প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, স্বাক্ষর হবে আট চুক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক


poisha bazar

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২৯ জুন ২০১৯, ১৩:২৪

প্রধানমন্ত্রী আগামী ১ জুলাই বেইজিং যাচ্ছেন, যেখানে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানোর জন্য তৈরি চীন।

সরকারের একজন কর্মকর্তা বলেন, চীন প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের ফিরতি সফর এটি। এই সফরের উদ্দেশ্য হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পর্ককে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।’ সফরে দেশটির সঙ্গে ৮টি বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমাঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সঙ্কট, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাবে। অন্যদিকে শি জিনপিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে ঢাকার আরো বেশি সম্পৃক্ততা চাওয়া হতে পারে বলে জানান তিনি।

তিনি আরো জানান, ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্টের সফরের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করা হবে এবং ওই সময়ে দুই পক্ষের সম্মতিতে যে প্রকল্পগুলো হাতে নেয়া হয়েছে তার দ্রæত বাস্তবায়নে বাধা দূর করার উদ্যোগ নেয়া হবে। ওই সময়ে ২০০০ কোটি ডলার ব্যয়ে ২৭টি প্রকল্প ২০১৬-২০ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য দুই পক্ষ সম্মত হয়েছিল, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৪৩০ কোটি ডলার ব্যয়ে পাঁচটি প্রকল্পের কাজ শুরুর জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে দুই দেশ।
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং ঝু বলেন, ‘চীনের কাছে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আমরা একটি সফল সফর আশা করছি এবং উভয় পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক বিশ্বাস আরো দৃঢ় হবে এই সফরের মাধ্যমে।

উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পর পর তৃতীয়বারের মতো জয়ী হলে চীনা রাষ্ট্রদূতই সবার প্রথম প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে উপস্থিত হয়ে তাকে অভিনন্দন জানান ও চীনের পেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন বার্তা পৌঁছে দেন।

আনুষ্ঠানিক সফর:
প্রধানমন্ত্রী ১ জুলাই একটি বিশেষ ফ্লাইটে চীনের উদ্দেশে রওনা হবেন। ডালিয়ানে অনুষ্ঠিতব্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অনুষ্ঠানে তিনি ২ জুলাই অংশ নেবেন। পরের দিন তিনি বেইজিংয়ে যাবেন। ৪ জুলাই চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চেচিয়াংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর সরকারি ভোজে অংশ নেবেন শেখ হাসিনা। শেষদিন অর্থাৎ ৫ জুলাই শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। পরে প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে দেয়া চীনা প্রেসিডেন্টের ভোজে তিনি অংশ নেবেন।

সই হবে ৮ চুক্তি :
প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরে দেশটির সঙ্গে ৮টি বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমাঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে। এসব চুক্তি ও সমাঝোতা স্মারকের মধ্যে ঋণ চুক্তিও রয়েছে। তবে কত টাকার ঋণ চুক্তি হবে তা এখনো ঠিক হয়নি। গতকাল শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফর উপলক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ প্রেস কনফারেন্স করা হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

পররাষ্ট্রন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সরকারের আমন্ত্রণে আগামী ১ জুলাই থেকে ৫ জুলাই দেশটি সফর করবেন। সফরকালে ১ থেকে ৩ জুলাই প্রধানমন্ত্রী চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ানে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গ্রীষ্মকালীন সভায় অংশ নিয়ে বক্তব্য দেবেন। এরপর ৩ জুলাই প্রধানমন্ত্রী চীনের একটি বিশেষ বিমানে দালিয়ান থেকে বেইজিং যাবেন। সেদিন প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আয়োজিত মতবিনিময় সভায় অংশ নেবেন তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো জানান, ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীকে চীনের গ্রেট হলে অভ্যর্থনা দেয়া হবে। ওইদিনই চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। যেখানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সব বিষয় আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করবেন।

