আমার হাতের বানটা একটু খুলে দিবেন?


  • আরিফুল ইসলাম সাব্বির
  • ২৪ এপ্রিল ২০২১, ১৩:১৯

রাজধানীর তেজগাঁও এলাকা থেকে বৃহস্পতিবার (২২ এপ্রিল) সকালে নিখোঁজ হয়েছিলেন সাংবাদিক সিয়াম সারোয়ার জামিল (২৯)। শুক্রবার (২৩ এপ্রিল) সন্ধ্যায় আশুলিয়ার একটি এলাকা থেকে হাত বাঁধা অবস্থায় তাকে পাওয়া যায়।

শুক্রবার দুপুরে তার স্ত্রী শারমিন সুলতানা আভা সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না উল্লেখ করে তেজগাঁও থানায় জিডি করেন। জিডিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে রাজধানী বনানীর বিটিসিএল কলোনীর বাসা থেকে বের হয়ে পশ্চিম নাখাল পাড়া বড়বোনের বাসায় যান। সেখান থেকে সকাল ১০ টার দিকে বের হন। তারপর আর বাসায় ফেরেননি তিনি। বোনের বাসা থেকে বের হওয়ার পরেই ফোন বন্ধ হয়ে যায় সিয়ামের।

নিখোঁজের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর চোখ-হাত বাঁধা অবস্থায় সিয়ামকে রাস্তায় ফেলে যায় অপহরণকারীরা। সেখানে সিয়ামকে দেখতে পান জাহাঙ্গীর নামের এক কাঠমিস্ত্রী। কাঠমিস্ত্রীকে সিয়াম বলেন, 'ভাই আমার হাতের বানটা একটু খুলে দিবেন?'

কাঠমিস্ত্রী বলেন, ‘আমি বললাম আপনি কে? উনি বলল, আমারে এখানে বাইধা রাখছে। আমি বললাম কেডা? কয়, ওইযে পাশের লোকেরা। পরে আমি সাথে সাথে গেছি দেখতে। গিয়ে দেখি লোকগুলা নাই।’

কাঠমিস্ত্রী বলেন, আবার উনি বলছে যে উনি না কি সাংবাদিক। তখন এখানের সাংবাদিক ইয়াসিন ভাইরে ডাইকা আনছি। উনি আবার ওনারে স্যালাইন, পানি খাওয়াইছে।’

স্থানীয় সাংবাদিক মো. ইয়াসিন বলেন, ‘পরিচিত ওই কাঠমিস্ত্রি ওই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে আমার কাছে নিয়ে আসে। তখন উনি আমাকে বললেন যে উনি সাংবাদিক। তখন ওনার কাছে জানতে পারলাম উনি ঢাকাতে কর্মরত আছেন। পরে আমি এখানকার স্থানীয় সাংবাদিকদের জানালাম, তারাও আসলো। ওনার পরিচিত আত্মীয়স্বজনও আসলো। পরে ওনাকে নিয়ে তারা ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলো।’

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কথা হয় সিয়ামের সঙ্গে। এমন অবস্থা কীভাবে হলো, কীভাবে এখানে এলেন?

সিয়াম বলেন, ‘গতকালকে সন্ধ্যার সময় আমিনবাজার ব্রিজের পাশে ফাঁকা জায়গাটায় আমি হাঁটছিলাম। ওই সময় আমার হাতের ফোন একজন টেনে নিয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে আরও দুজন পেছন থেকে আমাকে ধরে এবং ওই পরিস্থিতিতে আমাকে জোরপূর্বক মাটিতে ফেলে দেয়। তার কিছুক্ষণ পরে চোখও বেঁধে ফেলে।’

সিয়াম জানান, এ সময় একটা গাড়ি আসে সেই গাড়িতে উঠিয়ে নেওয়া হয় তাকে। সেটি কী ধরনের গাড়ি, সে বিষয়ে কোনো ধারণা নেই তার। বলেন, ‘তারপরে ওইখান থেকে রাতে ওই গাড়িতেই রেখে দেওয়া হয়েছিল আমাকে। সেইখানে আমাকে একবেলা খাবার দেওয়া হয়েছে।’

অপহরণকারী ছিলেন উচ্চশিক্ষিত

পুরো সময়টায় একটি ‘মোটামুটি উচ্চশিক্ষিত’ লোকের উপস্থিতি টের পেয়েছেন সিয়াম। তিনি জানান, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা উচ্চারণ করে তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়।

সিয়াম বলেন, ‘আমি যেটুকু সিওর সে লংটাইম ধরে আমাকে চেনে এরকম একজন ব্যক্তি এখানে ছিল এবং তার মুখে ফেনী নোয়াখালী বা চাটগাইয়া উচ্চারণ ছিল।’

কাউকে চিনতে পেরেছেন কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এদের কাউকে আমি চিনতে পারি নাই। ওদের চারজনের মধ্যে একজন আমাকে চিনতে পেরেছে এবং ওরা রাতভর আসলে ঘুরছে। হঠাৎ আমি এটুকু শুনতে পারি যে, আরে আমরা তো কেরানিগঞ্জ চলে আসলাম।’

সিয়ামের ধারণা এটা আলম নগরের পাশ দিয়ে শামলাপুর দিয়ে যে কেরানিগঞ্জের রাস্তাটা গেছে, সেদিক দিয়ে তারা ঢুকেছেন। পরে সেখান থেকে এসে আবার ঘুরিয়ে শেষে হাফিজ উদ্দিন কলেজের (আশুলিয়ার নিরিবিলি) নির্জন গলিটাতে ছেড়ে দেওয়া হয়।

