যৌন অপরাধ ঘটেছে যার বেশিরভাগ ঘটনার শিকার শিশুরা।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে দুই হাজারের বেশি নারী ও মেয়েশিশু নির্যাতনের শিকার হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩১ জন। গণধর্ষণ, ধর্ষণের পরে হত্যাসহ অন্যান্য নির্যাতনের হারও অন্য সময়ের চেয়ে বেশি। গতকাল সোমবার সকালে সেগুনবাগিচার সুফিয়া কামাল ভবন মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা এই সংগঠনটি।
র‌্যাব ও পুলিশ সূত্র জানায়, রাজধানীর ভাটারার জগন্নাথপুর এলাকায় কিশোরী কন্যাকে ধর্ষণের অভিযোগে ১৯ মে সৎবাবা রুবেলকে গ্রেফতার করা হয়।

এর আগে ৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মালিবাগে ১০ বছরের এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে তার বাবার নাম সাহেদুল্লাহ চিশতীর বিরুদ্ধে। শিশুর মা এ অভিযোগ করেন। সাহেদুল্লাহ চিশতী সাবেক সেনাকর্মকর্তা। আড়াই বছর আগে তাদের আইনগতভাবে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর থেকে মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় থাকতেন শিশুটির মা। তবে শিশুটির বাবা ঘটনা অস্বীকার করেছেন।

শিশু নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা মানবকণ্ঠকে বলেন, শিশু ও শিক্ষার্থীদের ধর্ষণসহ এসব সামাজিক অপরাধ বন্ধে তৎপর রয়েছে পুলিশ। একজন পেশাদার অপরাধী না হয়েও শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থে এমন জঘন্য অপরাধ করছে কেউ কেউ। এ থেকে অনেক সময় বড় অপরাধ ঘটে যায়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশু ধর্ষক ও হত্যাকারীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনছে পুলিশ। তাদের যাতে কঠোর শাস্তি হয় পুলিশ সেজন্য তৎপর রয়েছে।

চলতি বছরের ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে ডেকে ভবনের ছাদে নিয়ে শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করে। এর আগে নুসরাত তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা করে। এ ঘটনায় সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পরে প্রায় সব ঘাতকদের গ্রেফতারে সক্ষম হয় পুলিশ। এর রেশ কাটতে না কাটতেই নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে মিজমিজি অক্সফোর্ড হাইস্কুলের শিক্ষক আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। শুধু ওই শিক্ষার্থী নয়, ধর্ষণের ভিডিও ফুটেজ ওই শিক্ষক অন্য শিক্ষার্থীদেরও দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করতেন। এই অভিযোগ পাওয়ার পর র‌্যাব-১১ এর একটি টিম ২৭ জুন সেই শিক্ষককে গ্রেফতার করে।

গত বছরের ১৮ জুলাই গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের বারবৈকা শাহ আলম বাড়ি এলাকার একটি জঙ্গল রথকে সাড়ে তিন বছর বয়সী এক কন্যাশিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। শিশুটিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে জানায় পুলিশ। ৭ জানুয়ারি সাতক্ষীরার আশাশুনি গাবতলা গ্রামে ধর্ষণের পর এক শিশুকে পানিতে ফেলে হত্যা করা হয়। ২৯ জানুয়ারি গাজীপুরে পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এর আগে গোসল করতে গিয়ে নিখোঁজ হয় শিশু তাহি। বিকেলে তার লাশ পাওয়া যায় একটি ঝোপের ভেতর।

এর আগে শিক্ষার্থীদের ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা দেশের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুলেও ঘটেছে ২০১১ সালে। স্কুলের শিক্ষক পরিমল জয়ধর বাসায় প্রাইভেট পড়ানোর সময় এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করে ও ওই ভিডিও ফুটেজ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। এ নিয়ে ওই সময় সারাদেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এর পরই পরিমল জয়ধরকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

শিশু ও শিক্ষার্থীদের ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, অপরাধ দমনে প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ। এসব ক্ষেত্রে অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার করতে হবে। তিনি বলেন, পাশাপাশি আমাদের দেশে যে সহশিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে যৌন হয়রানি হয় না। আমাদের এখানে খেলার মাঠ নেই। সরকারের উচিত বড় শহরে যতগুলো অ্যাপার্টমেন্ট হবে, সেখানে একটা ফ্লোর বাচ্চাদের খেলার জন্য রাখে। ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নুরজাহান খাতুন মানবকণ্ঠকে বলেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ মামলায় অপরাধীর সাজা হয়। আইনে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হওয়ার কথা বলা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিচার পেতে ভিকটিমকে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়।

তিনি আরো বলেন, সামাজিকভাবে যৌন আচরণগুলো আমরা গোপন বিষয় বলে মনে করি। এটা সম্পর্কে শিশুকে সচেতন করে তুলি না। বিচারহীনতার কারণে অভিভাবকরা এসব ঘটনার প্রতিবাদও করেন না। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষকদের কাউন্সিলিং করা প্রয়োজন। শিশু ধর্ষণ রোধে যেসব ঘাটতি রয়েছে দেশে

বাংলাদেশে ধর্ষণের হাত থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই বলে মনে করেন ঢাকায় জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ শাবনাজ জাহিরিন। সম্প্রতি তিনি আন্তর্জাতিক একটি সংবাদ সংস্থাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ধর্ষণ রোধ করে শিশুদের নিরাপদ রাখার জন্য যে ধরনের অবকাঠামো, লোকবল বা সেবা দরকার সেগুলো এখনো অনেক কম। সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষ করে কমিউনিটি লেভেলে যে ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকার প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলো এখনো কার্যকর নয়।

শাবনাজ জাহিরিনের, কিছু লোকজন আছে শিশুদের বিষয়ে বা এ ধরনের ঘটনাকে সেভাবে আমলে নেন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামাজিক কল্যাণ কার্যক্রমের পক্ষ থেকে সোশ্যাল ওয়ার্কারদের থাকার কথা, কমিউনিটি লেভেলে ও প্রবেশন অফিসার যার একটা বিশেষ দায়িত্ব আছে, অনেক জায়গায়ই তারা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।

তিনি বলেন, এরা ভালোভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না ও শিশুদের বিষয়গুলো যেভাবে দেখা উচিত বা কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম থাকা উচিত সেগুলো এখনো ওইভাবে আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। উন্নতবিশ্বে স্কুলে শিশুদের নিরাপত্তার উদাহরণ দিয়ে বলা হয়ে থাকে যে সেসব দেশে কোনো স্কুলে কোনো শিশুর সাথে দেখা করতে হলে আগে তার একটা ছবি তোলা হয়, একটা কার্ড দেয়া হয় এবং কেউ সাথে করে স্কুলের ভেতরে নিয়ে যায়। যাতে অন্য শিশুদের সমস্যা না হয়। বাংলাদেশে ফ্ল্যাট বাসায় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের রক্ষায় এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই।

মানবকণ্ঠ/এএম

 




Loading...
ads




Loading...