তারা অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে, স্বামীর কবরে মাটি পর্যন্ত দিতে দেয়নি : মিন্নি


poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৯ জুন ২০১৯, ১৫:০৭,  আপডেট: ২৯ জুন ২০১৯, ১৫:১৫

বরগুনায় প্রকাশ্য রাস্তায় রিফাত হত্যার ভিডিওতে দেখা গেছে, তার স্ত্রী মিন্নি ঘাতকদের ঠেকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সম্প্রতি অনেকেই দোষারোপের আঙুল তুলছেন তারই দিকে!

রিফাত শরীফ খুনের পর স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে জেলা আওয়ামী লীগের নেতা সুমন দেবনাথ একটি ফেসবুক পোস্টে রিফাত হত্যায় স্ত্রী মিন্নিকে 'মূল ভিলেন' হিসেবে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি লিখেছেন, বিভিন্ন খবর ও মিডিয়াতে যাকে এখন হিরো বানানো হচ্ছে, মূল ভিলেন সে নিজেও হতে পারে। রিফাত শরীফের বন্ধুদের থেকে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে তাতে এটাই বোঝা যায়।

এ ব্যাপারে সুমনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাকে ফোন পাওয়া যায়নি।

অপর একটি স্ট্যাটাসে স্থানীয় আইনজীবীদের রিফাত হত্যায় জড়িতদের পক্ষে না দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। এছাড়া, রিফাতে স্কেচ ও ছবি পোস্ট করে নিহত রিফাতকে স্মরণ করেছেন। রিফাতের নৃশংস খুন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেবনাথের দুইটি স্ট্যাটাস পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে দেয়া হলো:

১.
''প্রথমেই আমরা স্পষ্ট হবো নাম নিয়ে, কারণ যে মারা গেছে আর যারা মেরেছে তাদের নাম এক হওয়াতে আমরা গুলিয়ে ফেলছি। কাকতালীয়ভাবে দুই জনের বাবার নামও এক। যে ছেলেটিকে হত্যা করা হলো তার নাম রিফাত শরীফ, পিতার নাম দুলাল শরীফ, সাং ৬ নং ইউনিয়ন।

আর হত্যাকারীদের মধ্যে প্রধান হচ্ছে নয়ন, এবং তার সহযোগীরা হচ্ছে রিফাত ফরাজী, পিতা দুলাল ফরাজী, সাং বরগুনা ধানসিঁড়ি রোড। এবং রিফাতের ছোট ভাই রিসান ফরাজী, পিতা ও সাং: ওই

এই রিফাত ও রিশানের অন্য একটি পরিচয় রয়েছে, তারা দুজনই সাবেক সাংসদ ও বর্তমান জেলা চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে। যারা আদর করে তাকে বাবা বলেই সম্মোধন করে।

রিফাত ও নয়নদের আরও একটি পরিচয় আছে, তারা অত্র এলাকায় এমন কোন ছাত্রাবাস নাই যেখান থেকে ছাত্রদের ল্যাপটপ, মোবাইল, টাকা ইত্যাদি ছিনতাই এবং চুরি করে নিয়ে আসেনাই। এ নিয়ে বহুবার মামলা হয়েছে, বহুবার জেল খেটেছে, কিছুদিন পর আবার ছাড়াও পেয়েছে। তাদের নামে কতোগুলো মামলা রয়েছে তা থানা কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবেন।

নয়ন (নয়ন বন্ড) সবথেকে বেশি নজরে এসেছে তখন যখন নয়ন একটি বড় ধরনের মাদক মামলায় গ্রেফতার হয়েছিল প্রায় ১২ লক্ষ টাকার মাদক পুলিশ উদ্ধার করে নয়নের কাছ থেকে। রিফাত ফরাজীর বিভিন্ন অপকর্মের নালিস থানায় দেয়ার পাশাপাশি তার খালু জেলা চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের কাছেও দেয়া হয়েছিল, কিন্তু বারবার নালিশকারিদের সেখান থেকে অপমান, অপদস্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের মধ্যে একজনার নাম তরিকুল ইসলাম ২০১৭ সালে একবার এই রিফাত আর রিসান ফরাজী সামান্য কথাকাটিতে তাকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করেছিল, এনিয়ে তরিকুলের বাবা বাদি হয়ে থানায় মামলাও করেছিলো। বিচার নিয়ে গিয়েছিলো তার খালু দেলোয়ার হোসেনের কাছে। কিন্তু অপমান হয়ে ফিরতে হয় তাদের। এর পরে ভয়ে সে তার ছেলেকে বরিশালে পড়ালেখা করতে পাঠিয়ে দেয়। বর্তমানে তরিকুল বরিশালে পড়ালেখা করছে।

আর একজন ভুক্তভোগী হচ্ছেন বরগুনা পৌরসভার একজন কাউন্সিলর, নান্না কমিশনার। তার বাসায় কিছু ছাত্ররা ভাড়া থাকে, সেখান থেকে এই রিফাত ফরাজী ৫টা মোবাইল ছিনতাই করে, এবং তার প্রতিবাদ করায় এই রিফাত ফরাজী তার সামনে রামদা নিয়ে আসে। নান্না কমিশনার দেলোয়ার হোসেনের একজন প্রধান কর্মী হওয়াতে তার কাছে নালিস দিলে, তাকেও সেখান থেকে অপমান হয়ে আসতে হয়। এবং এরকম ঘটনা রিফাত করতেই পারে না বলে তাকে সেখান থেকে অপমান করে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