ড. মোমেন বলেন, দুই প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ৮টি বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমাঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে। এগুলো হচ্ছে, ‘এক্সপানসন অ্যান্ড স্ট্রেনদিং অব পাওয়ার সিস্টেম নেটওয়ার্ক আন্ডার ডিপিডিসি এরিয়া প্রোজেক্ট শীর্ষক প্রকল্পে সরকারি কনসেশনাল ঋণ চুক্তি, ‘এক্সপানসন অ্যান্ড স্ট্রেনদিং অব পাওয়ার সিস্টেম নেটওয়ার্ক আন্ডার ডিপিডিসি এরিয়া প্রোজেক্ট শীর্ষক প্রকল্পে প্রিফেরেনসিয়াল বায়ারস ক্রেডিট ঋণ চুক্তি, ‘পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক স্ট্রেনদেনিং প্রজেক্ট আন্ডার পিজিসিবি’ শীর্ষক প্রজেক্টে ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি, দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক এবং কারিগরি সহযোগিতা বিষয়ে চুক্তি, বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সহযোগিতামূলক ওয়ার্কিং গ্রæপ গঠনে সমাঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, ইয়ালু ঝ্যাংবু-ব্র²পুত্র নদীর জলবিষয়ক তথ্য বিনিময়ে সমাঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং সাংস্কৃতিক ও পর্যটন সংক্রান্ত বিষয়ে সমাঝোতা স্বারক স্বাক্ষর।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ৪ জুলাই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে চীনের প্রধানমন্ত্রীর আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর চীনের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে গোল টেবিল বৈঠকে অংশ নেবেন তিনি। আগামী ৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী চীনের রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যান লি ঝ্যাংসুর সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। এরপর দুই দেশের পক্ষ থেকে একটি যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করা হবে।

আলোচিত বিষয়সমূহ: ২০১৬ সালে শি জিনপিংয়ের সফরের সময়ে উভয়পক্ষ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কৌশলগত পর্যায়ে উন্নিত করেছে। ওই সফরে অর্থনৈতিক একটি কাঠামোর মধ্যে থেকে উভয় দেশের জন্য লাভজনক একটি অবস্থায় পৌঁছানোর জন্য উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছিল। কিন্তু তার পরেও সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর, চায়না হারবার, রোহিঙ্গা ইস্যু এবং বেল্ট অ্যান্ড রোডের উদ্যোগে যতটুকু আশা করা হয়েছিল তার থেকে আপাতদৃষ্টিতে কম অংশগ্রহণসহ অন্য অমীমাংসিত বিষয়গুলো এই সফরে প্রভাব ফেলতে পারে।

উভয় দেশ সোনাদিয়া বন্দর নির্মাণের বিষয়ে একমত হয়েছিল, কিন্তু ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময়ে ওই চুক্তি সই হয়নি। পরে মাতারবাড়িতে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য জাপানকে কাজ দেয় বাংলাদেশ। ২০১৮ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এবং বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাই আবুল মাল আবদুল মুহিত চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি কর্মকর্তা ঘুষ দিয়েছেন বলে প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন এবং কালো তালিকাভুক্ত করা হয়।
২০১৭ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোডে উদ্যোগের প্রথম শীর্ষ সম্মেলনে পররাষ্ট্র ও অর্থমন্ত্রীসহ বাংলাদেশের ছয় জন কেবিনেট সদস্যকে দাওয়াত দেয়া হলেও তৎকালীন শিল্পমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি ছোট দল পাঠায় বাংলাদেশ।

একজন কর্মকর্তা বলেন, চীন বর্তমানে একটি বৈশ্বিক শক্তি এবং এর একটি দৃঢ় প্রতিবেশী নীতি আছে।

তিনি বলেন, এই অঞ্চলে চীন তার প্রাধান্য বজায় রাখতে চায়, এটি কোনো গোপন বিষয় নয় এবং এটি অর্জনের জন্য বেইজিং ক‚টনীতির মাধ্যমে কোমল পন্থা অবলম্বন করে থাকে। আরেক কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গা বিষয়টি আন্তর্জাতিকীকরণের বিপক্ষে আছে চীন এবং ঢাকাকে এ বিষয়ে একাধিকবার অনুরোধও করা হয়েছে। কিন্তু, বস্তুতপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিমিন্যাল কোর্ট ও আন্তর্জাতিক কোর্ট অব জাস্টিসসহ অন্যরা এ বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, আমরা আশা করব রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য চীন যে ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সেটি তারা অব্যাহত রাখবে।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলি বেইজিং সফরে গেলে চীন ওই ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং মিয়ানমারসহ তিন পক্ষ বৈঠক করে।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads






Loading...