১০ মিনিট পর উঠবি, না হলে গুলি করে দেব

তিনি জানান, গাড়ি থেকে নামানোর সময় তাকে বসে থাকতে বলা হয়েছে। বলেন, ‘ওই তালগাছগুলার পাশে দেখিয়ে আমাকে বলছে যে, এখানে বসে থাকবি। ১০ মিনিট পর এখান থেকে উঠবি। না হলে গুলি করে দেব।’

এরপর কী করেছেন, সেটি তুলে ধরে সিয়াম বলেন, ‘আমি ১০ মিনিট শুয়ে ছিলাম। তারপরে ওখান থেকে উঠে হাঁটতে শুরু করি। হাঁটতে হাঁটতে কিছুক্ষণ পরে একজন মানুষ আমাকে সাহায্য করেন। আমার হাতের বাঁধন খুলে দেন’- নিজে কীভাবে বাঁধন মুক্ত হয়েছেন, সেটি জানান।

পরে সেই ব্যক্তি পুরো এলাকাটা ঘুরে দেখান। যারা আমাকে নিয়ে এসেছিল দেখি তাদের কেউই নেই। এরপর অনেকটা নির্ভার হন সিয়াম। তখন বাসায় ফোন দেন।

অপহরণকারীরা সংখ্যায় ৪-৫ জন

সিয়াম জানান, তাকে যারা অপহরণ করেছিল, তারা চার থেকে পাঁচ জন ছিলেন। মোবাইল ছিনতাইয়ের পর পেছন থেকে দুইজন আক্রমণ করে। আর গাড়িতে ছিলেন একজন।

কারও সঙ্গে কোনো শত্রুতা ছিল কি না- তিনি বলেন, ‘আমি আরটিভিতে দীর্ঘ দিন কাজ করেছি। আমি এখন নেপালভিত্তিক কাঠমান্ডু টিব্রিউনে কাজ করি। এই পরিস্থিতিতে লিগ্যালি আমার সঙ্গে আসলে রেগুলার কনভারসেশনে ঝামেলা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।’

সাংগঠনিক মনোমালিন্য ছিল

সিয়াম বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এক সময় তিনি ছিলেন ঢাকা জেলা যুব ইউনিয়নের সভাপতি। সাংগঠনিক নানা বিষয় নিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে মনোমালিন্য হয়েছিল বলে জানান। তবে এ কারণে এই অপহরণের মতো ঘটনা ঘটবে বলে বিশ্বাস করেন না তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমি দীর্ঘ সময় ছাত্র রাজনীতি করেছি। ফলে সেই পারপাসে হতে পারে।’

সিয়ামের শরীরজুড়ে ব্লেডের পোঁচ

এই সাংবাদিকের গা ব্লেড দিয়ে অসংখ্যবার কাটা হয়েছে। তাকে প্রাথমিকভাবে দেখা ধামরাই হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেছেন, তার অবস্থা ভালো না। তাকে চেতনানাশকও খাওয়ানো হয়েছে।

ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নূর রিফফাত আরা বলেন, 'আমরা ধারণা করছি, অসুস্থ ওই সাংবাদিককে চেতনানাশক কিছু খাওয়ানো হয়েছে। এছাড়া শরীরে অসংখ্য ব্লেডের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তার শারিরীক অবস্থা বেশি ভালো না। স্বজনরা তাকে এখানে চিকিৎসা দিতে চাচ্ছেন না। সেক্ষেত্রে তাকে দ্রুত অন্য কোন হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। আমরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসক দিয়েছি।'

কি ছিল স্ট্যাটাসের কারণ

বৃহস্পতিবার নিখোঁজের পর থেকেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় সিয়ামের ফেসবুক স্ট্যাটাস। যেখানে তিনি লিখেন, ‘পৃথিবীটা ভীষণ সুন্দর। আর মানুষও। সবাইকে সালাম। ভালো থাকবেন।’

স্ট্যাটাসের ৩ ঘণ্টা পরেই তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। সেই স্ট্যাটাস নিয়ে সিয়াম বলেন, ‘স্পেশাল কোনো কারণ না। সকাল বেলাটা আমার কাছে মনে হইছে যে মর্নিং খুব সুন্দর। সেই জায়গা থেকে একটা পজিটিভ ইমেজ নিয়ে আমি ওটা দিয়েছি এবং সবার ভালো থাকার প্রত্যাশাও করছি। এটার সাথে অন্য কোনো চিন্তা ভাবনা করার কোন সুযোগ নাই এবং পরবর্তীকালে আমি দেখলাম যে ফোনের চার্জও কম। ওই সময়কালে আর কোনো কিছুর করার সুযোগ ছিল না।

‘আমার মন খারাপও ছিল কয়েক দিন ধরে। তো আমি ভাবলাম যে আজকে অফিস না যাই। আমি একটু নদীটা উপভোগ করি। নদীর প্রতি আমার একটা ভালোবাসা আছে। তো আমি ওই আমিনবাজার ব্রিজটা পার হয়ে নদীর ঘাট, নদীর কাজকর্ম এগুলাই দেখছিলাম।

বৃহস্পতিবার রাতে ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এসব ঘটনার বিবরণ দেন সাংবাদিক সিয়াম সারোয়ার জামিল।

রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায়

সাংবাদিক সিয়ামকে উদ্ধারের পরপরই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসে আশুলিয়া ও ধামরাই থানা পুলিশ। পরে ধামরাইতে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে সাংবাদিক সিয়ামের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সকে ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছে দেয় আশুলিয়া থানা পুলিশ।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর পান্থপথের হেলথ আ্যান্ড হোপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সাংবাদিক সিয়ামের পরিবার।

মানবকণ্ঠ/এনএস


poisha bazar

ads
ads