ডিকেপি রোডের ডা. আলাউদ্দিন এর ভাড়া বাসায় কিছু ছাত্ররা ভাড়া থাকতো সেখান থেকে এই রিফাত প্রায় ২০টি মোবাইল ও ল্যাপটপ ছিনতাই করে নিয়ে আসে, পরে তখনকার ওসি রিয়াজের হস্তক্ষেপে রিফাত ফরাজীর বাবাকে থানায় এনে সেই সকল মোবাইল উদ্ধার করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময় তারা অন্যান্য ছাত্রাবাস থেকে মোবাইল, ল্যাপটপ ছিনতাই করে নিয়ে আসতো।

এরকম আরও অনেক ঘটনা আছে, যা বলে শেষ করা যাবে না।

যে ছেলেটির ঘটনা প্রথমেই বলেছি (তারিকুলের) সে বর্তমান ঘটনার প্রেক্ষিতে ফেসবুকে লিখেছেন- ২০১৭ তে আমার ঘটনার বিচার হলে আজ রিফাতের প্রাণ হারাতে হতো না”। লেখাটি কতোটা গুরুত্ববহন করে তা এখন আমরা বুঝতে পারছি।

রিফাত শরিফ আমাদের খুব কাছের ছোট ভাই ও কর্মী ছিল, এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাদের সাথে থেকেই নির্বাচনী প্রচারণা করেছে। নিজের কাছে খুব খারাপ লাগছে, রিফাতের মৃত্যু সংবাদে। তবে এ খুনের পেছনে আরো অনেক রহস্য আছে। বিভিন্ন খবর ও মিডিয়াতে যাকে এখন হিরো বানানো হচ্ছে মূল ভিলেন সে নিজেও হতে পারে, রিফাত শরিফের বন্ধুদের থেকে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে তাতে এটাই বুঝা যায়। আর একটু সময় পার হলে হয়ত আরও ক্লিয়ার হওয়া যাবে।

কারোর অত্মীয় হওয়া কোন অপরাধ না। তবে পূর্বের ঘটনা গুলোর সঠিক বিচার হলে কিংবা ঠিকঠাক শাসন করা হলে আজ রিফাত শরিফকে মরতে হতো না।''

২.
আমরা বরগুনার আইনজীবীরা রিফাত শরিফ হত্যাকারিদের কোন আইনী সহায়তা দিব না, একজনকেও না।

আশা করি আমার এই প্রস্তাবের সাথে সকল আইনজীবীরা একমত হবেন।

বরগুনাতে এরপরে যেন এমন ঘটনা ঘটানোর সাহস আর না করে, সেজন্যই আমরা আমাদের পেশার যায়গা থেকে এতটুকু অবদান রাখতে চাই।”

(বি:দ্র: স্ট্যাটাসের বানানরীতি লেখকের নিজস্ব।)

এছাড়া অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মূল অপরাধকে লঘু করে দেখে মন্তব্য করছেন মিন্নির ভূমিকা নিয়ে। তারা ঘটনার পর রিফাতকে নিয়ে হাসপাতাল যাওয়া বা নয়নের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নানা মন্তব্য করছেন।

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন বলেন,এটা খুবই বেদনাদায়ক। মিন্নি যেভাবে রিফাতকে সেভ করছিল, সেই সাহসিকতার তুলনা হয় না। কিন্তু তা দেখেও কেউ কেউ বাজে মন্তব্য করছেন।

তিনি আরও বলেন, রিফাত বেকার ছিল। প্রথমে আমরা বিয়েতে রাজি ছিলাম না। আমার ভাই সালেহ ও রিফাতের বাবার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল পারিবারিকভাবেই ওদের বিয়ে হয়। মিন্নিকে তার শ্বশুরবাড়ির সবাই ভালবাসত।

খুনের কারণ জানাতে গিয়ে মিন্নি বলেছেন, বিয়ের পর নয়ন তাঁকে উত্ত্যক্ত করে আসছে। এমনকি বিষয়টি পরিবারকে জানাতে নিষেধ করে প্রাণনাশের হুমকিও দিয়েছে।

রিফাত শরীফের বাবা আব্দুল হালিম দুলাল শরীফও সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, নয়ন নামের এক যুবক তাঁর ছেলের বউকে নিয়ে ফেসবুকে আজেবাজে কথা লিখছে।

মিন্নি বলেন, রক্তাক্ত অবস্থায় আমি রিকশায় করে রিফাতকে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করি। মনজুরুল আলম জন ঘটনার পরপরই হাসপাতালে ছুটে আসেন। আমি তখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরে দেখি রিফাত আমার পাশে নেই। তাকে আমার বাবাই বরিশালে নিয়ে যায়।

তিনি আরো বলেন, বিকেলে স্বামীর লাশ দেখতে শ্বশুরবাড়ি যাই। তখন জনের কয়েকজন বন্ধু আমাকে উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আমার দিকে তেড়ে আসে। একপর্যায়ে আমি আমার চাচাশ্বশুরের বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেই।

মিন্নি বলেন, আমার অগোচরেই রিফাতের দাফন সম্পন্ন হয়। আমি শেষ দেখাটাও দেখতে পারিনি। এমনকি আমাকে ওর কবরে মাটি পর্যন্ত দিতে দেয়নি।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads